লাইভ ওয়েট, হোম ডেলিভারি আর ডিজিটাল স্বচ্ছতায় বদলে যাচ্ছে কোরবানির পশু কেনাবেচা
অনলাইন কোরবানির হাটে আস্থার জোয়ার
রাজধানীর গুলশানে নিজস্ব ফ্ল্যাটে বাবা-মাকে নিয়ে থাকেন লাবিবা। কোভিডের সময় থেকেই তিনি আর কোরবানির পশু কিনতে হাটে যান না। বাসার আশপাশে কোরবানি দেওয়ার মতো খোলা জায়গাও নেই। তাই গরু ও খাসি—দুটি পশুর কোরবানিই তিনি গত কয়েক বছর ধরে অনলাইনে সম্পন্ন করছেন।
একটি প্রতিষ্ঠানে সিএফও হিসেবে কর্মরত লাবিবা বলেন, “একবার হাট থেকে সুন্দর দেখে গরু কিনে এনে দেখি সেটি অসুস্থ, জ্বরে আক্রান্ত। আবার পশু বাসায় আনাটাও ঝক্কির। সুস্থ-সবল পশু পাব কি না, সেটিও অনিশ্চিত থাকে। কোরবানির পর ভালো কসাই পাওয়াও কষ্টকর। তাই কয়েক বছর ধরেই পুরো কাজটি বেঙ্গল মিটের মাধ্যমে করছি।”
তার মতোই আরেকজন সিঙ্গাপুরপ্রবাসী মো. রিপন। পৈতৃক বাড়ি খিলগাঁওয়ে। একসময় গাবতলী কিংবা যাত্রাবাড়ীর হাট থেকে কোরবানির পশু কিনতেন। তবে কোভিড-পরবর্তী এক ঈদে হাট থেকে গরু কিনে ফেরার পথে গরুর দড়ি ছিঁড়ে বিপত্তি ঘটে। একজন আহতও হন। এরপর থেকে তিনি অনলাইভিত্তিক খামার ‘সুখের খামারি’র ওপরই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন।
একই খামার থেকে গত তিন বছর ধরে পশু কেনার কারণ জানিয়ে সাদ্দাম হোসেন বলেন, “এবার আমি দুটি গরু কিনেছি। একটি গরু গত বছর থেকেই পছন্দ করে রেখেছিলাম। লাইভ ওয়েটে কিনতে পেরেছি। ফ্রি ডেলিভারির পাশাপাশি দুই দিনের খাবারও দিয়েছে। গতবারও তাদের কাছ থেকে নিয়েছিলাম। গরুতে অতিরিক্ত চর্বি ছিল না, ঝামেলাও হয়নি।”
গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে ২৬ মে অনলাইনে কোরবানির পশু কিনতে গিয়ে বেশিরভাগ প্ল্যাটফর্ম থেকেই খালি হাতে ফিরেছেন ধানমন্ডির বাসিন্দা ও একটি পোশাক কারখানার কর্মী তানভীর হাসান। তিনি জানান, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠিত অনলাইন খামারের বিক্রি আগের সপ্তাহেই শেষ হয়ে যায়। অনেকেই ২৫ মে থেকেই ডেলিভারি শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব ঘেঁটে নবাবগঞ্জের একটি খামার থেকে পশু সংগ্রহ করেন তিনি।
ফেসবুকে ‘চলতি কৃষি’ এবং ইউটিউবে ‘চাকা বাংলা’ ও ‘চিত্রপুরী কৃষিচিত্র’-এর মতো চ্যানেলগুলোতে সুস্থ ও অর্গানিক কোরবানির পশুর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন খামারি এসব প্ল্যাটফর্মে লাইভ হাটের মাধ্যমে পশু বিক্রি করেছেন।
এ বছরও ‘বিক্রয় ডটকম’-এর ওয়েবসাইটে পশু কেনাবেচা হয়েছে। নতুন করে কোরবানির পশু বিক্রি শুরু করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘অথবা ডটকম’।
প্রতিষ্ঠানটির ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন বিভাগের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর খন্দকার তাসফিন আলম বলেন, “আমাদের সংগ্রহে থাকা শতভাগ গরুই বিক্রি হয়ে গেছে। মোট ৭০ থেকে ৮০টি গরু ছিল। এর বেশিরভাগই নিজেদের খামারের, বাকিগুলো ভেন্ডরদের। অনলাইনে গরু কেনায় মানুষের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।”
