দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা?

ফেসবুক বায়োতে মৃত্যুর তারিখ, শিক্ষার্থীর রহস্যমৃত্যু

  • সাউথ পয়েন্টের শিক্ষার্থী অমিত ঘোষ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য ঘিরে আত্মহত্যার ধারণা, পরিবার বলছে দুর্ঘটনাও হতে পারে
  • নির্মাণাধীন ভবনে শিক্ষার্থী কীভাবে গেল, তদন্তের দাবি অভিভাবকদের

ফেসবুক বায়োতে মৃত্যুর তারিখ, শিক্ষার্থীর রহস্যমৃত্যু
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:১৯  

রাজধানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মালিবাগ ক্যাম্পাসের একটি ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত শিক্ষার্থী অমিত ঘোষ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। সোমবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে শ্যামলীর একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় কলেজজুড়ে শোকের ছায়া নেমেছে।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কলেজের দুই শিক্ষক গণমাধ্যমকে অমিতের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে রোববার তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়ার পর শ্যামলীর একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।

১৩ সেপ্টেম্বর, রবিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মালিবাগ ক্যাম্পাসের ৬ নম্বর ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয় অমিত। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে শ্যামলীর একটি হাসপাতালে নিয়ে যান।

ঘটনাটি দুর্ঘটনা নাকি অমিত ইচ্ছাকৃতভাবে ভবন থেকে পড়ে গেছে—তা নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। কয়েকজন শিক্ষক ঘটনাটিকে আত্মহত্যার চেষ্টা বলে ধারণা করলেও পরিবারের পক্ষ থেকে তা মানা হয়নি। তাদের বক্তব্য, ভবনটি নির্মাণাধীন হওয়ায় দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগেই মৃত্যুর তারিখ

ঘটনার পর অমিত ঘোষের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলের কিছু তথ্য নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। তার প্রোফাইলের বায়োতে জন্মতারিখের পাশাপাশি ‘01/11/2007-13/09/2026’ লেখা ছিল। এর সঙ্গে ছিল একটি ইংরেজি বাক্য—‘Stand proud. You're limited edition. Only one ever created.’

ঘটনার আগেই প্রোফাইলে মৃত্যুর তারিখ লেখা থাকার বিষয়টি দেখে কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক ঘটনাটিকে আত্মহত্যার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। তবে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বায়োতে থাকা তথ্য দিয়ে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা যায় না। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

নির্মাণাধীন ভবন নিয়ে প্রশ্ন

অভিভাবকদের একটি অংশের দাবি, অমিত যে ভবন থেকে পড়ে যায়, সেটির নির্মাণকাজ চলছিল। ভবনের ১১তম তলা পুরোপুরি খোলা এবং সেখানে কাজ চলমান ছিল। শিক্ষার্থীদের সেখানে যাওয়ার অনুমতি ছিল না বলেও তারা জানান।

তাদের প্রশ্ন, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অমিত কীভাবে সেখানে গেল এবং ওই স্থানে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল—তা তদন্ত করা উচিত।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য

ঘটনা সম্পর্কে সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অন্তত তিনজন শিক্ষক ও দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে অমিত ৬ নম্বর ভবনের ওপরের অংশ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অভিভাবক শাকিলা আক্তার দীপা সাউথ পয়েন্ট স্কুলের একটি ফেসবুক গ্রুপে লিখেছেন, ‘সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের একটা ছেলে নিজে নিজেই লাফ দিয়েছে। সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে ওর ব্যাগে। সঙ্গে সঙ্গে ওকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এখন ওর কী অবস্থা তা বলতে পারছি না।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের সামনেই ঘটনাটা ঘটেছে। এখনো আমার হাত-পা কাঁপছে। স্থির হতে পারছি না। একদম মুখ-চোখ থেঁতলে গেছে। ছেলেটা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুক সেই দোয়া করি।’

তবে এসব বক্তব্যের পাশাপাশি ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা স্বাধীনভাবে তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

‘গেমে আসক্তি’? 

ঘটনার পর স্কুলের বিভিন্ন অভিভাবক গ্রুপে অমিতের গেম খেলার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। সাউথ পয়েন্ট স্কুলের মালিবাগ ক্যাম্পাসের পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মাধ্যমের দিবা শাখার অভিভাবকদের গ্রুপে গণিতের শিক্ষক গোপাল দেবনাথ লিখেছেন, ‘আমাদের দ্বাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী anime নামক মোবাইল গেমে আসক্ত হয়ে আজ ৬ নম্বর ভবনের ১১তলা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। বর্তমানে সে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন। সে সুইসাইড নোট রেখে গেছে। সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক গোপাল দেবনাথ গণমাধ্যশকে বলেছেন, ‘৬ নম্বর ভবনের ১১তলা থেকে লাফ দিয়েছে, এটুকুই আমি শুনেছি। কিন্তু সে লাফ দিয়েছে, নাকি পড়ে গেছে তা জানি না। আর তার ব্যাগে নাকি সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। সবই শুনেছি। আমি কিছু দেখিনি। গেমে আসক্তির বিষয়টিও শোনা।’

অর্থাৎ শিক্ষক নিজেও ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেননি এবং গেমে আসক্তির বিষয়টি শোনা তথ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলে এটিকে অমিতের মৃত্যুর কারণ হিসেবে নিশ্চিত করার সুযোগ নেই।

ঢামেকের তথ্য

ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে জানান, আহত শিক্ষার্থী অমিত ঘোষকে সকালে ঢামেক হাসপাতালে আনা হয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পরিবারের সদস্যরা তাকে শ্যামলীর একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢামেক থেকে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

ঘটনা সম্পর্কে জানতে অধ্যক্ষ মো. শামসুল আলম ও উপাধ্যক্ষ জেরিনা ফেরদৌসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি। অমিতের পরিবারের একটি মোবাইল নম্বরেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

অমিতের মৃত্যু দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে—এটি নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন।
//ডিবিটেক/এসএমই/এমআইএস/এফওইএম//