ডিজিটাল দেয়াল ভেঙে ৩৬ জুলাইয়ের সূর্যোদয়
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কেবল রাজপথের আন্দোলন ছিল না; তা ছিল ভার্চুয়াল জগতের এক নজিরবিহীন প্রতিরোধ। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের তীব্রতা ভাঙতে ১৮ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই প্রথম দফায় দেশের সব মোবাইল ডেটা ও ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ক্যালেন্ডারের পাতা বলছিল সময়টা আগস্টের প্রথম সপ্তাহ। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের বুকের ভেতরে তখন জ্বলছিল ক্ষোভের ‘৩৬ জুলাই’। ২০২৪ সালের সেই দিনগুলোতে রাজপথের উত্তাপ আর ভার্চুয়াল জগতের সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছিল বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম নজিরবিহীন গণসংগ্রাম। আজ ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট- ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’-এর দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে সেই রক্তঝরা দিনগুলো, যখন কোটি মানুষের ডিজিটাল কণ্ঠরোধ করতে ব্ল্যাকআউটের দেয়াল তোলা হয়েছিল, আর সেই দেয়াল ভেঙে রাজপথে নেমে এসেছিল ছাত্র-জনতা।
১ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে যার যাত্রা, তা দ্রুত রূপ নেয় অধিকার আদায়ের তীব্র গণসংগ্রামে। কিন্তু আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রশাসন বেছে নেয় তথ্যপ্রবাহ বন্ধের এক আত্মঘাতী পথ। ১৭ জুলাই হঠাৎ মোবাইল ইন্টারনেট (ফোর-জি) বন্ধ করে দিয়ে তরুণদের লাইভ স্ট্রিমিং ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয়।
১৮ জুলাই রাতে নেমে আসে দেশের ইতিহাসের অন্ধকারতম ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট’। সাবমেরিন ক্যাবল ও আন্তর্জাতিক টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল (ITC) লেভেলে কৃত্রিমভাবে সরবরাহ বন্ধ করে একটানা প্রায় পাঁচ দিন (১৮–২৩ জুলাই) পুরো দেশকে বহির্বিশ্ব থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা হয়।
|
|
৪জি মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ
|
|
|
সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট (ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল বন্ধ)
|
|
|
সীমিত ব্রডব্যান্ড (সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক অবরুদ্ধ)
|
|
|
মোবাইল নেট চালু, কিন্তু মেটা ও ক্যাশ সার্ভার ব্লক
|
|
|
পুনরায় মোবাইল ডেটা সম্পূর্ণ বন্ধ
|
|
|
বেলা ১:১৫ মিনিটে পূর্ণাঙ্গ ইন্টারনেটের মুক্তি
|
সরকারের পক্ষ থেকে মহাখালী ডেটা সেন্টারে অগ্নিকাণ্ডের অজুহাত দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে সুনির্দিষ্ট তথ্যে প্রমাণিত হয় যে বিটিআরসির নির্দেশে আইআইজি ও আইএসপিগুলোর ব্যান্ডউইথ কেটে দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে আসল সত্য। তৎকালীন টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) ও সরকারের শীর্ষ মহল থেকে সরাসরি নির্দেশ দিয়ে আন্তর্জাতিক টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল (ITC) এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (IIG) থেকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। মহাখালী ডেটা সেন্টারে অগ্নিকাণ্ডকে কেবল অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এমনকি ভিপিএন (VPN) সেবা যেমন—প্রোটন বা নর্ড বন্ধ করে বিকল্প উপায়েও তথ্য সংগ্রহের পথ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল তৎকালীন প্রশাসন।
ভার্চুয়াল দেয়াল ও নাগরিক সাংবাদিকতার জয়
সব ধরনের ডিজিটাল নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ দমে যায়নি। ফেসবুকের লাল প্রোফাইল ছবি, দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি) ও ভিডিও ফুটেজ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিরোধ বার্তা হয়ে। মূলধারার বেশ কিছু গণমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ থাকায় নাগরিক সাংবাদিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয় ইউটিউব ও ব্যক্তিগত সামাজিক মাধ্যম।
আজকে দুই বছর পূর্তিতে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যচিত্রে দেখা যায়, কীভাবে তরুণরা একস্থান থেকে অন্যস্থানে অফলাইন মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে বা সীমিত উপায়ে তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করে মাঠের বাস্তব চিত্র বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিল।
অর্থনৈতিক ক্ষত ও বিকল্প প্রযুক্তির প্রতিরোধ
