সরকারি ওয়েব পোর্টালে তথ্যের অসংগতি, হালনাগাদে ঘাটতি

রাষ্ট্রপতির জীবনী ফিরেছে, ২১১ দিনেও ফেরেনি প্রধানমন্ত্রীরটা

  • সরকারি পোর্টালে জীবনী ও প্রকল্প তথ্যে অসংগতি
  • নির্দেশনার পরও সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার
  • পাঁচ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে পোর্টাল ব্যবস্থাপনা

রাষ্ট্রপতির জীবনী ফিরেছে, ২১১ দিনেও ফেরেনি প্রধানমন্ত্রীরটা
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:০০  
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৩৬  

সরকারি ডিজিটাল সেবার কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম জাতীয় তথ্য বাতায়নের আওতাধীন বিভিন্ন ওয়েবসাইটে তথ্য হালনাগাদে অসংগতি, কর্মকর্তাদের জীবনবৃত্তান্তের ঘাটতি, পুরোনো কনটেন্ট এবং সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। ৯ সেপ্টেম্বর দাপ্তরিক নথি ও যোগাযোগে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের পদবির আগে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ বা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়ার পরও সরকারি ওয়েব অবকাঠামোর বিভিন্ন স্থানে পুরোনো ভাষা রয়ে গেছে।

বেশ কয়েকদিন ধরেন সরকারি ওয়েবসাইটগুলো পর্যালোচনা করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। জাতীয় তথ্য বাতায়নের মূল পোর্টালেই ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইট যুক্ত রয়েছে। পোর্টালটির নিজস্ব ফুটারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করার দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় তথ্য বাতায়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, এটুআই, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর এবং বেসিসের নাম উল্লেখ রয়েছে।

নির্দেশনার পরও ‘মহামান্য-মাননীয়’

৯ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাধারণ অধিশাখা থেকে জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সঙ্গে দাপ্তরিক যোগাযোগ, নথিপত্র ও সারসংক্ষেপ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁদের পদবির আগে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ কিংবা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ লিখিতভাবে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নির্দেশনাটি অনতিবিলম্বে কার্যকর করার কথাও বলা হয়।

কিন্তু সরকারি ওয়েবসাইটের কিছু পুরোনো কনটেন্টে এসব শব্দ এখনো দেখা যাচ্ছে। বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটের বর্তমান হোমপেজেও রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’ শব্দবন্ধ রয়ে গেছে। একই ওয়েবসাইটে পুরোনো ভাষণের তালিকায় ২০২৩ সালের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ভাষণের শিরোনামও আগের ভাষাতেই সংরক্ষিত আছে। তবে একই সঙ্গে ২০২৬ সালের নতুন রাষ্ট্রপতির ভাষণও সেখানে যুক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ, ৯ সেপ্টেম্বরের পরিপত্রটি মূলত দাপ্তরিক যোগাযোগ ও নথিপত্রের ভাষা নিয়ে হলেও সরকারি ওয়েবসাইটের পুরোনো ও নতুন কনটেন্টের ভাষা সামঞ্জস্য করার প্রয়োজনীয়তা আলাদা করে সামনে এসেছে।

জীবনীতে ফাঁক, কোথাও বাংলা কোথাও ইংরেজি

ওয়েব পোর্টালগুলোর আরেকটি দৃশ্যমান সমস্যা কর্মকর্তাদের জীবনবৃত্তান্তে অসামঞ্জস্য। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইটে কোথাও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের জীবনবৃত্তান্ত রয়েছে, কোথাও এক বা একাধিক পদধারীর তথ্য নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জীবনবৃত্তান্ত বাংলায়, আবার কোথাও ইংরেজিতে দেওয়া হয়েছে।

পর্যালোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের জীবনবৃত্তান্ত ইংরেজিতে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের জীবনবৃত্তান্তের ঘাটতির কথাও সামনে এসেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা ও সচিবের জীবনবৃত্তান্তের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে বলে পর্যালোচনায় দেখা গেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর জীবনবৃত্তান্ত থাকলেও সচিবের তথ্য অনুপস্থিত থাকার চিত্র পাওয়া গেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর জীবনবৃত্তান্ত, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী পর্যায়ের তথ্য এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সচিবের তথ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অসম্পূর্ণতা রয়েছে।

একই ধরনের ঘাটতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, শিল্প, তথ্য ও সম্প্রচার, বস্ত্র ও পাট, শ্রম ও কর্মসংস্থান, পরিকল্পনা, ধর্ম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, সমাজকল্যাণ এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানসহ আরও কয়েকটি পোর্টালে রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর তথ্যেও অসামঞ্জস্য

তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ইতোমধ্যে হয়েছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনবৃত্তান্ত এখন বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটে আলাদা পেজে প্রকাশিত রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি ২১ আগস্ট ২০২৬ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পেজটি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ৯টার দিকে হালনাগাদ করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে ‘প্রধানমন্ত্রীর জীবন বৃত্তান্ত’ নামে আলাদা মেন্যু রয়েছে। কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বরের ওয়েব যাচাইয়ে ওই পেজে ‘প্রধানমন্ত্রীর জীবন বৃত্তান্ত’ শিরোনাম ছাড়া কোনো জীবনীমূলক তথ্য দেখা যায়নি। পেজটির কনটেন্ট সর্বশেষ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হালনাগাদ দেখানো হচ্ছে।

অর্থাৎ, জাতীয় তথ্য বাতায়নের সঙ্গে যুক্ত সব সরকারি পোর্টালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জীবনী নেই—এমন সার্বিক দাবি বর্তমান অবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ওয়েবসাইটে জীবনী পেজ থাকা সত্ত্বেও সেখানে তথ্য না থাকা বা পুরোনো কনটেন্ট রয়ে যাওয়া ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনার একটি অসংগতি হিসেবে থাকছে।

বঙ্গভবনের পুরোনো তথ্য

বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটে নতুন রাষ্ট্রপতির তথ্য ও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়মিত যুক্ত হলেও পুরোনো কনটেন্টের বড় অংশ এখনো আগের সময়ের ভাষা ও তথ্য বহন করছে। যেমন, ভাষণ তালিকায় ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩-এর মো. আবদুল হামিদের ভাষণসহ পুরোনো ভাষণগুলো রয়েছে। তবে একই তালিকায় ২০২৬ সালের রাষ্ট্রপতির নতুন ভাষণও যুক্ত হয়েছে।

ফলে সমস্যা পুরো ওয়েবসাইট অচল থাকার নয়; বরং নতুন তথ্য সংযোজনের পাশাপাশি পুরোনো কনটেন্টের ভাষা, পদধারী ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়মিত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পোর্টালে আরেক চিত্র

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বর্তমান হোমপেজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম ও পদবি রয়েছে এবং ‘প্রধানমন্ত্রীর জীবন বৃত্তান্ত’ নামে আলাদা মেন্যুও আছে। তবে সেই জীবনবৃত্তান্ত পেজে বর্তমানে কোনো জীবনীমূলক কনটেন্ট নেই। একই ওয়েবসাইটে মন্ত্রিসভার তালিকায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নাম এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

এটি দেখায়, সরকারি পোর্টালে তথ্য প্রকাশের কাঠামো থাকলেও কনটেন্ট পূরণ ও নিয়মিত হালনাগাদের মধ্যে সমন্বয় সব ক্ষেত্রে একই পর্যায়ে নেই।

প্রকল্পের তথ্যেও হালনাগাদের ঘাটতি

পর্যালোচনায় কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চলমান প্রকল্পের তথ্য পর্যাপ্তভাবে হালনাগাদ না থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। কোনো কোনো পোর্টালে প্রকল্পের তালিকা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অগ্রগতি, সময়সীমা বা সর্বশেষ তথ্য সহজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এ ধরনের ঘাটতি সরকারি ওয়েবসাইটকে শুধু তথ্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নয়, নাগরিকের জন্য নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।

দায়িত্ব কার?

জাতীয় তথ্য বাতায়নের ব্যবস্থাপনায় একাধিক সরকারি ও প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে জাতীয় তথ্য বাতায়নের আওতাধীন সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর কনটেন্ট হালনাগাদ কার্যক্রমের সমন্বয়ের বিষয়টি উল্লেখ আছে।

এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিজস্ব কর্মবণ্টনেও জাতীয় তথ্য বাতায়ন-সংক্রান্ত ই-সেবা পরিদর্শন, ওয়েবসাইট হালনাগাদ এবং তথ্যপ্রযুক্তি কার্যক্রম পরিবীক্ষণের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।

এমনকি ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জাতীয় তথ্য বাতায়নে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় তথ্যসহ ওয়েবসাইট হালনাগাদের বিষয়ে পৃথক নোটিশও প্রকাশ করেছিল।

ফলে সরকারি ওয়েব পোর্টালের তথ্যের মান ও হালনাগাদ অবস্থা কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী দলের বিষয় নয়; কেন্দ্রীয় সমন্বয় ও কারিগরি ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও এটি যুক্ত।

সরকারের ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থায় জাতীয় তথ্য বাতায়ন একটি কেন্দ্রীয় প্রবেশদ্বার। তাই নতুন প্রশাসনিক নির্দেশনা, পদধারীর পরিচয়, জীবনবৃত্তান্ত, প্রকল্পের অগ্রগতি ও অন্যান্য নাগরিক তথ্য একই কাঠামো ও সময়ানুগভাবে হালনাগাদ রাখা এখন সরকারি ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এনএপি/এসএমই//