নাগরিক সেবা: প্রশ্নটা সরঞ্জাম বা বাজেটের নয়, আন্তঃমন্ত্রণালয় এপিআই সংযোগের
গত সপ্তাহে ব্যক্তিউদ্যোগে চালু হওয়া 'ঘুষ ডট সাইট' চালুর মাত্র ৮ দিনেই ৮ হাজার ৯৪১টি বেনামি অভিযোগ পেয়েছে, যেখানে দাবিকৃত ঘুষের অংক প্রায় ২৯৮ কোটি টাকা। উদ্যোক্তারা স্বীকার করেছেন এগুলো অযাচাইকৃত ও স্বেচ্ছাপ্রদত্ত রিপোর্ট। তবু এই পরিসংখ্যান যা উন্মোচন করে তা নতুন কিছু নয়—সরকারি সেবা নিতে গিয়ে চরম হয়রানি, ঘুষ ও সীমাহীন সময়ক্ষেপণ আমাদের নাগরিক জীবনের নিত্যদিনের বাস্তবতা। এটি হিমশৈলের চূড়া মাত্র। ১৮ কোটি মানুষের দেশে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার; শিশুর জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে মৃত্যুসনদ পর্যন্ত এই দুষ্টচক্র আবর্তিত হতে থাকে।
‘নাগরিক সেবা’র ধারণার উৎপত্তি ঠিক এই সংকট নিরসনের জায়গা থেকেই।
সম্প্রতি মহৎ এই উদ্যোগটি নিয়ে কিছু মহল বিদ্বেষমূলক ও অবান্তর প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি—মাঠপর্যায়ে সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি, আলাদা বাজেট নেই, তাই উদ্যোগটি টেকসই হয়নি। প্রশ্ন ওঠা ইতিবাচক, তবে যারা প্রশ্ন তুলছেন তারা উদ্যোগটির মৌলিক কারিগরি স্থাপত্য বুঝতেই ব্যর্থ হয়েছেন। আমাদের দেশে দলীয় সুপারিশে অদক্ষ লোক দিয়ে দায়িত্ব সারার প্রবণতা রয়েছে, যাদের প্রযুক্তিগত বিষয়ে ন্যূনতম ধারণাও নেই।
‘নাগরিক সেবা’ কোনো হার্ডওয়্যার বা সরঞ্জাম বিলির প্রকল্প নয়; এটি কোডভিত্তিক সার্ভিস শেয়ারিং ও ইন্টারকানেক্টিভিটি প্রোটোকলনির্ভর একটি জাতীয় উদ্যোগ। নাগরিক সেবা সরঞ্জামনির্ভর হলে সেখানে কেনাকাটার দুর্নীতি বাসা বাঁধে, আর বাজেটনির্ভর হলে প্রকল্পের মেয়াদ ও অর্থ শেষের সাথে সাথে সেবাও বন্ধ হয়ে যায়। এটি ছিল মূলত সরকারি দপ্তরের ভেতরের কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিচালিত একটি রুটিন সেবা কার্যক্রম। প্রকল্প নেই, পিডি (প্রকল্প পরিচালক) নেই, বাজেট ও খরচের সুযোগ নেই বলেই কি নাগরিক সেবা বন্ধ রাখতে হবে?
এই মডেলে উদ্যোক্তাদের কম্পিউটার বা ইন্টারনেট দেওয়া হয় না (মডেল হিসেবে প্রদর্শনের জন্য মাত্র ৬টি কেন্দ্র করা হয়েছিল); বরং তাদের দেওয়া হয় একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম (এপিআই হাব) এবং সেটির ভেরিফায়েড অ্যাক্সেস। উদ্যোক্তা নিজস্ব সরঞ্জাম ব্যবহার করে নাগরিককে সেবা দেন এবং নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ নেন। প্ল্যাটফর্মে সেবার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোক্তার আয়ও বাড়ে। সরকারের মূল দায়িত্ব হলো ধাপে ধাপে সব মন্ত্রণালয়ের সেবাকে এই একক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা, যাতে সাধারণ মানুষকে সেবার জন্য ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে দৌড়াতে না হয়।
পুরোনো ‘ডিজিটাল সেন্টার’ আর ‘নাগরিক সেবা’র দর্শন এক নয়। ডিজিটাল সেন্টারে উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের শত শত পৃথক ওয়েবসাইটে গিয়ে আলাদাভাবে আবেদন করতে হতো—যা কার্যত বিচ্ছিন্ন একেকটি ডিজিটাল দ্বীপ। নাগরিক সেবা ভিন্ন কাজ করে: এটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সফটওয়্যারের কোডকে এপিআই (API)-এর মাধ্যমে একক প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করে। ফলে এক ঠিকানা থেকেই সব আবেদন সম্পন্ন হয় এবং আবেদনকারী, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়—তিন পক্ষই রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ডে দেখতে পায় ফাইলটি কোথায় আটকে আছে এবং প্রক্রিয়াকরণে কত সময় লাগছে।
