নির্মাণ উপকরণ কেনাবেচায় সময়, শ্রম ও খরচ কমানোর উদ্যোগ
স্থাপত্যের অভিজ্ঞতায় ডিজিটাল প্রকিউরমেন্ট প্ল্যাটফর্ম
- নির্মাণ উপকরণ কেনায় ফোন-হোয়াটসঅ্যাপনির্ভর জটিলতা কমাবে প্রো-কিউ
- এক প্ল্যাটফর্মে পণ্য, কোটেশন, স্পেসিফিকেশন ও থ্রিডি মডেল
- যাচাই করা বিক্রেতা ও বায়ার প্রোটেকশন সুবিধা থাকছে
বাংলাদেশের নির্মাণ ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন খাতে নকশা, পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজ প্রযুক্তিনির্ভর হলেও নির্মাণসামগ্রী কেনার প্রক্রিয়া এখনও অনেকাংশে প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য একের পর এক সরবরাহকারীকে ফোন করা, হোয়াটসঅ্যাপে কোটেশন নেওয়া, দাম নিয়ে দর-কষাকষি, পণ্যের নমুনা সংগ্রহ এবং সরবরাহকারীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ—সব মিলিয়ে প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ ও জটিল।
এই বাস্তবতা কাছ থেকে দেখেছেন তরুণ স্থপতি নুজহাত শামা। স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনে পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, নির্মাণকাজে প্রকিউরমেন্ট ম্যানেজমেন্টে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে সময়, শ্রম ও অর্থ—তিনটিই সাশ্রয় করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে হাঁটেন তিনি।
তবে তার উদ্যোগ কোনো প্রচলিত স্থাপত্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নয়। স্থপতি, নির্মাতা, ঠিকাদার, ডেভেলপার, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার থেকে শুরু করে ব্যক্তিগতভাবে বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী মানুষের নির্মাণ উপকরণ কেনার প্রক্রিয়া সহজ করতে তিনি তৈরি করেছেন ‘প্রো-কিউ’ (ProQ) নামের একটি ডিজিটাল প্রকিউরমেন্ট প্ল্যাটফর্ম।
সূত্রমতে, প্রো-কিউয়ের ওয়েবসাইট www.proq.com.bd। বর্তমানে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এরপর খুব শিগগিরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন নুজহাত শামা। উদ্বোধনের পর স্থপতি, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার বা সাধারণ ক্রেতারা শোরুমে না গিয়েও ওয়েবসাইট থেকে প্রতিটি পণ্যের বিস্তারিত তথ্য জানার পাশাপাশি থ্রিডি মডেল সংগ্রহ করতে পারবেন।
ওয়েবসাইট ঘেঁটে জানাগেছে, পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতা একটি প্রকিউরমেন্ট রিকোয়েস্ট তৈরি করে প্রয়োজনীয় পণ্যের নাম, পরিমাণ, স্পেসিফিকেশন ও প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য দিতে পারবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা তাঁদের কোটেশন জমা দেবেন। ক্রেতা একই জায়গায় একাধিক অফার পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এতে দর-কষাকষির সুযোগ যেমন থাকবে, তেমনি আলোচনার প্রতিটি ধাপও ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। প্রকিউরমেন্টে শুধু সঠিক দামে পণ্য পাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ নয়; অর্ডার দেওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী পণ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রো-কিউ এ বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে।
যোগ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মটিতে রয়েছে বায়ার প্রোটেকশন পলিসি। অর্থাৎ অর্ডার সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ ছাড়ের পরিবর্তে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় লেনদেন পরিচালিত হবে। সরবরাহ করা পণ্য স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে না মিললে বা নির্দিষ্ট কোনো সমস্যা দেখা দিলে ক্রেতার অভিযোগ উত্থাপন ও তা সমাধান দেবে।
জানাগেছে, ২০২২ সালে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন নুজহাত শামা। ভালো ফলাফলের জন্য তিনি ভিসি ও ডিনস লিস্টে ছিলেন। এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজমে গবেষণা সহকারী হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। পরে যোগ দেন র্যানকন ডেভেলপমেন্টসে। সেখানে বিভিন্ন প্রকল্পের স্থাপত্য নকশা ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি।
পেশাগত কাজ করতে গিয়েই নির্মাণ উপকরণ সংগ্রহের নানা জটিলতা তাঁকে ভাবায়। একটি প্রকল্পে প্রয়োজনীয় উপকরণের জন্য একাধিক সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ, কোটেশন সংগ্রহ, দাম যাচাই, দর-কষাকষি, নমুনা দেখা এবং শেষ পর্যন্ত সঠিক পণ্য ও পরিমাণ নিশ্চিত করার পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক সময় ডিজাইনের কাজের চেয়েও বেশি সময় নিয়ে নেয়।
অথচ সেই সময় ডিজাইনের পেছনে ব্যয় করা গেলে নকশাকে আরও সৃজনশীল, নান্দনিক ও সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
বিশেষ করে ফোনকল ও হোয়াটসঅ্যাপনির্ভর যোগাযোগে তথ্য হারিয়ে যাওয়া, কোটেশনের পরিবর্তন, পণ্যের স্পেসিফিকেশন নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সরবরাহের পর পণ্য প্রত্যাশা অনুযায়ী না পাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা যায়। নুজহাত উপলব্ধি করেন, পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন মেটাতেই তৈরি হয়েছে প্রো-কিউ। প্ল্যাটফর্মটির মূল ধারণা হলো—একজন ক্রেতাকে প্রয়োজনীয় নির্মাণ উপকরণের জন্য আলাদা আলাদা সরবরাহকারীকে ফোন করে কোটেশন চাইতে হবে না। বিভিন্ন ধরনের পণ্য একটি ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত হবে এবং বিক্রেতারা পৃথক প্রোফাইলের মাধ্যমে সেগুলোর তালিকা সাজাবেন।
উদ্যোক্তা সূত্রে প্রকাশ, প্রো-কিউ শুধু ক্রেতাদের সমস্যা সমাধান করতে চায় না। দেশের অনেক নির্মাতা ও পরিবেশকের মানসম্পন্ন পণ্য থাকলেও ব্যক্তিগত যোগাযোগ, পরিচিতি ও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাজারের কারণে তাঁদের ব্যবসার পরিধি সীমিত থাকে। নতুন ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে বছরের পর বছর সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। প্রো-কিউয়ের মাধ্যমে এসব বিক্রেতা বড় পরিসরে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান প্রো-কিউয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দেশের নির্মাণ ও ইন্টেরিয়র খাতের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে যুক্ত করার কার্যক্রমও চলছে।
প্রসঙ্গত, নুজহাত শামা নিজে স্থপতি হওয়ায় প্রকিউরমেন্টের সমস্যাটি অন্য উদ্যোক্তাদের মতো দূর থেকে দেখেননি; বরং একজন ব্যবহারকারী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন। বাজার গবেষণা ও সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করে সেই আলোকে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছেন তিনি।
বিশেষ করে পণ্যের মান, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা খুঁজে পাওয়া এবং প্রতিশ্রুত পণ্য যথাযথভাবে পাওয়া—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। তাই দ্রুত বড় হওয়ার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করাকেই প্রাথমিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন নুজহাত। প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার আগে বিক্রেতাদের যাচাই করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এই উদ্যোগ শুধু একজন স্থপতির উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি বাস্তব সমস্যা শনাক্ত করে প্রযুক্তির মাধ্যমে তার সমাধান তৈরির একটি উদ্যোগ।
//ডিবিটেক/টিডিএন/এসএমই/এমআইএস//