অনলাইন কোরবানির হাটগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি পশুর সঙ্গে লাইভ ভিডিও, ছবি, দাঁতের সংখ্যা অনুযায়ী বয়স, জাত এবং নিবন্ধিত প্রাণিচিকিৎসকের স্বাস্থ্যসনদ যুক্ত করা হচ্ছে। বিক্রির সময় ডিজিটাল স্কেলে ওজন করে লাইভ ওয়েটে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। অনলাইন পেমেন্টে এসক্রো সার্ভিস ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে ক্রেতাদের আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হচ্ছে।
টানা সপ্তম বছরের মতো অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি করছে ঢাকার ‘প্রোটিন মার্কেট’। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাইফুল আলম জানান, এবার তারা লাইভ ওয়েটে ৫৮টি গরু বিক্রি করেছেন। দুই মাস আগে থেকেই প্রি-বুকিং শুরু হয়েছিল। ২৬ মে সকালেই সব পশু হস্তান্তর শেষ হয়। গড় মূল্য ছিল দেড় লাখ টাকার নিচে এবং লাইভ ওয়েট ছিল ১৮০ থেকে ২৬০ কেজির মধ্যে।
তিন বছর আগে মাত্র ৩০টি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু করা মানিকগঞ্জের ‘সরকার অ্যাগ্রো’ এবার অনলাইন চাহিদা বৃদ্ধির কারণে তাদের মৌসুমি গরুর সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় ১৫০টিতে উন্নীত করেছে।
‘পূর্বাচল ক্যাটল ফার্মিং’ জানিয়েছে, ডিজিটাল গরু কেনাবেচা ব্যবস্থা চালুর ফলে ঈদের আগেই তাদের প্রায় সব পশুর বুকিং সম্পন্ন হয়ে গেছে।
রাজধানীর বসিলার পরিচিত খামার ‘মেঘডুবি অ্যাগ্রো’ এ মৌসুমে প্রায় এক হাজার গরু বিক্রি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক ওয়াহিদ বলেন, “এ বছর অনলাইনে আমাদের সাড়া অত্যন্ত ইতিবাচক।”
একইভাবে ২০২০ সাল থেকে পাবনা থেকে পরিচালিত অনলাইন গরুর হাট ‘গরুর হাট ডটকম’ ২৫ মে থেকেই অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দেয়। কারণ, এরই মধ্যে তাদের খামারের ৯৫টি গরুই বিক্রি হয়ে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সাগর আহমেদ জানান, মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই সব গরু বিক্রি হয়েছে। দেশি গরুর গড় ওজন ছিল তিন মণ এবং ক্রস ব্রিড গরুর ওজন ছিল সাত মণ পর্যন্ত। দেশি গরু বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় এবং ক্রস ব্রিড গরু ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায়।
তিনি বলেন, “এ বছর গোখাদ্যের দাম বাড়ায় গরুর দামও বেড়েছে। মনপ্রতি গোখাদ্যের দাম সাড়ে ৩ শ টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল খামারগুলোর প্রতিযোগিতা এবং দেশি গরুর ধীর গ্রোথের কারণে আমরা শুরু থেকেই সীমিত সংখ্যক পশু বিক্রির পরিকল্পনা করি।”
অনলাইনে শুধু পশু বিক্রিই নয়, কোরবানি করে ভাগ অনুযায়ী মাংস বাসায় পৌঁছে দেওয়ার এক যুগ পূর্ণ করল বেঙ্গল মিট। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব কর্পোরেট সেলস সাদেকুল ইসলাম জানান, এ বছর তারা ৫৯০টি কোরবানির পশু প্রসেস করছেন। এর মধ্যে ৩৯০টি গরু ও ২০০টি ছাগল রয়েছে। গরুর মধ্যে ৯৫টি ভাগের গরু। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও সিলেটে মাংস ডেলিভারি করা হবে।
তিনি বলেন, “ছবি ও ভিডিও দেখেই মূলত লাইভ ওয়েটে পশু বিক্রি হয়েছে। অর্ডারকারীদের ৯৩ শতাংশই রিপিট কাস্টমার।”
প্রতিষ্ঠানটির হেড অব কর্পোরেট হাসান হাবিব জানান, দুই মাস আগে থেকে পশু বিক্রি শুরু হয় এবং ৪৫ দিন আগে ওয়েবসাইট চালু করা হয়। ঈদের দিন থেকেই কোরবানিকৃত খাসি ডেলিভারি শুরু হবে। গরুর মাংস ডেলিভারি শুরু হবে ঈদের পরদিন সকাল থেকে।
