টেলিহেলথে নতুন সম্ভাবনার বার্তা

করাচিতে ডিজিটাল স্বাস্থ্য সম্মেলনে তানহা

  • নিউরোচেক প্রো দিয়ে এডিএইচডি-অটিজম মূল্যায়নে ডিজিটাল পথ
  • করাচিতে স্নায়ুবিকাশজনিত রোগ নির্ণয়ে প্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরেন
  • টেলিহেলথে প্রযুক্তির সঙ্গে চিকিৎসকের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব

করাচিতে ডিজিটাল স্বাস্থ্য সম্মেলনে তানহা
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:৩৯  

    যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডিজিটাল স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিউরোচেক প্রো-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী তানহা তাবাসসুম পাকিস্তানের করাচিতে অনুষ্ঠিত হেলথ এশিয়া ২০২৬-এর চতুর্থ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল স্বাস্থ্য সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বক্তা হিসেবে অংশ নিয়ে টেলিহেলথ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে স্নায়ুবিকাশজনিত রোগ নির্ণয়ে অপেক্ষার সময় কমানোর সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন।

    ১০ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর করাচি এক্সপো সেন্টারে অনুষ্ঠিত ২৩তম হেলথ এশিয়া আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও সম্মেলনের অংশ হিসেবে ‘ডিজিটাল উদ্ভাবনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার রূপান্তর’ প্রতিপাদ্যে চতুর্থ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল স্বাস্থ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান সেন্টার ফর ডিজিটাল হেলথ, দেশটির ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসেস, রেগুলেশনস অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশন মন্ত্রণালয় এবং হেলথ এশিয়ার সহযোগিতায় আয়োজিত এ সম্মেলনে ডিজিটাল স্বাস্থ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেলিহেলথ ও উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

    ২৩তম হেলথ এশিয়া পাকিস্তানের বৃহত্তম বার্ষিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিল্পভিত্তিক আয়োজনগুলোর একটি। এবারের তিন দিনের আয়োজনে ২৪টির বেশি দেশের অংশগ্রহণে ৪০০-এর বেশি স্বাস্থ্যসেবা ব্র্যান্ড এবং ৬৫০-এর বেশি প্রদর্শনী বুথ ছিল। উদ্বোধন করেন পাকিস্তানের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসেস, রেগুলেশনস অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশনবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী সৈয়দ মুস্তফা কামাল।

    সম্মেলনে তানহা তাবাসসুম তাঁর প্রতিষ্ঠিত নিউরোচেক প্রোকে কেন্দ্র করে ডিজিটালভাবে এডিএইচডি ও অটিজম মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—রোগ নির্ণয়ের দীর্ঘ অপেক্ষাকে শুধু রোগীর অসুবিধা হিসেবে না দেখে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার ঘাটতি হিসেবে দেখা প্রয়োজন, যা বর্তমান চাহিদার ব্যাপকতার জন্য তৈরি হয়নি।

    তানহা তাবাসসুম বলেন, রোগী যেন প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে শুরু করতে পারেন এবং চিকিৎসক যেন সংগঠিত তথ্য হাতে নিয়ে সরাসরি ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নে যেতে পারেন—নিউরোচেক প্রো সেই ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যেই কাজ করছে।

    নিউরোচেক প্রোর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটি এডিএইচডি, অটিজম এবং উভয় বৈশিষ্ট্যের সমন্বিত উপস্থাপনার জন্য ডিজিটাল স্ক্রিনিং ও ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের পথ তৈরি করেছে। বিনামূল্যের প্রাথমিক স্ক্রিনিং থেকে শুরু করে স্বনির্দেশিত মূল্যায়ন এবং নিবন্ধিত চিকিৎসকের ভিডিও পরামর্শের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক নির্ণয়—তিন ধাপে সেবাটি সাজানো হয়েছে।

    প্ল্যাটফর্মটির ‘Explore’ ধাপে বিভিন্ন বৈধতাপ্রাপ্ত স্ক্রিনিং উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এরপর ‘Understand’ ধাপে বিস্তারিত স্বনির্দেশিত মূল্যায়ন এবং ‘Confirm’ ধাপে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত চিকিৎসক বা নার্সের সরাসরি ভিডিও পরামর্শের মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চূড়ান্ত মূল্যায়নে চিকিৎসকের পর্যালোচনা ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

    নিউরোচেক প্রো আরও জানিয়েছে, তাদের ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নে নিবন্ধিত চিকিৎসক ও নার্স যুক্ত থাকেন এবং ব্যবহৃত মূল্যায়ন উপকরণগুলো প্রমাণভিত্তিক ও NICE-সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শিশুদের জন্যও এডিএইচডি, অটিজম ও সমন্বিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে।

