ঢাকার শিশুরা গড়ে ৫ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিন দেখে: আইসিডিডিআর,বি

ঢাকার শিশুরা গড়ে ৫ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিন দেখে: আইসিডিডিআর,বি
১৪ মে, ২০২৬ ১৪:১৩  

ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিন দেখে কাটায়, যা অপর্যাপ্ত ঘুম, স্থূলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি)।

সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার অনেক শিশু মোবাইল, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। এর ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে, মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও খারাপ প্রভাব পড়ছে।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের (তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম) ছয় বছর থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর এই গবেষণা করা হয়।

গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি জার্নাল অফ মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকরা শিশুদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের শারীরিক পরীক্ষা করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু সহজ প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে দেখেছেন শিশুরা কত সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা ঠিকমতো ঘুমায় কি না, তাদের ওজন স্বাভাবিক কি না এবং তাদের আচরণ বা মানসিক স্বাস্থ্যে কোনো সমস্যা আছে কি না।

এই প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে শিশুদের ঘুম, আচরণ ও মানসিক অবস্থার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই প্রশ্নপত্রের মধ্যে পিটসবার্গ স্লিপ কোয়ালিটি ইনডেক্স (পিএসকিউআই), স্ট্রেংদস অ্যান্ড ডিফিকাল্টিস কোয়েশ্চেনেয়ার (এসডিকিউ) এবং ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েল-বিয়িং অ্যাসেসমেন্ট (ডিএডব্লিউবিএ) অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে চারজন শিশুই (৮৩%) প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় দুই ঘণ্টার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে শিশুরা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার এবং গেমিং ডিভাইসে দিনে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা সময় কাটায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এক-তৃতীয়ংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথাব্যথায় ভুগছে। যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে কেবল ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা এই বয়সের শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমের তুলনায় অনেক কম।

এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার এবং যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে তাদের মধ্যে এই হার বেশি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, শৈশবে দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের অভাব স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুইজন শিশু দুশ্চিন্তা, অতি-চঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।

গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার বিভিন্নভাবে শিশুদের ক্ষতি করতে পারে। রাতে স্ক্রিন ব্যবহার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে ঘুমের স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করে। এ ছাড়া দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলা কমে গিয়ে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত সময় স্ক্রিন ব্যবহার চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি, মাথাব্যথা এবং মনোযোগ কমিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে।

অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের অন্যদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা কমে যায়, যা তাদের মন-মেজাজ, অনুভূতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে অপর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, স্থূলতা, উদ্বেগ এবং পড়াশোনায় দুর্বল ফলাফলের যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

এই গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআর,বি-র অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, ‘বাবা-মায়ের উচিত শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা বা চোখের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বাইরের খেলাধুলার প্রতি অনীহা অথবা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা না করা, কারণ এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের লক্ষণ হতে পারে যা তাদের সন্তানদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।’

গবেষকরা শিশুদের চোখের যত্নে ‘২০-২০-২০’ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে।

আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘ডিজিটাল ডিভাইস এখন জীবনের অংশ হলেও শিশুদের সুস্থতার জন্য সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী স্কুলগামী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দিনে দুই ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করার জন্য তাদের বাইরের খেলাধুলা, শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ডিজিটাল ডিভাইস-মুক্ত পারিবারিক সময় কাটাতে উৎসাহিত করা। শিশুদের বিতর্ক, দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া এবং টবের গাছের যত্ন নেওয়ার মতো ভালো ও সৃজনশীল কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।’

গবেষকরা বলেছেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয় বরং শিশুদের বাড়িতে ও স্কুলে স্বাস্থ্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য সহজ নির্দেশিকা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অদৃশ্য মহামারী নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপমূলক গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময়।

ডিবিটেক / এসএ/ এমআই