অ্যালগরিদম নয়, বিদ্যুৎ ও পুঁজির দামেই নির্ধারিত হবে এআই ভবিষ্যৎ
|
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ শুধু অ্যালগরিদমে নয়, বিদ্যুৎ ও পুঁজির দামেও নির্ধারিত হবে।
বিশ্বব্যাংকের World Development Report 2026-এর পটভূমি গবেষণা বাংলাদেশের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখেছে: আমাদের এআই ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সেই প্রযুক্তি পরিচালনার ডিজিটাল ভিত্তি কতটা নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও ঝুঁকিমুক্ত?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনায় সচরাচর লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM), বিপুল ডেটাসেট, চিপ প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল কিংবা চ্যাটজিপিটির মতো পণ্যের নাম উঠে আসে। কিন্তু উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এআই যুগের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে অতি-প্রাথমিক কিছু ভিত্তির ওপর: বিদ্যুৎ সরবরাহ কতটা নিরবচ্ছিন্ন? ইন্টারনেট সংযোগ কি টেকসই ও স্বল্পব্যয়ী? উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং লজিস্টিকস দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নাগালের মধ্যে কি না? এবং নাগরিক পরিচয়, লেনদেন ও নিরাপদ তথ্য বিনিময়ের মতো ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো (DPI) পরস্পরের সঙ্গে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারছে কি না?
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটির জন্য প্রস্তুতকৃত মারিয়ানা দাহান, জুনায়েদ আহমেদ ও ডেভিড স্যাভেজের যৌথ গবেষণা De-Risking the Digital Foundations of AI: Capital, Risk, and the Diffusion of AI মূলত এই পরোক্ষ অবকাঠামোর গুরুত্ব তুলে ধরেছে। তাদের গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হলো—এআই প্রযুক্তির সুষম বিস্তারে চারটি উপাদান অপরিহার্য: নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চগতির কানেক্টিভিটি, কম্পিউট সামর্থ্য এবং আন্তঃসংযুক্ত ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো। অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই উপাদানগুলোর অর্থায়ন ব্যয় বা ক্যাপিটাল কস্টই প্রযুক্তি প্রসারের প্রধান প্রতিবন্ধক।
প্রযুক্তির নয়, মূল ব্যবধান পুঁজির ব্যয়ে
অতীতে ডিজিটাল বিভাজন বলতে কেবল ইন্টারনেট সংযোগ থাকা বা না থাকাকে বোঝাত। এআই যুগে এই ব্যবধান বহুমাত্রিক ও জটিল আকার ধারণ করেছে।
উন্নত বিশ্বের একটি ডেটা সেন্টার প্রকল্প যদি স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন পায়, আর উন্নয়নশীল দেশের অনুরূপ প্রকল্পকে রাজনৈতিক ঝুঁকি, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা, অস্পষ্ট নীতিমালা কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কায় চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়, তবে প্রযুক্তির প্রাপ্যতা সমান হলেও প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
মাল্টিলেটারাল ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি এজেন্সির (MIGA) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এআই পরিকাঠামোতে শুধু প্রাথমিক বিনিয়োগই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তহীনতা, চুক্তিগত অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিচালনাগত ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের হিসাব-নিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ফলে কোনো দেশের প্রকৃত ঝুঁকির তুলনায় বাজারে তার ‘অনুভূত ঝুঁকি’ (Perceived Risk) বেশি হলে মূলধনের ব্যয়ও বেড়ে যায়। এভাবে প্রযুক্তিগত ব্যবধান রূপ নেয় সুদূরপ্রসারী আর্থিক বৈষম্যে।
এ কারণেই ‘এআই সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করতে কেবল নিজস্ব ভাষা মডেল বা জাতীয় ডেটা সেন্টার গড়ে তোলাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব হলো একটি দেশের স্বাধীন বিকল্প বেছে নেওয়ার সক্ষমতা—কোন ক্লাউড নেটওয়ার্ক দেশ ব্যবহার করবে, কোন মডেল গ্রহণ করবে, প্রয়োজনে একক সরবরাহকারী পরিবর্তন করা যাবে কি না, স্থানীয় ভাষার উপযোগী এআই তৈরি করা সম্ভব কি না এবং জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো কোনো বিদেশি টেক জায়ান্টের একচেটিয়া নির্ভরতায় জিম্মি হয়ে পড়ছে কি না।
এ বাস্তবতায় World Development Report 2026 উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ‘Adopt, Adapt, Advance’ কাঠামো অনুসরণের দিকনির্দেশনা দিয়েছে। অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে শুরুতেই সর্বাধুনিক ফ্রন্টিয়ার মডেল তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত নয়। বরং বিদ্যমান প্রযুক্তি গ্রহণ, স্থানীয় ভাষা ও বাস্তবতার সঙ্গে তার সংবেদনশীল অভিযোজন এবং পর্যায়ক্রমে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোই টেকসই পথ।
ঝুঁকি প্রশমন বনাম রাষ্ট্রীয় দায়