    তানহা তাবাসসুমের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তিগত কাঠামোয় চিকিৎসা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। নিউরোচেক প্রোর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আরশাদ আহমেদ তথ্যবিজ্ঞান, মেশিন লার্নিং ও এমএলওপিএসে ১৫ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রযুক্তি নেতা। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক ডা. দীনেশ কান্নান স্নায়ুবিকাশজনিত রোগ, এডিএইচডি ও অটিজম মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ।

    প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা ডা. জাকিউদ্দিন আহমেদ টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন কাজ করছেন। নিউরোচেক প্রোর তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে পাকিস্তান ও আশপাশের অঞ্চলে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করছেন এবং বর্তমানে সৌদি আরব ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব বিস্তারে পরামর্শ দিচ্ছেন।

    করাচির সম্মেলনে পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি ও উন্নয়ন খাতের প্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্যসেবা নেতাদের অংশগ্রহণে একটি গোলটেবিল বৈঠকেও তানহা তাবাসসুম অংশ নেন। সেখানে পাকিস্তানে স্নায়ুবিকাশজনিত রোগের নির্ণয় ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার অগ্রগতি নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এত বড় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবধান কোনো একটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম একা পূরণ করতে পারে না; প্রযুক্তি সুযোগের পরিধি বাড়াতে পারে, কিন্তু কার্যকর পরিবর্তনের জন্য চিকিৎসক, স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

    তানহা বলেন, পাকিস্তানের চিকিৎসক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনায় তিনি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে কি না—এই প্রশ্নের চেয়ে কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচার-বিবেচনা অক্ষুণ্ন রেখে প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দেখেছেন।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টেলিমেডিসিনকে দূরত্বকে বিবেচনায় রেখে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার একটি পদ্ধতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এর মধ্যে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ, গবেষণা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

    ডব্লিউএইচও বলছে, টেলিমেডিসিন স্বাস্থ্যসেবার আওতা বাড়াতে এবং দূরবর্তী জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছাতে সহায়তা করতে পারে। তবে কার্যকর টেলিমেডিসিন ব্যবস্থার জন্য অবকাঠামো, নীতিমালা, সুশাসন, বিনিয়োগ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

    ২০২৫ সালের একটি নীতিগত বিশ্লেষণে ডব্লিউএইচও টেলিমেডিসিনকে বৃহত্তর টেলিহেলথ ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। টেলিহেলথের পরিসরে দূরবর্তী রোগনির্ণয়, স্বাস্থ্যশিক্ষা, রোগীর দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক ডিজিটাল সেবাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

    দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জন্যও ডিজিটাল স্বাস্থ্য এখন স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ডব্লিউএইচওর ২০২৬ সালের আঞ্চলিক আলোচনায় টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো, রোগ নজরদারি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও তথ্যনির্ভর স্বাস্থ্য পরিচালনাকে ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

    এই বৃহত্তর প্রবণতার মধ্যে নিউরোচেক প্রোর মডেলটি মূলত একটি নির্দিষ্ট সমস্যা—স্নায়ুবিকাশজনিত রোগের মূল্যায়নে দীর্ঘ অপেক্ষা ও তথ্য সংগ্রহের জটিলতা—প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে বর্তমানে বিনামূল্যের প্রাথমিক স্ক্রিনিং, স্বনির্দেশিত মূল্যায়ন এবং চিকিৎসক-নির্ভর ভিডিও মূল্যায়নের সমন্বিত ব্যবস্থা দেখানো হয়েছে।

    তবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে ক্লিনিক্যাল নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। নিউরোচেক প্রো জানিয়েছে, তাদের ক্লিনিক্যাল তথ্য এনক্রিপ্টেড অবস্থায় সংরক্ষণ ও স্থানান্তর করা হয়, যুক্তরাজ্যে AWS London অবকাঠামোয় তথ্য রাখা হয় এবং ব্যবহারকারীর স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া তথ্য শেয়ার না করার নীতি অনুসরণ করা হয়।

    করাচিতে নিজের প্রথম পাকিস্তান সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তানহা তাবাসসুম আয়োজক ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। বিশেষভাবে ড. জাকিউদ্দিন আহমেদকে আমন্ত্রণ ও পুরো সফরে আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি। তাঁর মতে, করাচির এই অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা বিস্তারের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

    তানহা তাবাসসুম বাংলাদেশের বিশিষ্ট কূটনীতিক আবিদা ইসলামের পুত্রবধূ। আবিদা ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের ক্যারিয়ার কূটনীতিক হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোয় রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্যে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

    নিউরোচেক প্রোর ওয়েবসাইটে তানহা তাবাসসুমকে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জটিল আর্থিক অপরাধ তদন্তের অভিজ্ঞতা, বোর্ড ও ট্রাস্টি পর্যায়ের দায়িত্ব এবং কৌশলগত নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে তিনি স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উদ্যোগে কাজে লাগাচ্ছেন।
    //ডিবিটেক/আইিইচএসআইসি/বিপিও//