এআই দিয়ে ৩০০ বানোয়াট সংবাদ, তদন্তের কেন্দ্রে অর্থ ও প্রযুক্তির সূত্র
২৯ ক্লড অ্যাকাউন্টের আড়ালে কারা?
- গাইবান্ধার এক ব্যক্তি ১৬ মাসে ২৯টি Claude অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে ব্যবহার করেছেন
- তৈরি হয়েছে ১,৫০০ শিরোনাম, ৩০০ বানোয়াট narrative ও ১,৫০০ image prompt
- আওয়ামী লীগকে দায়ী করার প্রমাণ নেই; আসল প্রশ্ন অর্থ, ডিভাইস ও নেটওয়ার্কের মালিকানা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত স্বয়ংক্রিয় প্রোপাগান্ডা তৈরির পাইপলাইন পরিচালনায় আর্থিক লেনদেনের উৎস, ক্লাউড অবকাঠামো এবং স্ক্রিপ্ট আর্কিটেকচার উন্মোচনে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার আন্তর্জাতিক এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের সূত্রে এ কারিগরি বিশ্লেষণের দাবি জোরালো হয়। অ্যানথ্রপিকের অভ্যন্তরীণ শনাক্তকরণে ‘GTG-54006’ নামে চিহ্নিত কার্যক্রমে গাইবান্ধার এক অপারেটর দীর্ঘ ১৬ মাস ধরে ২৯টি ক্লদ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বাংলায় বানোয়াট কনটেন্ট তৈরির একটি সমন্বিত সফটওয়্যার ফ্রেমওয়ার্ক পরিচালনা করেন। এ ঘটনায় সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রযুক্তিগত ও আর্থিক ফুটপ্রিন্ট শনাক্তকে তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তানভীর হাসান জোহা বলেন, "তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো প্রযুক্তিগত ও আর্থিক ফুটপ্রিন্ট বের করা। ২৯টি অ্যাকাউন্ট কার পেমেন্ট মেথড, ডিভাইস, আইপি, ইমেইল এবং ফোন আইডেন্টিটি দিয়ে পরিচালিত হয়েছিল—এটাই এখন মূল প্রশ্ন।" তার মতে, কেবল অ্যাকাউন্ট বন্ধ করাই স্থায়ী সমাধান নয়; বরং ‘fake_news_3.py’ স্ক্রিপ্ট কার তৈরি, ইউটিউব বাল্ক আপলোডার কোথায় হোস্ট করা ছিল, গুগল ড্রাইভ বা ক্লাউড স্টেজিং অ্যাকাউন্ট কার নামে এবং কনটেন্ট তৈরির পেছনে কোনো ক্লায়েন্ট বা পেমেন্ট রিলেশনশিপ ছিল কি না, তা উন্মোচন করা আবশ্যক।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, "এগুলো বের করা গেলে স্পষ্ট হবে এটি কোনো একক ব্যক্তির মতাদর্শিক কার্যক্রম, নাকি অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত পেইড ইনফ্লুয়েন্স ক্যাম্পেইন বা কোনো বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ?"
অ্যানথ্রপিকের কারিগরি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘fake_news_3.py’ নামের কাস্টম পাইথন স্ক্রিপ্ট ক্লদ এপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রতি ব্যাচে ১৫টি শিরোনাম, ৩টি বিস্তারিত বানোয়াট প্রতিবেদন এবং ১৫টি ইমেজ জেনারেশন প্রম্পট স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করত। ১৬ মাসে অন্তত ১,৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি বিস্তারিত ন্যারেটিভ এবং ১,৫০০টি ইমেজ প্রম্পট উৎপাদিত হয়। পরবর্তীতে ক্লাউড ফোল্ডারে স্টেজিং, থার্ড-পার্টি সিআই সার্ভিসের মাধ্যমে আইপি ট্র্যাকিং আড়াল এবং ইউটিউব এপিআই দিয়ে ভিডিও বাল্ক-আপলোড ও শিডিউলিংয়ের পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড পাইপলাইন সাজানো হয়েছিল।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উৎপাদিত কনটেন্ট ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিল এবং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি, অন্তর্বর্তী সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে নানা সাজানো অভিযোগ প্রচার করা হতো। তবে অ্যানথ্রপিক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ এই অপারেশন পরিচালনা বা অর্থায়ন করেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি কোনো রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার প্রমাণও মেলেনি। ফলে বিষয়টিকে সরাসরি দলীয় অপারেশন বলার তথ্যপ্রমাণ নেই।
ফলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বেরিয়ে এসেছে। কনটেন্ট তৈরি হয়েছে—এটি প্রমাণিত। কনটেন্ট প্রকাশও হয়েছে—তারও প্রমাণ আছে। কিন্তু কত মানুষ বিশ্বাস করেছে বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়েছে—তা এখনো প্রমাণিত নয়।
এআই এখন এক ব্যক্তিকেও ‘কনটেন্ট ফ্যাক্টরি’ বানাচ্ছে
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত শিক্ষা এখানেই।
একজন অপারেটর, ২৯টি account, একটি custom Python script এবং কয়েকটি cloud/social platform ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি automated production pipeline চালাতে পেরেছেন, যার output হাজারের ঘরে।
অ্যানথ্রপিক-এর সেপ্টেম্বর রিপোর্টে বাংলাদেশের ঘটনাটি AI misuse-এর বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, AI এখন এমন কার্যক্রমকে আরও বেশি automated ও scalable করে তুলছে, যেখানে আগে বড় মানবশক্তি প্রয়োজন হতো।
বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য আরও বড়। কারণ নির্বাচন, রাজনৈতিক উত্তেজনা, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা কিংবা সামাজিক আন্দোলনের সময় একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থানীয় ভাষায় কয়েক হাজার fabricated content তৈরি করা সম্ভব।
সাইবার বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনায় পেমেন্ট লেয়ার, অ্যাকাউন্ট আইডেন্টিটি, ডিভাইস ফিঙ্গারপ্রিন্ট, নেটওয়ার্ক লগ এবং এপিআই এন্ডপয়েন্ট—এই পাঁচ স্তরের সমন্বিত ডেটা ফরেনসিক প্রয়োজন। কোডের মেটাডেটা, গিটহাব বা ভিপিএস অবকাঠামো এবং ক্লাউড স্টোরেজের লেনদেন হিসেব পাওয়া গেলে এআই অপব্যবহারের ডিজিটাল নেটওয়ার্কটির প্রকৃত রূপ চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর যৌথ পদক্ষেপ ছাড়া এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় প্রোপাগান্ডা রোধ করা কঠিন বলে মত প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসআইপি/এফওইএম//