আর হেড অব বিজনেস শেখ ইমরান আজিজ বলেন, “নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই আমরা বিক্রির লক্ষ্য অতিক্রম করেছি। ক্রেতাদের বাড়তি অনুরোধে অতিরিক্ত গরুও সরবরাহ করতে হয়েছে। অনলাইনে কোরবানির প্রতি মানুষের আস্থা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।”
‘সুখের খামার’-এর সহ-উদ্যোক্তা তাসদীখ হাবীব জানান, ক্রেতারা এখন শুধু হাটের ভোগান্তি এড়াতেই নয়, বরং নিরাপদ ও প্রাকৃতিকভাবে লালন-পালন করা পশু নিশ্চিত করতেও অনলাইনভিত্তিক খামারের দিকে ঝুঁকছেন।
তিনি বলেন, “আমরা লাইভ ওয়েটে পশু বিক্রি করি। আমাদের বেশিরভাগ ক্রেতাই রিপিট কাস্টমার। এক সপ্তাহ আগেই বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। এবার আমরা ৯৬টি গরু বিক্রি করেছি। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকার গরু। সর্বোচ্চ ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকায়ও কয়েকটি গরু বিক্রি হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, প্রবাসী থেকে শুরু করে গ্রুপ অব কোম্পানির মালিকরাও তাদের মাধ্যমে মাদ্রাসা ও আত্মীয়স্বজনের কাছে কোরবানির পশু পাঠিয়েছেন। ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে একাধিক পশু কেনার প্রবণতাও বেড়েছে।
কোভিডের সময় থেকে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)-এর উদ্যোগে অনলাইন কোরবানির হাট জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। পরে সিটি করপোরেশন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততায় এটি একটি বড় ট্রেন্ডে পরিণত হয়। ‘আমার গ্রাম’ ও এটুআইয়ের উদ্যোগে অনলাইন পশুর হাট তৃণমূল পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে সারা দেশে সাধারণ হাট ও অনলাইন মিলিয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের কোরবানির পশু বিক্রি হয়েছিল। একই বছরে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৯৬টি পশু বিক্রি হয়।
তবে এবার কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো তথ্য সংগ্রহ না হওয়ায় অনলাইনে মোট কত পশু বিক্রি হয়েছে, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
তৎকালীন এটুআইয়ের সলিউশন আর্কিটেকচারাল স্পেশালিস্ট ও ই-কমার্স প্রধান রেজওয়ানুল হক জামির পর্যবেক্ষণ, “আলাদা আয়োজন না থাকলেও অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রি এ বছর অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে।”
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, খামার মালিক ও অনলাইন ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছরে অনলাইন পশু বেচাকেনার জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে উচ্চ-মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এখন অনলাইন লেনদেন, হোম ডেলিভারি এবং স্বচ্ছ ডিজিটাল বিপণনের ওপর আগের চেয়ে বেশি আস্থা রাখছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিপণন, পেশাদার আলোকচিত্র, লাইভ ভিডিও স্ট্রিমিং, ড্রোন ফুটেজ এবং ভিডিও কলে পশু দেখানোর সুবিধা অনলাইন কোরবানির হাটকে আরও বিস্তৃত করছে।
/ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউএম/



