ঈদের আগমুহূর্তে বাড়ছে ফ্রিজ-এসি বিক্রি, এগিয়ে দেশীয় ব্র্যান্ড

ঈদের আগমুহূর্তে বাড়ছে ফ্রিজ-এসি বিক্রি, এগিয়ে দেশীয় ব্র্যান্ড
২৬ মে, ২০২৬ ০০:০০  

ঈদের ছুটির প্রথম দিনেই রাজধানীর বিজয় স্মরণীর ওয়ালটন প্লাজা ও মিনিস্টার শো-রুমে দেখা গেলো নারীদের ভীড়। এদের বেশির ভাগকেই দেখা গেলো ফ্রিজ নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। যমুন ফিউচার পার্কের ভিশন এম্পোরিয়ামেও দেখা গেলো একই দৃশ্য। এভাবেই শুধু রাজধানী নয়; বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ছাপিয়ে মূল্যসংবেদনশীলতায় ওয়ালটন, মিনিস্টার ও ভিশন ব্র্যান্ডের ফ্রিজে বেশি আগ্রহী দেখা গেছে ক্রেতাদের। 

এভাবেই ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে বেড়েছে ফ্রিজ ও গৃহস্থালি প্রযুক্তিপণ্যের বাজার। কোরবানির মাংস দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তায় প্রতি বছরের মতো এবারও ফ্রিজের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

২৬ মে, মঙ্গলবার, ঈদের ছুটি শুরু হলেও বিভিন্ন শপিং কমপ্লেক্সের চেয়ে ইলেকট্রনিক্সের দোকানগুলোতে ভীড় বেড়েছে। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানাগেছে, ভারতীয় গরুর মতো স্যামসাং, ক্যালভিন ও সিঙ্গার ফ্রিজের বাজার দখল করেছে দেশীয় ব্র্যান্ডের ফ্রিজ-এসি। তবে এরসঙ্গে নতুন করে বিক্রি বেড়েছে ব্ল্যান্ডার- গ্র্যান্ডার, ফ্রায়ার, জুসারের মতো হোম-কিচেন অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের। এসি’র বিক্রি মাঝে বাড়লেও বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ভাটা পড়েছে। 

২৪ মে, রবিবার সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে রেফ্রিজারেটরের বাজার বর্তমানে ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর ব্যাপক প্রসার ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে এই শিল্পটি প্রতি বছর গড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বছরে প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ লাখ ইউনিট ফ্রিজ বিক্রি হচ্ছে। আর সাধারণ সময়ের তুলনায় ঈদ মৌসুমে ফ্রিজের বাজারে চাহিদা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। 

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে দেশে ৯০ শতাংশের বেশি ফ্রিজ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিবছর ফ্রিজের বাজার প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও ফ্রিজ রপ্তানি হচ্ছে। ভবিষ্যতে গ্রামীণ বাজার ফ্রিজ শিল্পের বড় বাজারে পরিণত হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।

চলতি বছরও ফ্রিজ বিক্রির ইতিবাচক প্রবণতা বিষয়ে ওয়ালটন রেফ্রিজারেটরের চিফ বিজনেস অফিসার মো. তাহসিনুল হক বলেন, তীব্র গরমের কারণে এবার ফ্রিজের পাশাপাশি এসির বিক্রিও বেড়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিং মেশিন, ব্লেন্ডার ও হোম-কিচেন অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের বিক্রিও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে বড় ও মাঝারি ধারণক্ষমতার ফ্রিজ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ইনভার্টার প্রযুক্তির মডেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। স্মার্ট ফিচারসমৃদ্ধ ফ্রিজের প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।

তার ভাষ্য, আগে গ্রাহকেরা মূলত দাম বিবেচনা করে ফ্রিজ কিনতেন। এখন বিদ্যুৎ খরচ, খাদ্য সংরক্ষণের মান, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার ও প্রযুক্তিগত সুবিধাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এবারের ঈদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রিমিয়াম মডেলের ফ্রিজ সবচেয়ে বেশি চাহিদায় রয়েছে।

ওয়ালটনের সারা বছরের মোট ফ্রিজ বিক্রির প্রায় ৭০ শতাংশই ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময়  মো. তাহসিনুল হক বলেন, ওয়ালটনের বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে গবেষণা, উদ্ভাবন ও অটোমেশন প্রযুক্তিতে। গাজীপুরের চন্দ্রায় অবস্থিত ওয়ালটন হাই-টেক পার্কে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশসহ কোরিয়া, ইতালি, চীন ও তাইওয়ানের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন।

তিনি আরও জানান, বাজার গবেষণার ভিত্তিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অব থিংস (এআইওটি) প্রযুক্তি ফ্রিজে যুক্ত করা হয়েছে। ওয়ালটনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবার ফ্রেঞ্চ-ডোর ফ্রিজ উৎপাদন শুরু হয়। পাশাপাশি বিশ্বের প্রথম ৮-ইন-১ কনভার্টিবল সাইড বাই সাইড রেফ্রিজারেটরও বাংলাদেশে উৎপাদিত ও বাজারজাত হচ্ছে।

অপরদিকে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল জানান, সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও এনার্জি এফিশিয়েন্ট প্রযুক্তির ফ্রিজে ঝোঁক বেশি ক্রেতাদের মধ্যে। ক্রেতারা এখন নতুন ডিজাইন, ইনভার্টার টেকনোলজি, ডিজিটাল ডিসপ্লে ও ডিজিটাল কন্ট্রোলের মতো আধুনিক ফিচারের ফ্রিজ বেশি পছন্দ করছেন। এই পছন্দের ওপর নির্ভর করে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে তাদের ফ্রিজের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে ভিশন ফ্রিজের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।

মিনিস্টার গ্রুপের হেড অব প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল হাসান স্বপন বললেন, চাঁদ রাত পর্যন্ত ফ্রিজের বিক্রি অব্যাহত থাকে। তাই ঈদের পর আমরা সঠিক তথ্য দিতে পারবো। তবে গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি আনুমানিক ১০ থেকে ২০% বাড়তে পারে । নতুন ফিচারের ফ্রিজগুলি দামের পার্থক্য খুব একটা বেশি না হওয়ায় মানুষ ওইগুলি পছন্দ করতেছে। আর নতুন ডিজাইনের ক্ষেত্রে দামের পার্থক্য খুব একটা হয় না।

বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানাগেল, দোকানে না গিয়েও ক্রেতারা এখন ফ্রিজ-এসি’র মতো দামি ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস অনলাইনে কিনছেন। অফার, কার্ডে পেমেন্ট, কিস্তি সুবিধা ইত্যাদি কারণে অনেকে অনলাইনে অর্ডার দিয়েছেন। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন বিভাগের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর  খন্দকার তাসফিন আলম জানালেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অথবা ডটকমের ওয়েব সাইটে ফ্রিজ-এসি বুকিং দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা দারুণ সাড়া পেয়েছি। অ্যাপ থেকে কেনাকাটায় আমরা গত বছরের তুলনায় এ বছরের বিক্রিতে শতভাগ প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছি। সাধারণ সময়ের তুলনায় রেফ্রিজারেটর বিক্রি বেড়েছে আনুমানিক ৫০ শতাংশ। ঈদের ছুটিতেও ক্রেতারা অনলাইনে অর্ডার করতে পারবেন। তবে লজিস্টিক সেবা বন্ধ থাকায় পণ্য হাতে পেতে এক থেকে দুই দিন বেশি সময় লাগবে। 

/ডিবিটেক/এমএআর/ এমইউআইএম/