গবেষণাটির গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—ক্রেডিট গ্যারান্টি, পলিটিক্যাল রিস্ক ইন্স্যুরেন্স ও ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিংয়ের মতো ঝুঁকি-বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন সব জাতীয় অবকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগ আনা সম্ভব, যা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় হলেও অতিরিক্ত ঝুঁকি-ধারণার কারণে অর্থায়ন পাচ্ছিল না।
তবে এই ঝুঁকি প্রশমন (De-risking) প্রক্রিয়া যেন বেসরকারি মুনাফা নিশ্চিত করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক দায় (Contingent Liability) চাপিয়ে না দেয়। নির্বিচারে সার্বভৌম নিশ্চয়তা (Sovereign Guarantee) দিলে দুর্বল প্রকল্পও ‘জাতীয় প্রকল্প’ তকমা নিয়ে সুবিধা নিতে পারে, যার চূড়ান্ত বোঝা চাপে জনগণের করের ওপর। ফলে ডি-রিস্কিংয়ের সঙ্গে স্বচ্ছ জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের ডিজিটাল ভিত্তি ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের ইতিবাচক দিক হলো, দেশটি শূন্য থেকে এআই যুগে প্রবেশ করছে না। জি-টোয়েন্টিভুক্ত ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো বিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশকে ডিজিটাল আইডেন্টিটি, পেমেন্ট এবং ডেটা এক্সচেঞ্জ—এই তিন স্তরেই কার্যকর ব্যবস্থার একটি উদাহরণ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পরিচয় প্ল্যাটফর্ম, ই-কেওয়াইসি (e-KYC), একপে (EkPay), বিনিময় (Binimoy) এবং মাইগভ (MyGov)-এর মতো প্ল্যাটফর্ম সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলেছে। বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান এই অবকাঠামোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপযোগী, সুরক্ষিত এবং অধিক জনমুখী রূপ দেওয়া।
তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। শতভাগ বিদ্যুতায়নের পর এখন প্রশ্ন নিরবচ্ছিন্নতা ও স্থিতিশীলতার। গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনুপাত অত্যন্ত সীমিত এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের জন্য অবকাঠামোগত নির্ভরযোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। একটি এআই-রেডি ডেটা সেন্টার বা ক্লাউড ফ্যাসিলিটি পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, কার্যকর কুলিং সিস্টেম, হাই-ক্যাপাসিটি ব্যান্ডউইথ, সাইবার নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা পূর্বশর্ত।
মেগা প্রকল্প বনাম চাহিদাভিত্তিক পরিকাঠামো
একটি বিশাল ‘ন্যাশনাল এআই ডেটা সেন্টার’ স্থাপন রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় মনে হলেও চাহিদা ছাড়া তা দ্রুত অকার্যকর সম্পদে (Stranded Asset) পরিণত হতে পারে; বিশেষ করে যখন জিপিইউ প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে।
এআই অবকাঠামোর নীতি ‘আগে নির্মাণ, পরে ব্যবহারকারী সন্ধান’ হওয়া উচিত নয়। আগে শনাক্ত করতে হবে দেশে কোথায় কম্পিউটেশনের কার্যকর চাহিদা রয়েছে—যেমন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, বাংলা ভাষা মডেল, আবহাওয়া ও জলবায়ু পূর্বাভাস, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও জনসেবা। সেই চাহিদার ভিত্তিতে মডুলার ও শেয়ার্ড কম্পিউটিং মডেলে বিনিয়োগ করাই যুক্তিযুক্ত।
একই সঙ্গে জাতীয় অবকাঠামো যেন কোনো একক ভেন্ডর বা ক্লাউড সেবাদাতার ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল (Vendor Lock-in) না হয়ে পড়ে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরি। ওপেন স্ট্যান্ডার্ড, এপিআই ইন্টারঅপারেবিলিটি এবং ডেটা পোর্টেবিলিটি নিশ্চিত করাকে সরকারি তহবিল বা গ্যারান্টিপ্রাপ্ত প্রকল্পের বাধ্যতামূলক শর্ত করা উচিত। সরকারি সহায়তায় গড়ে ওঠা অবকাঠামো থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশীয় স্টার্টআপগুলোর জন্য সাশ্রয়ী ‘কম্পিউট কোটা’ বরাদ্দ রাখা এবং জ্বালানি ব্যবহারে কার্বন ফুটপ্রিন্ট নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকাও প্রয়োজন।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের চেয়েও এআই যুগে দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ব্যবহারকারীর ‘আস্থা’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নাগরিকের তথ্যের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কাঠামোগত দুর্বলতার বোঝা কখনোই সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করে চাপানো যাবে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কেবল অ্যালগরিদমের শ্রেষ্ঠত্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ, নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ এবং ন্যায্যমূল্যের মূলধনের ওপর ভিত্তি করে যে দেশ কার্যকর পরিকাঠামো দাঁড় করাতে পারবে, তারাই এই রূপান্তরের সুফল পাবে।
লেখক || দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক আন্তর্জাতিক অ্যাম্বাসেডর; প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিএনএনআরসি
এডিটরস নোট || আলোচ্য নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণ লেখকের নিজস্ব। ডিজিটাল বাংলাদেশ ও প্রযুক্তি খাতের অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকাশ এবং টেকসই নীতি নির্ধারণের স্বার্থে নিবন্ধটি সম্পাদকীয় পরিমার্জনসহ প্রকাশ করা হলো।