এই স্বচ্ছতা ও দৃশ্যমানতাই ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। অস্বচ্ছতায় দালালের দৌরাত্ম্য বাড়ে, আর দীর্ঘসূত্রতায় বাড়ে দুর্নীতির সুযোগ।
বাজেট কোনো দিনই এই প্ল্যাটফর্মের মূল বাধা ছিল না। নতুন কোনো মেগা প্রকল্প, টেন্ডার বা সরকারি বাড়তি বরাদ্দ ছাড়াই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব প্রোগ্রামারদের প্রস্তুত করে মাত্র ছয়-সাত মাসে ১১টি মন্ত্রণালয়ের ৪১টি সেবা এপিআইভুক্ত করা হয়েছিল। মাইগভ (MyGov)-এর ইন্টার-কানেক্টিভিটি থেকে যুক্ত হয়েছিল আরও ৪৫২টি আবেদন; সব মিলিয়ে প্রায় ৪৯৩টি সেবা এবং সাড়ে আটশত উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ ও লগইন সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। প্রচলিত সরকারি ক্রয় মডেলে এই কাজের পেছনে শত শত কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হতো। আমরা সেই পথে না হেঁটে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছিলাম।
প্রকৃত বাধা ছিল সেবার ওপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার মানসিকতা। সেবা প্রদানকারী দপ্তরগুলোর ভয় ছিল, এপিআই সংযোগ দিলে হয়তো তাদের একক কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ খর্ব হবে। পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে এপিআই সংযোগ চেয়ে পাওয়া গিয়েছিল একটি যন্ত্র, যা শুরু থেকেই আংশিক অচল। এটি প্রযুক্তিগত জটিলতা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক কায়েমি স্বার্থের প্রতিবন্ধকতা।
বর্তমানে সেবা ইন্টিগ্রেশনের কাজ বন্ধ রয়েছে। নতুন কোনো এপিআই যুক্ত করা হয়নি এবং আগে চালু থাকা কিছু সেবার কোড-অ্যাক্সেসও বন্ধ রাখা হয়েছে।
আমার প্রশ্নটি কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রতি: এই জনকল্যাণমূলক প্রযুক্তি সংযোগ বন্ধ রাখা হলো কেন?
বর্তমান সরকারের কার্যকালের মধ্যে চাইলে কোনো অতিরিক্ত বাজেট ছাড়াই আরও শতাধিক এপিআই যুক্ত করা যেত। নাম কিংবা ব্র্যান্ডিং পছন্দ না হলে তা পুনর্নির্ধারণ করা হোক। মূল নীতিটি অপরিবর্তিত রাখা জরুরি: ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সেবা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে নিয়ে আসতে হবে। কারণ ঘুষ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট সেই কাউন্টারগুলোকে ঘিরেই গড়ে ওঠে। এই ব্যবস্থার কার্যকর রূপান্তরই মূল সংস্কার।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাজ সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি ভিড় সামলানো নয়; তাদের মূল দায়িত্ব সেবার মান নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ। সেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করবে মাঠপর্যায়ের উদ্যোক্তারা, পরবর্তীতে যা সচেতন নাগরিক ও প্রবাসীরা নিজেরাই সম্পন্ন করতে পারবেন।
বিদ্যমান জনবল ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে নাগরিক ভোগান্তি কমানোর যে ভিত্তি দাঁড়িয়ে গেছে, তাকে এগিয়ে নেওয়াই যৌক্তিক। প্রশ্নটি কোনো সরকারের একক কৃতিত্বের নয়, নাগরিকের অর্থ ও সময় বাঁচানোর।
সরকারের কাছে বিনীত আহ্বান—এপিআই-ভিত্তিক ‘ন্যাশনাল সিঙ্গেল সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম’-এর অগ্রযাত্রা থামিয়ে না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর থেকেই এটি এগিয়ে নিন। নতুন প্রকল্প খুলে ফান্ড নির্ভরতা তৈরি করলে মেয়াদ শেষে পুরো উদ্যোগটি আবারও স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। নাগরিকের ভোগান্তি কমাতে এবং দুর্নীতিমুক্ত সেবা নিশ্চিতে এক ঠিকানায় সব নাগরিক সেবার সমন্বয় ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: প্রযুক্তিবিদ, লেখক এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী।





