ল্যাপটপ/ডেস্কটপ বিক্রি কমেছে ৭০ শতাংশ; এসএসডি’র দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ
স্টোরেজ সংকটে বাংলাদেশ
স্টোরেজ ক্রয় প্রক্রিয়ার বিলম্বে বাড়ছে খরচ ও সরবরাহ ঘাটতির ঝুঁকি
এআই বুমিংয়ের কারণে বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টরের বাজারে চার গুণ দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের আইটি বাজার। সূত্রমতে, তিন চার বছরের আগের ডিপিপি দিয়ে দাম সমন্বয় করেও শেষ রক্ষা রক্ষা হচ্ছে না। ফলে অচিরেই বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিকে ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা চতুর্মুখী মহাবিপদ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। বৈশ্বিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর দ্রুত বিস্তারের কারণে গত ছয় মাসে এনএএনডি (NAND) ফ্ল্যাশ ও ডি-র্যাম (DRAM) স্টোরেজের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির ধারা ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সরকারি সংস্থা ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলিত ধীরগতির ক্রয় প্রক্রিয়ার ফলে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের ১২ শ’ কোটি টাকার ডিজিটাল স্টোরেজ বাজার।
দেশের আইটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে, দেশে এসএসডি, র্যাম এবং সার্ভার কম্পোনেন্টের দাম গত কয়েক মাসে আকাশচুম্বী হয়েছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। যেহেতু বাংলাদেশ এসব পণ্যের জন্য শতভাগ আমদানিনির্ভর, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্যতম অস্থিরতা এখানে বড় প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স এবং মাইক্রনের মতো বিশ্বখ্যাত চিপ নির্মাতারা সাধারণ কম্পিউটার মেমোরির বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এতে সাধারণ ভোক্তা ও ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় ডিডিআর-৪ বা ডিডিআর-৫ র্যামের বাজারে তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সংকট সম্পর্কে গ্লোবাল ব্র্যান্ড পিএলসি-এর এন্টারপ্রাইজ সল্যুশনের জেনারেল ম্যানেজার সঞ্জয় সরকার বলেন, বৈশ্বিক নির্মাতারা এখন তাদের উৎপাদন ক্ষমতা এন্টারপ্রাইজ-গ্রেড ডিডিআর-৫ এবং ন্যান্ড ফ্ল্যাশের দিকে সরিয়ে নিয়েছে, যার ফলে সাধারণ কম্পিউটার ও সার্ভার কম্পোনেন্টের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
তিনি আরও জানান, অনেক ডিডিআর-৪ প্রোডাকশন লাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজেট-ফ্রেন্ডলি পণ্যগুলো এখন দুষ্প্রাপ্য। বিশেষ করে হাই-ক্যাপাসিটি র্যাম মডিউলগুলো এখন বাজারে পাওয়াই যাচ্ছে না, যা অনেক ক্ষেত্রে শুধু প্রি-বিল্ট সিস্টেমের সাথে পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির প্রভাবে ঢাকার মাল্টিপ্ল্যান বা আইডিবি ভবনের মতো বড় মার্কেটগুলোতে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের শেষের দিকে যে ১৬জিবি ডিডিআর-৫ র্যামের দাম ছিল মাত্র ৭,৮০০ টাকা। ২০২৬ সালের শুরুতে তার দাম ২০০ শতাংশের বেশি বেড়ে ২৮,৫০০ টাকা ছাড়িয়েছে। একইভাবে এসএসডির দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এন্ট্রি লেভেল সার্ভারের দাম গত ছয় মাসে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সঞ্জয় সরকার আরও উল্লেখ করেন, সার্ভার-গ্রেড কম্পোনেন্টের দাম অস্বাভাবিক বাড়ায় এন্টারপ্রাইজ লেভেলে আইটি আপগ্রেড করা এখন এসএমই খাতের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এরওপর ডলারের বিপরীতে টাকার মান ১১৮ থেকে ১২০ টাকায় নেমে আসা এবং তার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও আমদানি শুল্কের চাপে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই দামের অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে। স্মার্ট বাংলাদেশ এবং ই-গভর্নেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ হার্ডওয়্যারের উচ্চমূল্যের কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে টেন্ডারের জন্য নির্ধারিত সরকারি মূল্যের চেয়ে বাজারের দাম অনেক বেশি হওয়ায় দরপত্রগুলো বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
সূত্রমতে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতো বড় প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে দেশের বড় বড় সিস্টেম ইন্টিগ্রেটর কোম্পানিগুলোও লোকসানের মুখে পড়ছে এবং সময়মতো মালামাল সরবরাহ করতে না পেরে ব্যাংক গ্যারান্টি লিকুইডেশনের মতো আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ছে। সামগ্রিকভাবে আইটি খাতের এই অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এদিকে স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেডের চ্যানেল সেলস ডিরেক্টর মুজাহিদ আল বেরুনী সুজন জানান, বিশ্ববাজারে
