ক্লড দিয়ে ৩০০ ভুয়া সংবাদ, এআই অপপ্রচারে বাংলাদেশি নেটওয়ার্ক 

এআই দিয়ে আ.লীগের পক্ষে ভুয়া সংবাদ তৈরি, ২৯ অ্যাকাউন্ট বন্ধ

  • ২৯ ক্লড অ্যাকাউন্টে ১৬ মাসের অপব্যবহার
  • তৈরি ৩০০ বানোয়াট প্রতিবেদন ও ১,৫০০ ছবি নির্দেশনা
  • ফেসবুক-ইউটিউব-টিকটকে প্রচারের চেষ্টা

এআই দিয়ে আ.লীগের পক্ষে ভুয়া সংবাদ তৈরি, ২৯ অ্যাকাউন্ট বন্ধ
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:০৭  

বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত একটি স্বয়ংক্রিয় প্রচারণা নেটওয়ার্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের তৈরি চ্যাটবট ক্লড ব্যবহার করে প্রায় ১৬ মাসে বাংলায় অন্তত ৩০০টি বানোয়াট প্রতিবেদন এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবির নির্দেশনা তৈরি করেছে। এর মধ্যে একজন মাত্র ব্যক্তির ২৯টি অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করছিলেন ভুয়া সব সংবাদ। তা করছিলেন বাংলাদেশের গাইবান্ধা থেকে, উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচার।

‘ডিটেক্টিং অ্যান্ড কাউন্টারিং মিসইউজ অব এআই: সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে অ্যানথ্রপিক। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। খবর বলছে, এই কার্যক্রমকে ‘জিটিজি-৫৪০০৬’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে  প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যানথ্রপিকের তদন্ত অনুযায়ী, নেটওয়ার্কটির প্রচারণার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। এর কনটেন্ট মূলত আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং দলটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে তৈরি করা হতো। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় এ কার্যক্রম সরকারের পক্ষে পরিচালিত কোনো প্রচারণা ছিল না; বরং বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে পরিচালিত হয়েছিল।

২৯ অ্যাকাউন্টে স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, গাইবান্ধা জেলার একজন ব্যক্তি শনাক্তকরণ এড়াতে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করেন। প্রায় ১৬ মাস ধরে চলা কার্যক্রমে ‘ফেক_নিউজ_৩.পিওয়াই’ নামের একটি কাস্টম সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। সফটওয়্যারটি ক্লডের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে প্রতিটি ব্যাচে ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত বানোয়াট প্রতিবেদন এবং ১৫টি ছবি তৈরির নির্দেশনা বা প্রম্পট তৈরি করত।

অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, সফটওয়্যারটির অন্তত তৃতীয় সংস্করণ ব্যবহারের প্রমাণ তারা পেয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, পুরো কার্যক্রমে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি বানোয়াট প্রতিবেদন এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির নির্দেশনা তৈরি হয়েছিল। ক্লডে সরাসরি ছবি তৈরির সুবিধা না থাকায় এসব নির্দেশনা অন্য কোনো এআই মডেলে ব্যবহার করে ছবি তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছে অ্যানথ্রপিক।
তৈরি করা কনটেন্ট প্রথমে নির্দিষ্ট একটি ক্লাউড স্টোরেজ ফোল্ডারে জমা রাখা হতো। পরে সেগুলো অডিও-ভিডিওতে রূপান্তর করে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করা হতো।

চার বয়ানে রাজনৈতিক অপপ্রচার
অ্যানথ্রপিকের বিশ্লেষণে নেটওয়ার্কটির কনটেন্টে চারটি প্রধান বয়ান শনাক্ত করা হয়েছে।

প্রথমত, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিকে তালেবান-ধাঁচের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তা বাহিনীতে অনুপ্রবেশের পরিকল্পনাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট হত্যা পরিকল্পনা ও ঘাতক দলের গল্প প্রচার করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
চতুর্থত, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে বানোয়াট আর্থিক দুর্নীতি ও গোপন জোটের অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের একটি বার্তায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানতেন যে তারা ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছেন। কনটেন্টগুলো এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে তা আক্রমণাত্মক হলেও সহজবোধ্য হয় এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

ইউটিউব এপিআইয়ে স্বয়ংক্রিয় প্রকাশ
নেটওয়ার্কটির প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর আরেকটি অংশ ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে ভিডিও বাল্ক-আপলোড করতে সক্ষম ছিল। তৃতীয় পক্ষের একটি কনটিনিউয়াস ইন্টিগ্রেশন সেবার মাধ্যমে স্ক্রিপ্টটি পরিচালিত হতো এবং এক মাস আগেই নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ভিডিও প্রকাশের ব্যবস্থা ছিল।
অ্যানথ্রপিকের মতে, তৃতীয় পক্ষের এই সেবা ব্যবহারের ফলে প্রকৃত পরিচালকের ইন্টারনেট প্রোটোকল বা আইপি ঠিকানাও আড়াল করা সম্ভব হতো।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, নেটওয়ার্কটির কিছু বয়ান ভারতপন্থি ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এর পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণ তারা পায়নি।

তিন প্ল্যাটফর্মে ছড়ানোর চেষ্টা
অ্যানথ্রপিকের ‘ব্রেকআউট স্কেল’ অনুযায়ী, এ কার্যক্রমকে তৃতীয় শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। কারণ ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক—তিনটি প্ল্যাটফর্মেই বাংলাদেশকেন্দ্রিক একাধিক চ্যানেল ও প্রোফাইলে নেটওয়ার্কটির কনটেন্টের সঙ্গে মিলে যাওয়া ভিডিও শনাক্ত হয়েছে।
তবে পুরো কনটেন্ট কোন কোন চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছিল, তা নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর বাইরে আরও বিস্তৃত পরিসরে কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে অ্যানথ্রপিক।

সব ক্লড অ্যাকাউন্ট বন্ধ
অ্যানথ্রপিক জানায়, অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে নেটওয়ার্কটি শনাক্ত করার পর এর সঙ্গে যুক্ত সব ক্লড অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরির চেষ্টা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে নেটওয়ার্কটির আচরণগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে নতুন শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগ করেছে অ্যানথ্রপিক। তবে ক্লাউড স্টোরেজ ফোল্ডারের পরিচয় এবং আপলোড স্ক্রিপ্টের মতো কিছু কারিগরি তথ্য নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ না করে শুধু অংশীদারদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে মোট নয়টি এআই অপব্যবহারের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, উপসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন প্রভাব বিস্তারকারী নেটওয়ার্কও এতে অন্তর্ভুক্ত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে বাংলাদেশের ঘটনাটি ব্যতিক্রমী। এখানে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একজন ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করে তুলনামূলক বড় পরিসরে কনটেন্ট তৈরির কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন বলে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ক্লডের অপব্যবহার শনাক্ত ও প্রকাশ করা তাদের দায়িত্বের অংশ। গত আট মাসে সাইবার হামলা, ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার, নজরদারি, মডেল চুরি এবং জৈবিক অপব্যবহারের মতো বিভিন্ন ঘটনায় ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছে তারা।

অ্যানথ্রপিকের মতে, এআই এখন কম দক্ষ ব্যক্তি বা ছোট গোষ্ঠীকেও বড় পরিসরে সাইবার হামলা ও অপপ্রচার চালানোর সক্ষমতা দিচ্ছে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার, গবেষক ও অন্যান্য এআই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
//ডিবিটেক/এসএমই/ এমআইএস/ বিআরবি//