চিপ সংকটে নতুন মোড়: চীনের সস্তা র্যাম বাজারে আনছে করসেয়ার
গত কয়েক মাস ধরে কম্পিউটার ও ল্যাপটপের র্যাম এবং এসএসডি বা ফ্ল্যাশ স্টোরেজের বাজারে যে অস্বাভাবিক ও চড়া দাম চলছিল, তা অবশেষে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার ইঙ্গিত মিলছে। তবে এই স্বস্তির খবরটি কোনো প্রথাগত উৎস থেকে নয়, বরং আসছে চীন থেকে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারে গুঞ্জন উঠেছে, বিখ্যাত কম্পিউটার হার্ডওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘করসেয়ার’ চিনের শীর্ষ ডির্যাম চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিএক্সএমটি-এর তৈরি সস্তা চিপ ব্যবহার করে তাদের নতুন ডিডিআর৫ র্যাম মডিউল বাজারে ছাড়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে র্যামের দাম যখন আকাশচুম্বী, তখন চীনের এই সস্তা চিপের আগমন বাজারকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিতে পারে। বর্তমানে যেখানে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সমমানের ডিডিআর৫ র্যামের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ ডলারের কাছাকাছি, সেখানে চীনের সিএক্সএমটি-এর র্যাম মডিউলগুলো মাত্র ১৫০ ডলারের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে; যা প্রায় অর্ধেক দাম।
দ্রুত বাড়ছে চীনা চিপের বাজার অংশীদারিত্ব
চীনের এই চিপ বিপ্লব এখন আর কোনো ছোটখাটো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। ‘চ্যাংক্সিন মেমোরি টেকনোলজিস’ বা সিএক্সএমটি ইতিমধ্যেই বিশ্ব ডির্যাম বাজারের প্রায় ৮ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে এবং অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে ডিডিআর৫ র্যামের উৎপাদন বাড়াচ্ছে।
একই সাথে চীনের আরেক চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ইয়াংজি মেমোরি টেকনোলজিস’ বা ওয়াইএমটিসি ফ্ল্যাশ স্টোরেজ বা এসএসডি-র বাজারে এক বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক এসএসডি বা ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির বাজারের প্রায় ১১ থেকে ১৩ শতাংশই এখন এই চীনা কোম্পানির দখলে।
চিপের ধরন
চিপের বাজারে যখন সস্তা পণ্যের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন বড় বড় গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলোও এক ধরনের চাপে পড়ে। করসেয়ার বা অন্য কোনো কোম্পানি পুরোপুরি চীনা চিপের ওপর নির্ভরশীল না হলেও, বাজারে এই সস্তা বিকল্পের উপস্থিতির কারণেই স্যামসাং বা এসকে হাইনিক্সের মতো জায়ান্টরা তাদের পণ্যের দাম কমাতে বাধ্য হতে পারে।
সস্তা হলেও পারফরম্যান্সের কঠিন পরীক্ষা বাকিদাম কম হলেও চীনের তৈরি এই মেমোরি চিপগুলো চট করেই স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স বা মাইক্রনের মতো ‘বিগ থ্রি’ বা শীর্ষ তিন পরাশক্তিকে বাজার থেকে হটিয়ে দিতে পারবে না। কারণ পিসি বা ল্যাপটপ নির্মাতাদের কাছে শুধু র্যামের গতি বা কম দামই শেষ কথা নয়; এর সাথে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, ফার্মওয়্যার সামঞ্জস্যতা এবং ওয়ারেন্টির ঝুঁকিও জড়িত।
চীনা চিপের মূল চ্যালেঞ্জ হলো এর বড় আকারের উৎপাদন সক্ষমতা বা ‘স্কেল’। তারা আন্তর্জাতিক বাজারের বিশাল চাহিদা অনুযায়ী শতভাগ ত্রুটিহীন সিলিকন চিপ একটানা সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো একে স্থায়ী বিকল্প হিসেবে না দেখে কেবল অন্য বড় কোম্পানিগুলোর সাথে দামাদামি বা দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে।
খাঁড়া হয়ে ঝুলছে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা
চীনের এই চিপ বিপ্লবের পথের সবচেয়ে বড় বাধা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার চলমান ‘চিপ যুদ্ধ’। ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই চীনের অত্যাধুনিক চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি এবং এআই সার্ভারে ব্যবহৃত এইচবিএম মেমোরি আমদানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। চীনের ওয়াইএমটিসি কোম্পানিটি ইতিমধ্যেই মার্কিন ‘এনটিটি লিস্ট’ বা কালো তালিকায় রয়েছে এবং সিএক্সএমটি-কেও এই রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার জালে জড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।
যেহেতু মেমোরি চিপ কম্পিউটার শিল্পের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান, তাই ট্রাম্প প্রশাসন যেকোনো মুহূর্তে চীনের এই চিপ খাতকে লক্ষ্য করে নতুন করে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে পারে।
এখনই রাতারাতি দাম কমার সম্ভাবনা কমসব মিলিয়ে, চীনের এই সস্তা চিপের আগমনেই যে রাতারাতি মেমোরি বা এসএসডি-র বাজার পানির দামে নেমে আসবে, এমনটা ভাবা ভুল হবে। করপোরেট ক্রেতা এবং বড় পিসি নির্মাতারা এখনো স্যামসাং ও মাইক্রনের মতো বিশ্বস্ত পার্টনারদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপরই ভরসা রাখছেন।
তবে বাজারে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন চাপ তৈরি হচ্ছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এআই সার্ভারের বাইরে সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ের র্যাম ও এসএসডি-র উৎপাদন এভাবে বাড়াতে থাকে, তবে আগামীতে সাধারণ ক্রেতারা তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে ল্যাপটপ ও কম্পিউটার মেমোরি কিট কিনতে পারবেন- এমন আশা করাই যায়।
ডিবিটেক/বিএমটি । সূত্র: ডিজিটাল ট্রেন্ডস



