মোবাইল খাতের অতিরিক্ত কর ডিজিটাল রূপান্তরের বড় বাধা

কর সংস্কারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব বাড়বে বলে মনে করে বাংলালিংক

কর সংস্কারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব বাড়বে বলে মনে করে বাংলালিংক
২১ মে, ২০২৬ ২১:৪৮  

বাংলাদেশে মোবাইল খাতের ওপর আরোপিত উচ্চ হারের কর হার বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। এই  কর চাপ দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তর ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

২১ মে, বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের মেঘনা হলে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ‘লঞ্চিং হোয়াইট পেপার অন ট্যাক্স রিফর্ম’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে

এতে ডিজিটাল সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিবেদনে সরকারের প্রতি তিন দফা প্রধান সুপারিশ করা হয়। এতে ভোক্তার ব্যয় কমাতে মোবাইল সেবার ওপর আরোপিত উচ্চ মাত্রার সম্পূরক শুল্ক ও সরাসরি ব্যবহারভিত্তিক করের বোঝা পুনর্নির্ধারণ, প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে সিম ট্যাক্সের মতো প্রবেশকালীন সব ধরনের বাধা ও চার্জ সম্পূর্ণরূপে বাতিল  এবং সাময়িক রাজস্ব ক্ষতিকে বড় করে না দেখে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ ও আইসিটি মাস্টারপ্ল্যানের লক্ষ্য অর্জনে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর সংস্কার কৌশল প্রণয়ণের প্রস্তাব দেয়া হয়। 

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠানে বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের টেকসই রূপান্তরকে বেগবান করতে সরকার এই সময়োচিত নীতিগত সংস্কারগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রন্টিয়ার ইকোনমিক্স লিমিটেড গ্লোবাল টেলিকম জায়ান্ট ভিওন (VEON)-এর জন্য এই বিশেষ প্রতিবেদনটি তৈরি করে । টেলিকম খাতের জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে এই পেপারটির বিস্তারিত মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ একটি ‘মোবাইল-ফার্স্ট’ দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার গ্রাহক ও মোবাইল অপারেটরদের ওপর এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বৈশ্বিক মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন জিএসএমএ (GSMA)-এর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মোবাইল খাতের মোট রাজস্বের প্রায় ৫৫ শতাংশই বিভিন্ন কর ও ফি হিসেবে সরকারের তহবিলে চলে যায় অর্থাৎ, মোবাইল সেবার পেছনে প্রতি এক ডলার আয়ের বিপরীতে গ্রাহক ও অপারেটরদের গড়ে ৫৫ সেন্ট কর দিতে হচ্ছে যেখানে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-টু-জিডিপি অনুপাত ২০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে এই হার মাত্র ৭.৬ শতাংশ কিন্তু সামগ্রিক কর কম হলেও নির্দিষ্টভাবে মোবাইল সেবার ওপর করের বোঝা এখানে আকাশচুম্বী বর্তমানে ভ্যাট, ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১ শতাংশ সারচার্জ মিলে মোট মোবাইল ব্যবহারের ওপর করের হার দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশে এছাড়া প্রতি নতুন সিম কার্ডের ওপর ৩০০ টাকা ট্যাক্স এবং করপোরেট করের হার সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে, যা অন্যান্য সাধারণ খাতের (২২.৫%-২৭.৫%) চেয়ে অনেক বেশি

অনুষ্ঠানে তাইমুর রহমান ফ্রন্টিয়ার ইকোনমিক্সের গাণিতিক মডেল ও ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট তুলে ধরে জানান, সরকার যদি মোবাইল খাতের কর কাঠামো যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি এবং সরকারের নিজস্ব রাজস্ব বাড়াতে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে 。 প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত একটি সংস্কার মডেলে দেখানো হয়েছে, মোবাইল ব্যবহারের ওপর সম্মিলিত কর ৪৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৩ শতাংশে আনা, নতুন সিম ট্যাক্স ৩০০ টাকা থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা এবং করপোরেট করের হার ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হলে মোবাইল সেবার ব্যবহার এবং এর পরিধি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে

এই কর সংস্কারের ফলে গ্রাহকপ্রতি গড় ডেটা ব্যবহারের পরিমাণ ৪ শতাংশ এবং মোবাইল সেবার সামগ্রিক বিস্তৃতি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে, যার ফলে মাথাপিছু প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির বার্ষিক হার বিদ্যমান আনুমানিক ৬.৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭.২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে কর হ্রাসের প্রথম বছরে মোবাইল খাত থেকে সরকারের প্রত্যক্ষ রাজস্ব প্রায় ৭৬১ মিলিয়ন ডলার বা মোট কর আদায়ের ২.৫ শতাংশ কম মনে হতে পারে তবে ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারিত হওয়ার সুবাদে দেশের আনুষ্ঠানিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি এত বড় হবে যে, তা থেকে সরকারের অন্যান্য করের উৎস অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠবে গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই কর সংস্কারের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যেই সরকার সামষ্টিক অর্থনীতি থেকে আগের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ বার্ষিক কর রাজস্ব আহরণ করতে সক্ষম হবে এবং কয়েক বছরের মধ্যেই আর্থিক ঘাটতি কাটিয়ে ‘ব্রেক-ইভেন’ বা সমতায় পৌঁছানো সম্ভব

ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউএম