কোয়ান্টাম ইন্টারনেট: ১০০ কিলোমিটারের মাইলফলক স্পর্শ, আসছে ‘আনহ্যাকবল’ নেটওয়ার্ক
বর্তমান ইন্টারনেটের নিরাপত্তা যখন সাইবার হামলার মুখে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ, ঠিক তখনই বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন একদল গবেষক। চীনের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (USTC)-এর একদল পদার্থবিদ ফাইবার অপটিক ক্যাবল ব্যবহার করে ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত 'ডিভাইস-ইন্ডিপেনডেন্ট কোয়ান্টাম কী ডিস্ট্রিবিউশন' (DI-QKD) সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। অর্থাৎ একটি সাধারণ ফাইবার-অপ্টিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে নিরাপদে কোয়ান্টাম তথ্য আদান-প্রদান করতে সক্ষম হয়েছেন গবেষকরা। এই সাফল্য ভবিষ্যতের একটি সম্পূর্ণ হ্যাকিং-মুক্ত বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরির পথ প্রশস্ত করল।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
সাধারণ ইন্টারনেটে তথ্য আদান-প্রদানের সময় তা এনক্রিপ্ট করা থাকলেও শক্তিশালী কম্পিউটার দিয়ে তা ভাঙা সম্ভব। কিন্তু কোয়ান্টাম ইন্টারনেট কাজ করে পদার্থবিজ্ঞানের মূল নীতির ওপর ভিত্তি করে। এখানে তথ্য পাঠানো হয় একক ফোটন বা পরমাণুর মাধ্যমে। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, যদি মাঝপথে কেউ এই তথ্য চুরি করার চেষ্টা করে, তবে কোয়ান্টাম কণার অবস্থা বদলে যায় এবং সাথে সাথে প্রেরক ও প্রাপক তা টের পেয়ে যান। অর্থাৎ, এটি তাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি 'আনহ্যাকবল' বা অভেদ্য।
মূল বিষয়টি কী?
বর্তমান ইন্টারনেটে আমরা যখন কোনো তথ্য পাঠাই, তা মূলত ইলেকট্রনিক সিগন্যালের মাধ্যমে যায় যা দক্ষ হ্যাকারদের পক্ষে চুরি করা সম্ভব। কিন্তু কোয়ান্টাম ইন্টারনেট কাজ করে পদার্থবিজ্ঞানের জটিল নিয়ম (Quantum Mechanics) ব্যবহার করে। এখানে তথ্য আদান-প্রদান করা হয় 'কোয়ান্টাম বিট' বা 'কিউবিট' (Qubit) এর মাধ্যমে।
এই গবেষণার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো MDI-QKD (Measurement-Device-Independent Quantum Key Distribution) পদ্ধতির ব্যবহার। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে তথ্য আদান-প্রদানকারী দুই পক্ষই তৃতীয় একটি পক্ষের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে নিতে পারে, কিন্তু সেই তৃতীয় পক্ষ কোনোভাবেই তথ্যের মূল সংকেত বা 'কী' (Key) জানতে পারে না।
এই গবেষণার বিশেষত্ব:
গবেষণাটি সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স (Science)-এ প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে কোয়ান্টাম এনক্রিপশন কেবল কয়েক কিলোমিটার বা ল্যাবরেটরির ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। দীর্ঘ দূরত্বে পাঠাতে গেলে তথ্যের সংকেত বা 'এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট' দুর্বল হয়ে যেত। কিন্তু গবেষকরা এবার 'কোয়ান্টাম রিপিটার' প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই বাধা অতিক্রম করেছেন।
-
দূরত্ব: ১০০ কিলোমিটার (যা একটি বড় শহরের নেটওয়ার্ক কাভার করার জন্য যথেষ্ট)।
-
প্রযুক্তি: এতে ব্যবহার করা হয়েছে রুবিডিয়াম পরমাণু এবং উন্নত মানের একক-ফোটন ডিটেক্টর।
-
নিরাপদ সংযোগ: ১১ কিমি দূরত্বে এটি পূর্ণাঙ্গ সিকিউর কী জেনারেট করেছে এবং ১০০ কিমি পর্যন্ত পজিটিভ রেট বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
আগামীর সম্ভাবনা:
এই অর্জনের ফলে ভবিষ্যতে এমন একটি ইন্টারনেট ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে যেখানে ব্যাংক ট্রানজেকশন, সরকারি গোপন নথিপত্র এবং ব্যক্তিগত তথ্য হবে শতভাগ নিরাপদ। গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক প্যান জিয়ানওয়ে বলেন, "এটি ভবিষ্যতের বৈশ্বিক কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক তৈরির একটি অপরিহার্য ভিত্তি। আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে আমরা হয়তো সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের দেখা পাব।"
এর প্রভাব কী হতে পারে?
এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ মানে হলো—ভবিষ্যতের ব্যাংকিং লেনদেন, সামরিক যোগাযোগ এবং স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত তথ্য এমন এক নিরাপত্তার স্তরে পৌঁছে যাবে যা আজকের সুপার কম্পিউটার দিয়েও ভাঙা সম্ভব নয়। গবেষক দলের মতে, এটি কেবল একটি ল্যাবরেটরি পরীক্ষা নয়; বরং এটি প্রমাণ করে যে দীর্ঘ দূরত্বের কোয়ান্টাম যোগাযোগ এখন প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব। এটি মূলত একটি 'গ্লোবাল কোয়ান্টাম ইন্টারনেট' তৈরির প্রথম শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর।
যদিও প্রযুক্তিটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য আরও সময় প্রয়োজন, তবে ১০০ কিলোমিটারের এই সফল পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, কোয়ান্টাম ইন্টারনেট এখন আর কেবল সায়েন্স ফিকশন নয়, বরং বাস্তব সত্য। তাই এই মাইলফলকটি মূলত 'এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট' (Entanglement) নামক একটি প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, যেখানে দুটি কণা একে অপরের থেকে অনেক দূরে থাকলেও একীভূত অবস্থায় থাকে।
ডিবিটেক/আইএস/এমআই







