ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ১৫ বছরের দুর্নীতি

শ্বেতপত্রে প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতা, কৌশলগত উপেক্ষা এবং প্রশাসনিক ভঙ্গুরতা প্রকাশ

শ্বেতপত্রে প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতা, কৌশলগত উপেক্ষা এবং প্রশাসনিক ভঙ্গুরতা প্রকাশ
৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৮:৩০  
৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ১০:৫৫  

বিগত ১৫ বছরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে সংঘটিত দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে একটি বিশেষ ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশ করা হয়েছে। ৫ জানুয়ারি (সোমবার) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। শ্বেতপত্রটি বর্তমানে বিভাগের নিজস্ব ওয়েবসাইটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

৩ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্রে বাংলাদেশ টেলিকম খাতের সঙ্কটকে তুলে ধরে এই শ্বেতপত্রে প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতা, কৌশলগত উপেক্ষা এবং প্রশাসনিক ভঙ্গুরতার ওপর সবিস্তার আলোকপাত করা হয়েছে। এতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা ও দায়িত্ব স্পষ্ট না থাকার বিষয়টি বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও ব্যাখ্যা দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। এতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে এবং জবাবদিহি দুর্বল হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। 

একইসঙ্গে ছোট ছোট অতিরিক্ত লাইসেন্স, বহুস্তরীয় অনুমোদনব্যবস্থা ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে বিগত ১৫ বছরে টেলিযোগাযোগ খাতে একটি জটিল এবং অকার্যকর বাজারকাঠামো নিয়ে নিবিড় পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও মূল্যকেন্দ্রিক স্পেকট্রাম নীতি, অবকাঠামো শেয়ারিংয়ে দেরি ও ইন্টারনেটবিষয়ক কঠোর নিয়মের কারণে ফাইভ-জিসহ কিছু আধুনিক প্রযুক্তির সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অনুসন্ধানে তুলে ধরেছেন শ্বেতপত্র প্রণেতারা। 

ওই সময়ে টেলিকম খাতে বিপুল বিনিয়োগ হলেও কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা নিশ্চিত হয়নি উল্লেখ করে  করনীতিরও সমালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বর্তমান করকাঠামো নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্র যদি সবার জন্য দ্রুত ও সাশ্রয়ী ব্রডব্যান্ড নিশ্চিত করতে চায়, তবে করনীতিকে সেই লক্ষ্য অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

প্রতিবেদনে এই খাতের বিভিন্ন পক্ষের দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন, একটি স্বাধীন আপিলব্যবস্থা, গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণের জন্য আলাদা ইউনিট, প্রকাশ্য কর্মদক্ষতা সূচকসহ শক্তিশালী প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স।  

শ্বেতপত্রটি তৈরি করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসাব্বের উদ্দিন আহমেদ, অর্থনীতিবিদ ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহ, বুয়েটের ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. লুতফা আক্তার, টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এখলাস উদ্দিন আহমেদ ও প্রযুক্তিবিদ ফিদা হক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মো. আজহার উদ্দিন।

শ্বেতপত্র বিষয়ে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত দেড় দশকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে (পিটিডি) কী ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং কাঠামোগত সমস্যা ছিল, তা পর্যালোচনার জন্য গঠিত একটি বিশেষ টাস্কফোর্স দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। শ্বেতপত্রে অনিয়মের খতিয়ানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সরকার আশা করছে, এই শ্বেতপত্রটি টেলিযোগাযোগ খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

প্রসঙ্গত, প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনক্রমে গত ২১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। বিগত ১৫ বছরের অনিয়মগুলো খুঁজে বের করে তার ওপর ভিত্তি করে একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল এই টাস্কফোর্সের মূল লক্ষ্য।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শ্বেতপত্রে তুলে ধরা সমস্যা সমাধান করাই হবে এখন সরকারের সাফল্য।  

ডিবিটেক/এআই/এনই