সাইবার সুরক্ষার নামে নিয়ন্ত্রণের নতুন খসড়া?
এটি সাইবার নিরাপত্তার সংশোধনী নয়, বরং বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ এবং গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের হাতে ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়ার সংশোধনী—এমন আশঙ্কাই তৈরি করছে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো।
সাইবার অপরাধ দমনে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক আইন প্রয়োজন—এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর সর্বশেষ খসড়া পর্যালোচনা করলে প্রশ্ন উঠছে, এর কেন্দ্রবিন্দু কি সত্যিই সাইবার নিরাপত্তা, নাকি অনলাইন বক্তব্য ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ?
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পরামর্শ সভায় আলোচিত খসড়ায় গুজব ও অপতথ্যকে নতুন অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা, মানহানি ও ‘হেয়প্রতিপন্ন’ করাকে আবার অপরাধের আওতায় আনা, বিচারব্যবস্থার পরিধি বদলানো এবং কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির নতুন বিধান এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের সভার সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে।
এখানে আপত্তি সাইবার অপরাধ দমনের বিরুদ্ধে নয়। আপত্তি হলো—সাইবার নিরাপত্তার নামে এমন ক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে কি না, যা শেষ পর্যন্ত মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা, নাগরিক অনুসন্ধান ও সমালোচনার ওপর প্রয়োগ করা যেতে পারে।
সাইবার আইনের জীবনচক্র
বাংলাদেশে সাইবার আইন নিয়ে বিতর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণীত হয়। এর নানা ধারা নিয়ে দীর্ঘদিন সমালোচনা ছিল। পরে ২০২৩ সালে নাম ও কিছু বিধান পরিবর্তন করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। তখনও সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, পুরোনো আইনের অনেক বিতর্কিত কাঠামো নতুন আইনে রয়ে গেছে।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে। পরে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে নির্বাচিত সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ প্রণীত হয়। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির সরকারি তালিকাতেও ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ এবং ২০২৬ সালের আইন—দুটিই পৃথকভাবে নথিভুক্ত রয়েছে।
এরপর ১ জুলাই ২০২৬ ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ গেজেট হয়। সরকারি গেজেটের তালিকায় এটি ২০২৬ সনের ৯৯ নম্বর আইন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু সেই সংশোধনের পরও নতুন করে আরও একটি সংশোধনী খসড়া সামনে এসেছে। জুলাইয়ে এ খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করার জন্য মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয় এবং ১৫ জুলাই কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে এ নিয়ে আবার পরামর্শ সভা হয়েছে।
অর্থাৎ আলোচ্য বিষয়টি এখন আর কেবল আইন প্রণয়নের প্রশ্ন নয়; বরং একটি সদ্য প্রণীত আইনের পরপরই আরও বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণমূলক বিধান যুক্ত করার প্রশ্ন।
১. বিলের প্রস্তাবনাই বিলের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে
সাইবার সুরক্ষা আইনের মূল দর্শন ছিল নাগরিকের অধিকার ও সাইবার নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন আসে—যে ধরনের বিধান অতীতে মৌলিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে, সেগুলোই যদি নতুন নামে ফিরে আসে, তাহলে আইনের চরিত্র কতটা বদলাল?
প্রস্তাবিত নতুন ২৬ক ধারাই এই প্রশ্নকে সবচেয়ে তীব্র করে।
২. নতুন ২৬ক: ‘গুজব’-এ ১০ বছর
খসড়ায় সাইবার স্পেসে ‘গুজব ও অপতথ্য’ প্রকাশ বা প্রচারকে নতুন অপরাধ করার প্রস্তাব রয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
সমস্যার জায়গাটি শুধু শাস্তির মাত্রা নয়; ‘গুজব’-এর সংজ্ঞা।
প্রস্তাবিত সংজ্ঞায় অসমর্থিত বা যাচাই না করা তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে এমন ক্ষেত্রে গুজব বলা হচ্ছে, যা বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে।
এখানে তিনটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, তথ্যটি মিথ্যা হওয়া কি আবশ্যক?
না। ‘অযাচাইকৃত’ হওয়াই যথেষ্ট হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃততা কি আবশ্যক?
‘অপতথ্য’-এর ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য বা ইচ্ছাকৃততার প্রশ্ন থাকলেও ‘গুজব’-এর প্রস্তাবিত সংজ্ঞায় সেটি একইভাবে স্পষ্ট নয়।
তৃতীয়ত, প্রকৃত ক্ষতি হওয়া কি আবশ্যক?