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসি (IDC) ও ট্রেন্ডফোর্স (TrendForce)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের স্টোরেজ বাজার বর্তমানে প্রায় দুই বছরের প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে রয়েছে। উত্তর আমেরিকা ও চীনের এআই ডাটা সেন্টারগুলোর জন্য হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি (HBM) ও এন্টারপ্রাইজ এসএসডি (SSD)-এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ কারণে স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রনের মতো বড় চিপ নির্মাতারা তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে এআই কম্পোনেন্ট তৈরির জন্য প্রস্তুত করছে।
ট্রেন্ডফোর্স-এর তথ্য অনুযায়ী, ডি-র্যাম ও এনএএনডি ওয়েফার বাজারে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং পর্যাপ্ততার অনুপাত (sufficiency ratio) ধারাবাহিকভাবে শূন্যের নিচে রয়েছে, যা আগামী দুই বছর ডি-র্যাম ও এনএএনডি মেমোরির উল্লেখযোগ্য ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। ফলে এই ধরনের মেমোরির মূল্য বাড়তে পারে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে এন্টারপ্রাইজ এসএসডি-এর মূল্য ৪০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং কিছু ডিডিআর৫ (DDR5) মডিউলের মূল্য প্রায় চারগুণ হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা ও সরবরাহের এই ভারসাম্যহীনতা অন্তত ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত চলতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ মাসে টিএলসি (TLC) ফ্ল্যাশ ওয়েফার-এর মূল্য সূচক ৫.৭ থেকে ২৯-এ উঠেছে, যা ৪০০ শতাংশের বেশি।
তথ্যসূত্র: মোমোরি মার্কেট ডট কম

একই সময়ে ডিডিআর৫ মূল্য সূচক ১৮০ থেকে ৫০০-এ উঠেছে, যা ২৭০ শতাংশের বেশি।
তথ্যসূত্র: মেমোরি মার্কেট ডটকম
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, বিকাশমান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিতে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহ কমে গেলে বড় নির্মাতারা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। বাংলাদেশের স্থানীয় সরবরাহকারীরা ইতোমধ্যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং অস্থিতিশীল মূল্যের কথা জানিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রয় বিলম্বিত হলে ভবিষ্যতে শুধু বেশি দামে কিনতে হবে তা নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাওয়া নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সরবরাহকারী ও ভোক্তা পর্যায়ে আলাপকালে জানা গেল, বাংলাদেশের সরকারি ও করপোরেট খাতে দীর্ঘ প্রশাসনিক ও বাজেট অনুমোদন প্রক্রিয়া এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজেট অনুমোদন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও দরপত্র প্রক্রিয়া মিলিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এক বছরের বেশি সময় লাগে। বাজারে যখন প্রতি কয়েক মাসে মূল্য পরিবর্তন হচ্ছে, তখন এই বিলম্বের কারণে ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রেই অনুমোদিত বাজেট হিসেবে বর্তমান পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তাই এসব ক্ষেত্রে বাজেটে ঘাটতি হবার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে।
ব্যবসায়ীরা জানান, পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে সার্ভার সম্প্রসারণ কমিয়ে দিয়েছে বা প্রয়োজনীয় আইটি আপগ্রেড বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। এছাড়াও গভর্ন্যান্স ও ব্যাংকিং ডিজিটালাইজেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো বড় ধরনের বিলম্বের মুখে পড়ছে, যা দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রচলিত ধীরগতির প্রকল্প বাস্তবায়ন পদ্ধতি শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং সরকার, আর্থিক খাত এবং অন্যান্য খাতের ডিজিটাল অগ্রগতিতেও প্রভাব ফেলছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আইটি প্রফেশনাল ফ্রেন্ডস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট সালেহ মোবিন বলেন, আগামী তিন বছর মূল্য বৃদ্ধি চলমান থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের “অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের” কৌশল থেকে সরে আসতে হবে। ঝুঁকি কমাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রয় প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে হবে, অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে হবে এবং নির্ধারিত ও দক্ষ পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করা বা কৌশলগতভাবে আগাম মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আগে বিনিয়োগ করলে যে পরিমাণ খরচ হবে, অপেক্ষা করলে তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় বহন করতে হবে। এখানে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। প্রযুক্তিকে না এড়িয়ে আগেভাগেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে নীতিনির্ধারকদের করণীয় নির্ধারণ করে আটকে থাকা প্রকল্প ব্যয় রিসিডিউইল করতে হবে।
ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউআইএম



