বিকল্প জ্বালানীর নতুন দিগন্তে রুফটপ সোলার ও সোলার কার্ড

বিকল্প জ্বালানীর নতুন দিগন্তে রুফটপ সোলার ও সোলার কার্ড
৯ মে, ২০২৬ ০০:২৪  

বিশ্বব্যাপী চলছে গ্রিন ও ক্লিন এনার্জি আন্দোলন। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে সব দেশ। এর অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুতে আগ্রহ বাড়ছে সচেতন নাগরিকদের। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বহু বছর পিছিয়ে ছিল। তবে ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে সরকার সম্প্রতি সৌরবিদ্যুতে জোর দেওয়া শুরু করেছে।

বর্তমান সরকার প্রাথমিকভাবে আগামী ৫ বছরে ১০ হাজার সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ঘোষণা দেয়। তবে এটি বেশ বিলাসী পরিকল্পনা বলেই বিভিন্ন পক্ষ মন্তব্য করে। এতে সরকার পরিকল্পনায় কিছুটা সংশোধন করেছে। ১০ হাজারের পরিবর্তে পাঁচ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের কথা বলা হচ্ছে। তবে গ্রিড সোলার স্থাপনের মাধ্যমে ৫ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যপূরণ সম্ভব না বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা এ ক্ষেত্রে বড় উদাহরণ। বিগত সরকার গ্রিড সোলার স্থাপনে বড় ধরনের দরপত্র আহ্বান করেও সাড়া পায়নি। গত বছর ৫ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াটের ৫৫টি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হলেও মাত্র ৯০০ মেগাওয়াটের প্রস্তাব জমা পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে গত ২৭ এপ্রিল পুনরায় ৪৯৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ১০টি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বড় সাফল্য পেয়েছে পাকিস্তান। দেশটি মাত্র চার বছরে ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ২৫ শতাংশে নিয়ে গেছে। তবে এর প্রায় পুরোটাই হোম সোলার তথা রুফটপ সোলার। দেশটির এ সাফল্যের পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করেছে। প্রথম কারণটি হলো, গ্রিড বিদ্যুতের বড় ধরনের ঘাটতি। পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাংলাদেশের মতোই অপরিকল্পিতভাবে বাড়ানো হয়েছিল। তবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ দিতে পারছিল না দেশটির সরকার।

দ্বিতীয় কারণটি হলো, সরকারের সরবরাহকৃত গ্রিড বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি। বাংলাদেশের মতোই পাকিস্তান সরকার এ খাতে প্রচুর ভর্তুকি দিত। তাই বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মানতে গিয়েছে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে গেলে জনগণ তা ভালোভাবে নেয়নি। একদিকে বিদ্যুৎ সংকট অন্যদিকে দাম বৃদ্ধি পাকিস্তানে রুফটপ সোলার স্থাপনে বিল্পব এনে দেয়। সাধারণ জনগণ নিজ উদ্যোগে রুফটপ সোলার স্থাপন শুরু করে।

বাংলাদেশেও ‍রুফটপ সোলার ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছে সরকার। রাজধানীতে বিদ্যুতের চাপ কমাতে আবাসিক ভবনগুলোকে ধাপে ধাপে সোলার পাওয়ারের আওতায় আনতে চাচ্ছে সরকার। এজন্য দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন ও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে ৭ মে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

এখন প্রশ্ন- ঢাকার ছাদে সোলার বসানো কতটা সহজ হবে? বা উদ্যোগটি আদৌ সফল হবে কিনা? বিষয়টি একদিক থেকে দেখলে খুবই সহজ, আবার ভিন্ন দিক থেকে মনে হতে পারে খুবই জটিল। জটিল হওয়ার কারণ ঢাকার বড় অংশের আবাসিক বাসভবন ছোট। তাই চাইলেই সহজে ছাদে সোলার প্যানেল বসানো সম্ভব না। আবার ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই ভাড়া বাসায় থাকে। তাই ভাড়া বাসায় সোলার প্যানেল বসাতে গেলে জমি তথা ভবন মালিকের ইচ্ছার বিষয় আছে।

যদিও এর বিকল্প কিছু সুযোগ সরকারের সামনে রয়েছে। প্রথমত, ঢাকার সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়) সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা। দ্বিতীয়ত, ঢাকার সব মসজিদগুলোর ছাদকে রুফটপ সোলারের জন্য ব্যবহার করা। তৃতীয়ত, সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ছাদে রুফটপ সোলার স্থাপন।

এর বাইরে ঢাকার বহুতল সব আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদ, শপিংমলগুলোর ছাদ, সরকারি সমস্ত ভবনের ছাদ রুফটপ সোলারের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করতে পারে সরকার। এসব ভবনে প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। তাই রুফটপ সোলার ছড়িয়ে দিতে পারলে তা বিদ্যুৎ ব্যবহার সাশ্রয়ে অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠবে। ঢাকায় এ মডেল সফল হলে ধারাবাহিকভাবে অন্য শহর ও পৌর এলাকাতেও তা ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।

প্রশ্ন উঠেছে. ঢাকাতেই কেন রুফটপ সোলারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উত্তর হলো, ঢাকায় বিদ্যুতের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৩০ শতাংশ শুধু ঢাকাতেই ব্যবহার হয়। তাই ঢাকায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাড়াতে পারলে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে সে বিদ্যুৎ ঢাকার বাইরে বিশেষত গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ বাড়ানো যাবে। তবে সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক বিস্তারে জমি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকার মতো বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহরে এটি আরও বেশি চ্যালেঞ্জের বিষয়।

যদিও সরকার চাইলেই কিছু স্থাপনাকে এ কাজে ব্যবহার করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বড় তিনটি বাস টার্মিনাল (সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী)। এছাড়া রয়েছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। এসব টার্মিনাল ও স্টেশনের ছাদ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে এসব স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হলে তা সরকারের আয়ের একটি উৎসও হতে পারে।

ব্যক্তি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে শুধু নীতিমালা করলেই চলবে না। দরকার সরকারের নীতি সহায়তা তথা আর্থিক সহায়তা। এ জন্য সরকার চাইলে সোলার কার্ড প্রচলন করতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পুরো খরচ একবারে ব্যক্তি খাতে বহন করতে হলে যে বিনিয়োগ দরকার তার পুরোটা অনেকের পক্ষে করা সম্ভব না। তাই এক্ষেত্রে অর্ধেক অর্থ সরকার দুই থেকে তিন বছরের জন্য ঋণ হিসেবে দিতে পারে সোলার কার্ডধারীদের।

সোলার কার্ড প্রচলনের জন্য সরকার একটি মডেল স্থাপন করতে পারে। মডেলটি হতে পারে, রুফটপ সোলার স্থাপনে মোট মূল্যের অর্ধেক গ্রাহক সরাসরি পরিশোধ করল। বাকি অর্ধেক সরকার ঋণ হিসেবে দেবে, যা গ্রাহক দুই থেকে তিন বছরে পরিশোধ করে দেবে। বিনা সুদে এ ঋণটা সরকার দিতে পারে, যা সোলার কার্ডধারীরা পাবেন। এসব সোলার কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ইত্যাদি জামানত হিসেবে বিবেচিত হবে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ফলে গ্রাহকের যে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে তা দিয়েই সে মাসিক কিস্তিতে সরকারের ঋণ পরিশোধ করে দেবে।

একইভাবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন মালিকদের ঋণ দিতে পারে সরকার সোলার কার্ডের আওতায়। এছাড়া মসজিদসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা ভর্তুকিও দিতে পারে। এভাবে উদ্যোগ নিলে আগামী পাঁচ বছরে ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যক্তি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।


লেখকঃ সম্পাদক, দৈনিক জাতীয় অর্থনীতি


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।