হজ্জে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া: বদলে যাচ্ছে পুণ্যার্থীদের অভিজ্ঞতা
আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এখন আর কেবল দৈনন্দিন জীবনের অনুষঙ্গ নয়, বরং তা পবিত্র হজ ব্যবস্থাপনায় এক অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষের সমাগমকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে সৌদি আরব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিয়েল-টাইম ডাটা বিশ্লেষণ, স্মার্ট ডিভাইস ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করছে। প্রযুক্তি এবং বিশ্বাসের এই মেলবন্ধন বিশ্বজুড়ে হজযাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে করে তুলেছে অনেক বেশি সহজ ও আধ্যাত্মিক।
একসময় হজ নিবন্ধন, ভিসা সংগ্রহ বা যাতায়াতের পরিকল্পনা করা ছিল অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এখন সেই চেনা রূপ বদলে ডিজিটাল করেছে সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়। তাদের চালু করা ‘নুসুক’ (Nusuk) অ্যাপ এখন হজ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি। এই একটি মাত্র প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ই-ভিসা, হোটেল বুকিং, পরিবহন সেবা, দোয়া ও প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এর পাশাপাশি ‘তাওয়াক্কালনা’ (Tawakkalna) অ্যাপের মাধ্যমে হাজিদের ভিসা, পাসপোর্ট ও স্বাস্থ্যবিমার মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পরিচয় সংরক্ষিত থাকছে, যা কাগজের নথি হারানোর ঝুঁকি একদম কমিয়ে দিয়েছে।
হজের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো লাখো মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা। অতীতে ভিড়ের চাপে বহু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে এবার সৌদি কর্তৃপক্ষ এআই-ভিত্তিক স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করছে। পবিত্র স্থানগুলোতে থাকা হাজারো স্মার্ট ক্যামেরা ও সেন্সর মানুষের চলাচলের ধরন বিশ্লেষণ করে। কোথাও অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হওয়ার আগেই এআই সিস্টেম প্রশাসনকে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয়। ২০২৬ সালের হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করতে সৌদি আরবের উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ স্টার্ট-আপ ‘আল-আমাদ’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ‘পবিত্র স্থানসমূহের পথ’ নামে একটি নতুন মোবিলিটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। এই এআই প্ল্যাটফর্মটি রিয়েল-টাইম ডাটা ব্যবহার করে কোথায় যানজট বা অতিরিক্ত ভিড় হতে পারে, তা আগে থেকেই জানিয়ে দেয়। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে পুণ্যার্থীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে পারছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও প্রযুক্তি হাজিদের জীবনকে সহজ করেছে। আগে ভাষাগত সমস্যা, পথঘাট চেনা এবং হজের নিয়মকানুন নিয়ে হাজিরা বেশ উৎকণ্ঠায় থাকতেন। এখন ঘরে বসেই অনলাইন ক্লাস, ভিডিও লেকচার ও অ্যাপের মাধ্যমে হজের প্রতিটি ধাপ শেখা সম্ভব হচ্ছে। এমনকি অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবে যাওয়ার আগেই ভার্চুয়ালি কাবা, মিনা, আরাফাত ও জামারাতের পরিবেশ দেখে নেওয়া যাচ্ছে। আরবি না জানলেও স্মার্টফোনের এআই অনুবাদ প্রযুক্তির কল্যাণে হাসপাতালের সেবা, কেনাকাটা কিংবা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা এখন খুবই সহজ। বিশাল জনসমুদ্রে পথ হারানোর ভয়ও তাড়িয়েছে জিপিএস ও গুগল ম্যাপের অফলাইন ডাউনলোড সুবিধা।
চিকিৎসা সেবায় যুক্ত হয়েছে ‘সেহাতি’ (Sehhaty) অ্যাপ, যার মাধ্যমে ভিডিও কলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যায়। এছাড়া বয়স্ক হাজিদের সুরক্ষায় স্মার্ট ব্রেসলেট ব্যবহার করা হচ্ছে, যা তাদের হার্টবিট, শরীরের তাপমাত্রা ও রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করে জরুরি মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সিগন্যাল পাঠাতে পারে। হারামাইন শরিফাইনে এআই-চালিত বহুভাষিক রোবটগুলো হাজিদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, জমজমের পানি ও ধর্মীয় বই বিতরণ করছে।
তবে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদের মাঝেও কিছু নেতিবাচক দিক ভাবিয়ে তুলছে সচেতন মহলকে। হজের মতো পবিত্র ও বিনম্র ইবাদতের সময় অনেক হাজি অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, সেলফি তোলা, লাইভ ভিডিও করা কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। হজ মূলত আত্মপ্রদর্শন বা বাহ্যিক প্রচারের জায়গা নয়, এটি আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হওয়ার শিক্ষা দেয়। তাই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ইবাদতের মূল আত্মাকে বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের এই ডিজিটাল রূপান্তর হজের আবহকে নিরাপদ রাখার পাশাপাশি বিশ্বকে উপহার দিচ্ছে এক টেকসই ও সুশৃঙ্খল মানবসমাবেশের বাস্তব উদাহরণ।
/ফিচার /ডিবিটেক/এনএ/ ইকে/



