প্রযুক্তি ও টেলিকম খাতের শ্বেতপত্রে ধরা পড়লো ভয়াবহ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র

প্রযুক্তি ও টেলিকম খাতের শ্বেতপত্রে ধরা পড়লো ভয়াবহ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র
৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০০:২১  

বহুল আলোচিত আইসিটি ও টেলিকম খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের শ্বেতপত্র এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংগঠতির প্রযুক্তি খাতের মেগাদুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে গত ২ ডিসেম্বর আইসিটি ও টেলিকম খাতের শ্বেতপত্র দুটি প্রধান উপদেষ্টা ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করা হয়। যে কেনো সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এটি প্রকাশ করবে বলে জানাগেছে। 

মোটা দাগে উভয় শ্বেপত্রেই “গভীর শাসনব্যবস্থা সংকট, প্রতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অপারেশনাল বিশৃঙ্খলার কারণে” খাত ভিত্তিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি এ অবস্থা থেকে উত্তরণে মানব সম্পদ বস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তর, স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য আনায়ন, জাতীয় টেলিকম মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন, সরকারি প্রকল্পে কঠোর নজরদারি, স্বাধীন আপিল ব্যবস্থা গঠন এবং ভোক্তা সুরক্ষা জোরদারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। 

সূত্রমতে ৬৫০ পৃষ্ঠার আইসিটি খাতের শ্বেতপত্রে রয়েছে ১৫টি চ্যাপ্টার। সেভানে ডিজিটাল কানেক্টিভিটি, হাইটেকপার্ক, এটুআই ও ট্রেনিং এর নামে বিগত ১৫ বছরে দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে কেস স্ট্যাডির ভিত্তিতে। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে এই শ্বেতপত্রটি তৈরিতে সহযোগী ছিলেন প্রযুক্তিবিদ ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজওয়ান খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মফিজুর রহমান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একই বিভাগের অধ্যাপক রিফাত শাহরিয়ার।

অপরদিকে খাতের শ্বেতপত্রটি হয়েছে আড়াই হাজার পৃষ্ঠার। সেখানে সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ডে
সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার মধ্যে আড়াই হাজার কোটি টাকা ৭টি প্রকল্প অনুদান দেয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম ছাড়াও সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের দায়সারা ব্যবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। পুরো টেলিকম খাতে সংঘটিত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্রটি উপস্থাপন করে ওই সময়ে শাসনব্যবস্থার ভাঙন নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে সরকার নিযুক্ত কমিটি।

অপরদিকে বিইউইটির অধ্যাপক ড. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের কমিটি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত টেলিকম খাতের শ্বেতপত্রে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ (পিটিডি)-এর ৪২টি প্রকল্প পর্যালোচনায় প্রায় অর্ধেকেই অনিয়ম ধরা পড়ে। সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড—যা দরিদ্র মানুষকে ডিজিটাল সেবা পৌঁছানোর কথা—তা বছরের পর বছর অকার্যকর পড়ে থাকার বিষয়ও উঠে এসেছে। বাদ যায়নি টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টিএসএস) ব্যবহার করে প্রতিযোগিতা ছাড়াই চুক্তি সম্পাদন এবং টেন্ডারকে নির্দিষ্ট পক্ষের সুবিধামতো সাজানো ও এক উৎস থেকে নিয়মিত কার্যক্রমের ঘটনা। 

 বাংলাদেশের টেলিকম খাত “ভিত্তিগতভাবে দুর্বল, পরিচালনায় অদক্ষ এবং সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য সংযোগ দিতে ব্যর্থ” বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এই কমিটিতে আরও সংযুক্ত ছিলেন ঢাবি’র ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. মুছাবের উদ্দিন আহমেদ, অর্থনীতিবিদ ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহ, বুয়েট ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. লুতফা আক্তার, বিডিরেন সিটিও এখলাস উদ্দিন আহমেদ, প্রযুক্তিবিদ ফিদা হক এবং ঢাবি’র সিইসি বিভাগের অধ্যাপক মোঃ আজহার উদ্দিন।

শ্বেতপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লাইসেন্স নীতিতে গুরুতর দুর্বলতা তুলে ধরে এতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরির সুযোগ সৃষ্টির পথরেখা তুলে ধরা হয়েছে।  বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রকল্প (বর্তমান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট ১) যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া অনুমোদন করা এবং বিভিন্ন অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি না করার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। টেলিটক টাওয়ার ও বিটিসিএল ওয়াইফাই হটস্পট অচল থাকার প্রমাণ তুলে ধরে দেশের টেলিকম খাতের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ কার্যত অকার্যকর হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।   

শ্বেতপত্রে বলা হয়, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী কিছু প্রতিষ্ঠান সহজে লাইসেন্স পেলেও, একই পরিস্থিতিতে থাকা অন্য অনেক আবেদনকারী বাধার মুখে পড়েছে। বিপরীতে সমিট কমিউনিকেশন ও ফাইবার@হোমসহ কয়েকটি বড় উদ্যোক্তা জাতীয় ফাইবার নেটওয়ার্কে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে লিজিং খরচ বেড়েছে এবং সরকার নির্মিত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি হাতে চলে গেছে।

এর কারণ তুলে ধরে কমিটির জানিয়েছে, এই খাতে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন—বিটিআরসি থেকে। এখানে অনিয়মিত নিয়োগ, বয়স ছাড়, প্রকল্পের কর্মীদের স্থায়ী করা, অবসরপ্রাপ্তদের পুনরায় নিয়োগ এবং স্বার্থসংঘাতপূর্ণ নিয়োগ নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই কর্মকাণ্ডই পুরো খাতের জন্য “খারাপ উদাহরণ” সৃষ্টি করেছে। এতে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর থেকে জনগণের আস্থা কমে গেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল ও টেলিটকের মতো প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অদক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়মিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবে পদায়ন, এমনকি ভুয়া সনদ গ্রহণের মাধ্যমে এই সংস্থাটিকে দুর্বল করার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। কমিটি বলেছে, “জবাবদিহি ছাড়া স্বায়ত্তশাসন শেষ পর্যন্ত স্বজনপ্রীতি বাড়ায় এবং নিয়ম ভাঙাকে স্বাভাবিক করে তোলে।”

ডিবিটেক/আইএইচ/ওআর