না। ‘ক্ষতি বা অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা’ও বিবেচ্য হতে পারে।
এখানেই সাংবাদিকতার সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। সংবাদ প্রকাশের কাজের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—সরকারি নিশ্চিতকরণের আগেও তথ্য প্রকাশ করা। পরে কোনো তথ্য সত্য প্রমাণিত হলেও, প্রকাশের সময় সেটি ‘যাচাই না করা’ ছিল কি না—এই প্রশ্নটি তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ ধরনের অস্পষ্টতা থাকলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, নাগরিক সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়।
আর ধারা ২৭ অনুযায়ী সহায়তা বা সহযোগিতার অপরাধের শাস্তিও মূল অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে একটি তথ্য শেয়ার বা পুনঃপ্রচার করাও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শাস্তির তুলনায় অসামঞ্জস্য
খসড়ার প্রস্তাবিত ২৬ক ধারার সর্বোচ্চ ১০ বছরের শাস্তি বিশেষভাবে প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ এটি এমন একটি অপরাধের জন্য, যেখানে ‘অযাচাইকৃত’ তথ্যই অপরাধের একটি ভিত্তি হতে পারে।
অন্যদিকে বর্তমান কাঠামোয় সাইবার প্রতারণা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে গুরুতর আক্রমণ এবং সাইবার সন্ত্রাসের মতো অপরাধের সঙ্গে শাস্তির মাত্রার তুলনা করলে ‘গুজব’-এর প্রস্তাবিত শাস্তি কতটা আনুপাতিক—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এখানে মূল প্রশ্ন শাস্তি দেওয়া হবে কি না নয়; বরং অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তির মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না।
৩. সুরক্ষার বিধান যেখানে আছে, সেখানে নেই কেন?
খসড়ার অন্য কিছু বিধানে জনস্বার্থ, আইন প্রয়োগ, তদন্ত, চিকিৎসা, অনুমোদিত গবেষণা, শিক্ষা কিংবা হুইসেলব্লোয়িংয়ের মতো বৈধ ব্যবহারের জন্য ব্যতিক্রম রাখার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়েছে।
তাহলে মতপ্রকাশ-সম্পর্কিত ধারাগুলোতে সাংবাদিকতা, ব্যঙ্গ-রসিকতা, গবেষণা, সৎ সমালোচনা বা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের জন্য স্পষ্ট সুরক্ষা থাকবে না কেন?
একই আইনে যখন ব্যতিক্রম তৈরির কৌশল প্রয়োগ করা সম্ভব, তখন সবচেয়ে সংবেদনশীল বক্তব্য-সম্পর্কিত ধারায় তা না থাকা নিছক drafting oversight হিসেবে দেখলে প্রশ্ন থেকেই যায়।
৪. মানহানি ও ‘হেয়প্রতিপন্ন’ আবার কেন?
খসড়ায় বর্তমান ২৫ ধারার যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটর্শন ও শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত অপরাধের তালিকায় মানহানি, ‘হেয়প্রতিপন্ন’ ও বুলিং যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। শাস্তিও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিশু যৌন নিপীড়ন বা সেক্সটর্শনের মতো গুরুতর অপরাধের শাস্তি কঠোর করার প্রয়োজন নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু একই ধারায় অনলাইন মানহানি ও ‘হেয়প্রতিপন্ন’-এর মতো বিস্তৃত ধারণাকে যুক্ত করা হলে আইন প্রয়োগের সীমা কোথায়—সেটিই প্রশ্ন।
বিশেষ করে ‘হেয়প্রতিপন্ন’-এর সংজ্ঞা যদি এমনভাবে বিস্তৃত হয়, যার আওতায় নেতিবাচক পর্যালোচনা, জবাবদিহিমূলক প্রতিবেদন, ব্যঙ্গচিত্র বা মিমও পড়তে পারে, তাহলে সমালোচনা ও অপরাধের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিচারযোগ্যতা ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা। খসড়ায় মানহানি-সংক্রান্ত অপরাধকে বিচারব্যবস্থার এমন কাঠামোর মধ্যে রাখার প্রস্তাব রয়েছে, যা অতীতে ডিজিটাল আইনের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
৫. সাইবার অপরাধের বিচার কি মোবাইল কোর্টে?
খসড়ায় সব সাইবার অপরাধকে একই বিচারিক কাঠামোর মধ্যে না রেখে গুরুতর কিছু অপরাধ সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং অন্যান্য অপরাধ প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানোর প্রস্তাব রয়েছে। কিছু অপরাধ মোবাইল কোর্টের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হলে সেখানে বিচারও হতে পারে।
এখানে কাঠামোগত প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ফরেনসিক, অডিও-ভিডিও যাচাই, তথ্য-উপাত্তের উৎস নির্ধারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত বা সম্পাদিত কনটেন্ট শনাক্ত করার মতো প্রযুক্তিগত বিষয় জড়িত। খসড়াতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অডিও-ভিডিও তৈরি বা সম্পাদনার বাস্তবতা স্বীকার করা হয়েছে।
তাহলে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংক্ষিপ্ত বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি স্ক্রিনশট, অডিও বা ভিডিওর সত্যতা নির্ধারণ কতটা সম্ভব—এ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া দরকার।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিচারিক স্বাধীনতা ও ন্যায্য বিচারের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিচারকে যদি দ্রুততার নামে এমন ব্যবস্থায় নেওয়া হয়, যেখানে প্রমাণ যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত, তাহলে সেটি ন্যায়বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
৬. ব্লক করার ক্ষমতা কার হাতে যাচ্ছে?
