সতর্ক করলো ডিএমপি

এআই ট্রাফিক মামলার নামে প্রতারণা, ভুয়া এসএমএসে ব্যাংক তথ্য চুরি

এআই ট্রাফিক মামলার নামে প্রতারণা, ভুয়া এসএমএসে ব্যাংক তথ্য চুরি
২৫ মে, ২০২৬ ১৩:৩৯  

রাজধানীতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালুর সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়েছে একটি প্রতারক চক্র। ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে সাধারণ যানবাহন মালিকদের ব্যাংক ও ক্রেডিট কার্ডের গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ট্রাফিক অ্যালার্ট গ্রুপ ও ব্যক্তিগত টাইমলাইনে ২৪ মে, রবিবার  অনেক ভুক্তভোগী এ ধরনের প্রতারণামূলক বার্তা পাওয়ার কথা জানান। নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত সরকারি প্রচারণা না থাকায় অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়ছেন।

ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, প্রতারকরা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) লোগো ব্যবহার করে ভুয়া মেসেজ পাঠাচ্ছে। সেখানে একটি ভুয়া মামলা নম্বর দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ক্যামেরায় গাড়ির গতিসীমা লঙ্ঘনের তথ্য ধরা পড়েছে। 

মেসেজে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা না দিলে শাস্তির হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং তথ্য জাতীয় ডাটাবেজে যুক্ত করার কথাও বলা হচ্ছে। জরিমানা পরিশোধের জন্য সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি ভুয়া লিংক যুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে ক্লিক করলেই ব্যবহারকারীর ব্যাংক তথ্য, ক্রেডিট কার্ড নম্বর বা ওটিপি চুরির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এ নিয়ে প্রযুক্তিবিদ আব্দুর রহমান জানান, বাইক না চালিয়েও তিনি এআই মামলা পেয়েছেন। এমনকি মামলার টাক পরিশোধে ৫০ শতাংশ ছাড় দিয়ে এসএমএসও পাঠানো হয় তাকে। পরে অনুসন্ধান করে এই প্রতারণা বিষয়ে নিশ্টিত হন তিনি। 

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানান, ভুয়া মেসেজগুলো সাধারণত বিদেশি নম্বর থেকে পাঠানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের কোড (+৬৩) ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া সরকারি ওয়েবসাইট সাধারণত ‘.gov.bd’ ডোমেইনে পরিচালিত হয়। ডোমেইনের মধ্যে govbd লেখা থাকলেও শেষে .online, .icu বা অন্য কোনো এক্সটেনশন থাকলে সেটি সরকারি সাইট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত টাকা আদায়ের জন্য ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া সাইবার প্রতারণার পরিচিত কৌশল। 

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিএ জানিয়েছে, বিআরটিএ থেকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো মামলা দেওয়া হয় না এবং এ ধরনের জরিমানাও সংস্থাটি গ্রহণ করে না। বিআরটিএর নাম ব্যবহার করে টাকা দাবি করা সম্পূর্ণ প্রতারণা।

ঢাকা মহানগর পুলিশও জানিয়েছে, এআই ট্রাফিক মামলার বিষয়ে এখনো কোনো নাগরিকের মোবাইলে এসএমএস পাঠানো শুরু হয়নি। বর্তমানে ডিজিটাল মামলার নথি ডাকযোগে সরাসরি গাড়ির মালিকের ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে। জরিমানা পরিশোধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে।

পুলিশ নাগরিকদের কোনো লিংকে প্রবেশ করে কার্ড বা ব্যাংক তথ্য দেওয়ার আগে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এটি মূলত ব্যাংক কার্ডের তথ্য চুরির উদ্দেশ্যে তৈরি একটি ফিশিং চক্র। যানবাহনের মালিকদের মোবাইলে বিদেশি নম্বর থেকে পাঠানো হচ্ছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ভুয়া এসএমএস। সেখানে জরিমানা পরিশোধের জন্য একটি লিংক যুক্ত করা হচ্ছে, যা ব্যবহারকারীকে নিয়ে যাচ্ছে বিআরটিএর আদলে তৈরি একটি ভুয়া ওয়েবসাইটে। কোনো ধরনের গাড়িই নেই, অথচ জরিমানা-মামলার মেসেজ পেয়েছেন— এমন ভুক্তভোগীর কথাও জানা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে।
প্রতারণার পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু হয় একটি এসএমএসের মাধ্যমে। মেসেজে প্রেরক হিসেবে কোনো সরকারি সংস্থা বা বিআরটিএর নাম নেই। বরং ব্যবহার করা হয়েছে +৬৩ কোডযুক্ত একটি আন্তর্জাতিক নম্বর— +63 948 331 8282, যা ফিলিপাইনের কান্ট্রি কোড।
এ বিষয়ে ডিএমপি জানায়, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী কোনো যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হলে, সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত একটি চিঠি চালক বা মালিকের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া, বিশেষ প্রয়োজনে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র ০১৩২০-০৪২২০৭ এবং ০১৩২০-০৪২২২৭ নম্বর থেকে এসএমএস পাঠানো হতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ট্রাফিক বিভাগের জরিমানাকৃত যানবাহনের ক্ষেত্রে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের (উপায় ও ইউসিবিএল) মাধ্যমে বৈধভাবে অর্থ পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। ট্রাফিক বিভাগ কখনও কোনো ব্যক্তির কাছে ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিনকোড, পাসওয়ার্ড কিংবা ওটিপি (OTP) জানতে চায় না। তাই এই ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
ট্রাফিক সংক্রান্ত যেকোনো সঠিক তথ্যের জন্য ডেল্টা-৩ অথবা ০১৩২০-০৪২২০৭, ০১৩২০-০৪২২২৭ এবং জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

/ডিবিটেক/এসআই/ইকে/