ইন্টারনেট কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল লাখ লাখ মানুষের রুটিরুজি। NetBlocks এবং ‘ইন্টারনেট সোসাইটি’ (ISOC)-এর তথ্যমতে, সেই ব্ল্যাকআউটের ৫ দিনে প্রতি দিন দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০০ কোটি টাকা (১০ বিলিয়ন টাকা)। সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিল ফ্রিল্যান্সিং খাত, আউটসোর্সিং এবং এফ-কমার্স (ফেসবুক ভিত্তিক ব্যবসা)। বৈদেশিক ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে কাজ হারিয়েছিলেন হাজারও তরুণ-তরুণী।
তবে বাধার মুখে উদ্ভাবন থামেনি। ইন্টারনেট বন্ধ হলেও মানুষ থেমে থাকেনি:
ভিপিএন (VPN) বিপ্লব: সামাজিক মাধ্যম ব্লক থাকা অবস্থায় ExpressVPN ও NordVPN-এর মতো অ্যাপ ব্যবহারের হার বাংলাদেশে একলাফে ৫,০০০% বৃদ্ধি পায়।
অফলাইন মেসেজিং: নেটওয়ার্ক না থাকায় তরুণরা ব্লুটুথ ও পিয়ার-টু-পিয়ার (P2P) প্রযুক্তির Bridgefy অ্যাপ ব্যবহার করে কাছাকাছি দূরত্বে খবর ও দিকনির্দেশনা আদান-প্রদান করেন।
এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন: আন্দোলনকারীরা পরবর্তী নির্দেশনার জন্য টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং সিগন্যালের মতো নিরাপদ মাধ্যম ব্যবহার করতে থাকেন।
স্লোগানের গর্জন ও ভার্চুয়াল রাজপথ
নেটওয়ার্কের গতি টু-জিতে নামিয়ে এনেও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও রোখা যায়নি। অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিবর্ষণের ভিডিও চিত্র। বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে একযোগে ট্রেন্ড করতে থাকে #QuotaReformProtest এবং #StepDownHasina।
ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের প্রতিবাদ রূপ নেয় রাজপথের স্লোগানে—
-
“চাইলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার!”
-
“আমার ভাই মরল কেন? প্রশাসন জবাব চাই!”
-
“ভয় পেলে শেষ, লড়লে বাংলাদেশ!”
-
“দফা এক, দাবি এক, হাসিনা সরকারের পতন!”
৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে এক দফা পদত্যাগের দাবি ঘোষণার পর তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন চূড়ান্ত রূপ নেয়। ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে লাখো জনতা। জাতিসংঘের তথ্যমতে, রক্তক্ষয়ী এই আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ১,৪০০ মানুষ এবং আহত হন ২০ হাজারের বেশি নাগরিক।
আগস্টের দুপুর ও রেকর্ড ৪৬০০ জিবিপিএস
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট। ভোরে মোবাইল ইন্টারনেট দ্বিতীয়বারের মতো বন্ধ করে দেওয়া হলেও সকাল গড়াতেই শাহবাগ ও গণভব অভিমুখে আছড়ে পড়ে লাখো মানুষের মিছিল। দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। সেনাপ্রধানের ভাষণ প্রচারের ঠিক ওই মুহূর্তে দীর্ঘদিনের তথ্যক্ষুধায় বাকরুদ্ধ দেশের মানুষ একযোগে ইন্টারনেটে যুক্ত হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, ওই মুহূর্তেই দেশে রেকর্ড ৪,৬০০ জিবিপিএস (Gbps) ব্যান্ডউইথ ব্যবহৃত হয়েছিল।
ইন্টারনেট এখন মৌলিক অধিকার
অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান আইনি সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশে তথ্যপ্রবাহের চিরস্থায়ী স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে:
-
ব্ল্যাকআউটকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা: সংবিধিবদ্ধ সংস্কারের মাধ্যমে আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করাকে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
-
অবকাঠামোগত বৈচিত্র্য: শুধু ক্যাবলনির্ভর সংযোগের বাইরে গিয়ে উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা (যেমন: স্টারলিংক) পরিচালন নীতি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো একক বিন্দু থেকে ইন্টারনেট বন্ধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
-
অবাধ ব্যান্ডউইথ: ২০২৬ সালের আগস্ট নাগাদ দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার ৪.৫ টেরাবিট পার সেকেন্ড (Tbps) অতিক্রম করেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নজরদারি বা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের আইনি পথ বন্ধ করা হয়েছে।
- ডেটা সুরক্ষা ও নজরদারি বন্ধ: নাগরিকদের ব্যক্তিগত ফোনে বেআইনি আড়ি পাতা ও নজরদারি বন্ধে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সেই ৩৬ দিন প্রমাণ করেছে যে, ফাইবার অপটিক ক্যাবল কেটে কিংবা সার্ভার রুম বন্ধ করে একটি জাতির স্বাধীনতা ও জানার স্পৃহাকে চিরতরে রুদ্ধ করা যায় না। দুই বছর পর ২০২৬ সালের এই ৫ আগস্টে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ স্মরণ করছে সেই ১,৪০০ জন শহীদকে, যাদের রক্তে ও ত্যাগে ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের শৃঙ্খল ভেঙে উদিত হয়েছিল মুক্ত তথ্যপ্রবাহ ও গণতন্ত্রের এক নতুন সূর্য।
//ডিবিটেক/এসএমআই/এমএসআই//