খসড়ায় কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থা বা বাহিনীকে এর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এখানে ‘অন্যান্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থা বা বাহিনী’ কথাটিই বড় প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার পরিধি যদি আইনে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত না থাকে, তাহলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ক্ষমতার ক্ষেত্র ক্রমশ বিস্তৃত হতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ‘অপতথ্য বা গুজব’, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘মানহানিকর’ এবং রাষ্ট্রের জন্য ‘অবমাননাকর’ কনটেন্টও অপসারণ বা ব্লকের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’—এই শব্দবন্ধের সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা না থাকলে তার সীমা কোথায়?
তবে খসড়ার একটি স্বচ্ছতা-সংক্রান্ত নীতি অবশ্যই রাখা উচিত—কোন কনটেন্ট কেন ব্লক বা অপসারণ করা হয়েছে, তার তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের ব্যবস্থা। স্বচ্ছতা ছাড়া ব্লকিং ক্ষমতা সহজেই নির্বাহী ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিকার। যে সংস্থা কনটেন্ট ব্লক করবে, তার কাছেই যদি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে হয়, তাহলে স্বাধীন প্রতিকারের প্রশ্ন ওঠে। এ ক্ষেত্রে আদালতের কাছে যাওয়ার পথ স্পষ্ট ও কার্যকর থাকা জরুরি।
৭. তদারকি কমছে, দায়মুক্তি বাড়ছে?
খসড়ায় জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের সভার ব্যবধান তিন মাস থেকে ছয় মাস করার প্রস্তাব রয়েছে—এমন তথ্য আলোচ্য তুলনামূলক নথি ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
একই সময়ে নির্বাহী সংস্থার কনটেন্ট ব্লক ও অপসারণের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলে তদারকির ব্যবধান বাড়ানোর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা জরুরি।
আরও বড় প্রশ্ন কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি নিয়ে। খসড়ায় কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, সদস্য এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘সরল বিশ্বাসে’ করা কাজের জন্য দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলার দায় থেকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘সরল বিশ্বাস’ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা হতে পারে। কিন্তু এর সীমা, সংজ্ঞা ও জবাবদিহি স্পষ্ট না হলে দায়মুক্তি নিজেই অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করে।
আসল প্রশ্নটি এখানেই
সাইবার অপরাধ দমনে আধুনিক আইন দরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেক, র্যানসমওয়্যার, ম্যালওয়্যার, পরিচয় চুরি, সাইবার প্রতারণা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর ওপর আক্রমণ—এসব বাস্তব হুমকি। সরকারকে এগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর আইন করতেই হবে।
কিন্তু নিরাপত্তা আর নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়।
সাইবার নিরাপত্তার একটি আধুনিক আইন নাগরিকের ডিজিটাল অধিকারও সুরক্ষিত করবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো, সরকারি ব্যবস্থা, ব্যবসা ও নাগরিকের তথ্যকে সাইবার হামলা থেকে রক্ষা করবে।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’, ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ কিংবা ‘অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা’র মতো অস্পষ্ট শব্দের ওপর দীর্ঘ কারাদণ্ড ও বিস্তৃত প্রশাসনিক ক্ষমতা নির্ভর করে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬ ইতোমধ্যে প্রণীত হওয়ার পর এত দ্রুত নতুন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা সরকার ব্যাখ্যা করতে পারে। ২০২৬ সালের জুলাইয়েই একটি সংশোধনী আইন গেজেট হয়েছে এবং এখন আবার নতুন খসড়া নিয়ে পরামর্শ চলছে।
সুতরাং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—আমরা কি সত্যিই সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করছি, নাকি নিরাপত্তার কাঠামোর ভেতরে বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের পুরোনো পদ্ধতিগুলো ফিরিয়ে আনছি?
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। নতুন আইন যদি একই ধরনের অস্পষ্ট সংজ্ঞা, অতিরিক্ত শাস্তি, বিস্তৃত ব্লকিং ক্ষমতা, দুর্বল প্রতিকার ও কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির কাঠামো ফিরিয়ে আনে, তাহলে শুধু আইনের নাম বদলাবে; সমস্যার চরিত্র বদলাবে না।
একটি ভালো সাইবার আইন দরকার। কিন্তু সেই আইন নাগরিককে নিরাপদ করবে—নীরব নয়।
লেখক || পলিসি টেকনোলজিস্ট, ডাটা সায়েন্টিস্ট এবং গবেষক
সম্পাদকীয় নোট || প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং তা ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের সম্পাদকীয় অবস্থানকে অপরিহার্যভাবে প্রতিফলিত করে না। মতপ্রকাশের বৈচিত্রময়তাকে সমুন্নত রাখতে কোনো সম্পাদকীয় সেন্সরশিপ ছাড়াই টেক-থট প্রকাশ করা হয়।





