পাকিস্তানি হাইকমিশনারের বাসভবনে আগুন ও অপপ্রচারের নেপথ্যে

বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটকে কেন্দ্র করে নাফসিনকে জড়িয়ে গুজব ছড়ানোর তথ্য উন্মোচন

  • শর্ট সার্কিটের আগুন নিয়ে ফেসবুকে ৩২টি অসত্য পোস্ট শনাক্ত
  • এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে নাফসিনের বিকৃত ছবি ছড়ানো হয়
    বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটকে কেন্দ্র করে নাফসিনকে জড়িয়ে গুজব ছড়ানোর তথ্য উন্মোচন
    ৯ আগষ্ট, ২০২৬ ০৯:৪১  

    ঢাকা: গুলশানে পাকিস্তানি হাইকমিশনার ইমরান হায়দারের বাসভবনে গত ৬ আগস্ট রাতে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পরিকল্পিত কুচক্রী অপপ্রচারের তথ্য উন্মোচন করেছে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। আগুন লাগার মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয়কর্মী নাফসিন মেহনাজকে জড়িয়ে ভিত্তিহীন দাবি ছড়াতে শুরু করে একটি গোষ্ঠী। 

    রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অন্তত ৩২টি আইডি ও পেজ থেকে এই অসত্য দাবি প্রচার করা হয়। সেখানে অনৈতিক সম্পর্ক ও আত্মহত্যার চেষ্টার মতো কাল্পনিক গল্প জুড়ে দেওয়া হয়। অথচ ফায়ার সার্ভিস ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি ডিভিশন নিশ্চিত করেছে—অগ্নিপ্রকোপটির আসল কারণ ছিল বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা পোড়া একটি টেলিভিশন।

    গবেষণায় দেখা যায়, ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর পোস্টগুলোকে মূলত ৫টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Google Gemini AI) ব্যবহার করে নাফসিনের ছবি বিকৃত করা হয় এবং ভূয়া গর্ভবতী সাজিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করা হয়। এমনকি ভারতের ‘GEOPulse’ নামক কন্টেন্ট প্ল্যাটফর্মেও এই অসত্য ভিডিও লাখ লাখ বার দেখা হয়। মূলত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সাবেক পাকিস্তানি হাইকমিশনার সৈয়দ আহমেদ মারুফের একটি আমন্ত্রণে অংশ নেওয়া ছবিকে কেন্দ্র করেই শুরু থেকেই নাফসিনকে বারবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে টার্গেট বানিয়ে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

    এসব পোস্টের কোনোটিতে ‘এমন শুনলাম’, কোনোটিতে ‘দাবি’ আবার কোনোটিতে এটিকে সিদ্ধান্তমূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়। অনুসন্ধান বলছে,  নাফসিনকে জড়িয়ে এসব অপপ্রচার সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে পৌঁছে গেছে ভারতেও। GEOPulse নামে ভারতীয় একটি কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মে (ফেসবুক, ইউটিউব) একই দাবির একটি ভিডিও দেখা হয়েছে লক্ষাধিক বার।

    রিউমর স্ক্যানার আলোচিত এই ইস্যুর সূত্রপাত অনুসন্ধান করতে গিয়ে ‘Aronno Abir’ নামের একটি প্রোফাইলে ০৬ আগস্ট রাত পৌনে দশটার কিছু আগে এ সংক্রান্ত সম্ভাব্য প্রথম পোস্টটি খুঁজে পায়। 

    এই প্রোফাইলটি মূলত আওয়ামী পন্থী ফেসবুক প্ল্যাটফর্ম ক্র্যাক প্লাটুনের সাথে যুক্ত। পরবর্তীতে একই গ্রুপের Ryan Draper নামের আরেক প্রোফাইল থেকেও একই পোস্ট করা হয়৷ রিউমর স্ক্যানারের গত জুলাইয়ের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে গেল বেশ কয়েক মাসে ক্র্যাক প্লাটুন বাংলাদেশ গ্রুপ এবং এর সাথে যুক্ত একাধিক সার্কাজম-ভুঁইফোঁড় পেজের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে অপতথ্যের প্রচারে এই গ্রুপের নাম ঘুরেফিরে এসেছে। গ্রুপটির এডমিন Aronno Abir নামের এই প্রোফাইল। একই গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট Rebellious Roar ও Leo Cypher নামে আরো দুইটি প্রোফাইল শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। অনলাইন ভেরিফিকেশন ও মিডিয়া গবেষণা প্লাটফর্ম ডিসমিসল্যাবও সম্প্রতি সাংবাদিক ও এক্টিভিস্টদের ফেসবুক প্রোফাইল বন্ধ করে দেওয়ার হোতা হিসেবে এই গ্রুপকে শনাক্ত করেছে। 

    তথ্যসূত্র: রিউমর স্ক্যানার ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন

    প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের সাথে নাফসিন মেহনাজকে জড়িয়ে অপতথ্য এবং অপপ্রচারের শুরুটা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে। নাফসিন সম্প্রতি এক ফেসবুক ভিডিওতে বলছিলেন, গেল বছর অভ্যুত্থানের পরবর্তী প্রথম রমজানে তাকে জড়িয়ে এমন অপপ্রচার শুরু হয়। এরপর সৈয়দ আহমেদ মারুফের অনুষ্ঠানে গিয়ে তোলা ছবি নিয়ে এখনও অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে তাকে। এমনকি তিনি পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সাথে কক্সবাজারে গিয়েছেন বলেও ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয় বলে জানান। তাকে নিয়ে অতি সাম্প্রতিক অপপ্রচারের ক্যাম্পেইনের বিষয়ে জানতে চাইলে নাফসিন রিউমর স্ক্যানারকে জানান, সৈয়দ আহমেদ মারুফের আমন্ত্রণে গত বছরের এপ্রিলে হাইকমিশনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর আর সেখানে যাননি তিনি। “আমি এমনকি এখন নতুন হাইকমিশনার হিসেবে যে এসেছেন তার নামও জানি না, তিনি নতুন কবে দায়িত্ব পেয়েছেন সেটাও জানিনা।” 

    নাফসিন মনে করেন, একটি গ্রুপ এসব প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানোর পেছনে কাজ করছে। তিনি বলছেন, “আমিও এবার এসবের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছি।”

    //ডিবিটেক/আরএস/এমআইএস//