এআই কখনোই নিরপেক্ষ নয়:
কোড যখন ক্ষমতার রাজনীতির দর্পণ
|
কোড কেবল কোনো নিরীহ পাইপলাইন বা প্রযুক্তিগত নল নয়; এটি মূলত এমন এক রাজনীতি, যা সুকৌশলে প্রকৌশলের ছদ্মবেশ ধারণ করেছে।
নব্বইয়ের দশকের একটি সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রাথমিক সাইবার-নারীবাদীরা ইন্টারনেটকে এমন এক মুক্ত পরিসর হিসেবে কল্পনা করতে পেরেছিলেন, যেখানে মানব শরীরকে দরজার বাইরে রেখেই প্রবেশ করা সম্ভব। ধারণা করা হয়েছিল, ভার্চুয়াল অবতার লিঙ্গপরিচয়কে মুছে দেবে এবং নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেবে সনাতন ক্ষমতার স্তরবিন্যাস। সেই বাজিটি বোকামি ছিল না, তবে তা ছিল নিশ্চিতভাবেই অসম্পূর্ণ। এর পরবর্তী সময়ে যে বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মগুলো গড়ে উঠল, তা তৈরি করেছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো; যা পরিপুষ্ট হয়েছে রাজপথ ও সামরিক ব্যারাকের রূঢ় ভাষায় এবং যেখানে মুনাফা এসেছে কেবল মানুষের মনোযোগকে বন্দি করে। ফলে টেকনোফেমিনিজমের সংশোধনী আজ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই: প্রযুক্তি এমন কোনো নিরপেক্ষ হাতিয়ার নয়, যা কেবল ভালো কিংবা খারাপভাবে ব্যবহারের অপেক্ষায় বসে থাকে। এটি বরং সেই সমাজেরই একটি নিখুঁত আয়না এবং পরবর্তীতে শক্তিশালী মেগাফোন—যে সমাজ এটিকে অর্থায়ন করে, কর্মী জোগায় এবং ডেটা স্ক্র্যাপ করে গড়ে তোলে।
যে ল্যাবরেটরিগুলো বিশ্বের মূল ফাউন্ডেশন মডেল তৈরি করে সরবরাহ করছে, সেখানে কর্মীদের সিংহভাগই পুরুষ এবং প্রতিষ্ঠানগুলো হাতেগোনা কয়েকটি পশ্চিমা ভূখণ্ডের ভৌগোলিক বলয়ে সীমাবদ্ধ। ফলস্বরূপ, এই সিস্টেমগুলো কেবল নিছক অনাকাঙ্ক্ষিত অবশিষ্টাংশ হিসেবে পক্ষপাত বা বায়াস তৈরি করে না; বরং তারা একটি নির্দিষ্ট একতরফা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। জিপিইউর (GPU) দাম সস্তা হওয়ার বহু আগেই নারীবাদী তত্ত্বে যে যৌন বৈষম্য ও অবমাননার কথা চিহ্নিত করা হয়েছিল, মডেলের ট্রেনিং ডেটাসেটগুলো ঠিক সেই সনাতন বৈষম্যেই ঠাসা। নিরাপত্তা মূল্যায়নকারী ফ্রেমওয়ার্কগুলো আজও শুধু ইংরেজি ভাষার আপত্তিকর বিষয়গুলোকেই বিশ্বের সার্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে, প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা নীতিমালায় নারীর সম্মতিহীন ডিপফেক যৌন কনটেন্টগুলোকে কোনো গভীর অপরাধ হিসেবে না দেখে 'অ্যাডাল্ট কনটেন্ট' নামক এক সাধারণ ঝুড়িতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর কোনোটিই কোনো নির্দোষ যন্ত্রের যান্ত্রিক ত্রুটি বা গ্লিচ নয়; বরং বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য যখন কোডের ভাষায় রূপান্তরিত হয়, তখন ফলাফল এমনই রূপ নেয়।
এর বাস্তব পরিণতি এখন আর তাত্ত্বিক কোনো আলোচনার বিষয় নয়। অনলাইনে ছড়িয়ে থাকা ডিপফেক কনটেন্টের প্রায় পঁচানব্বই শতাংশই সম্মতিহীন যৌন বিষয়ক চিত্রায়ণ, যার নিরঙ্কুশ নিরানব্বই শতাংশের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন নারী। অতীতে যে অপকর্ম করতে একটি ডার্করুম আর চুরিকৃত ছবির প্রয়োজন হতো, আজ কেবল একটি অ্যাপ এবং মাত্র নব্বই সেকেন্ডেই তা সম্পন্ন হচ্ছে। এআই মডেল মানুষের ভেতরে এই বিকৃত কামনার জন্ম দেয়নি; বরং এটি অপবৃত্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্পায়িত রূপ দিয়েছে এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকা যেকোনো মানুষের হাতে একে একটি প্রযুক্তিগত 'ফিচার' হিসেবে তুলে দিয়েছে। প্রযুক্তির 'নিরপেক্ষতার বয়ান' হলো এমন এক সুবিধাজনক অজুহাত, যা সফটওয়্যার প্রস্তুতকারী ভেন্ডরকে দায়মুক্তি দিয়ে ব্যবহারকারীর দিকে আঙুল তোলার সুযোগ করে দেয়, আর পেছনের অ্যালগরিদমিক আর্কিটেকচার থেকে ক্রমাগত নগদ মুনাফা ঝরে পড়তে থাকে।
নিরপেক্ষতার এই মিথ পরিত্যাগ করার অর্থ কখনোই প্রযুক্তি ধ্বংস করার ডাক নয়। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো সিস্টেমের ভেতরের ডিজাইনসংক্রান্ত প্রতিটি সিদ্ধান্তকে একটি প্রকাশ্য সামাজিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা। কার ডেটা স্ক্র্যাপ করা হচ্ছে? মডেলের মৌলিক বিধানে কোন কোন ক্ষতিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে? সিস্টেমের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার নির্দেশিকা বা সেফটি-রিফিউজাল কোন ভাষায় পরীক্ষা করা হচ্ছে? রেড-টিমিংয়ের নিরাপত্তা যাচাইয়ে কারা দায়িত্ব পালন করছেন? আর যখন একজন নারী অভিযোগ করেন যে ক্লাসিফায়ার হুমকিটি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে কারণ এটি বাংলা ভাষায় লেখা হয়েছিল কিংবা নিছক গালাগালির বদলে ‘সম্মান’ বা সামাজিক সংস্কারের আড়ালে প্রকাশ করা হয়েছিল—তখন কার বক্তব্যকে বিশ্বাস করা হচ্ছে? এগুলো নিছক বৈচিত্র্য প্রদর্শনের কোনো অলংকার নয়; এগুলো হলো প্রযুক্তি-কাঠামোর অন্তর্নিহিত রাজনীতি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক এই নারীবিদ্বেষী সহিংসতা যদি বৃদ্ধির বদলে কমাতে হয়, তবে প্রকৌশলী, বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রথমেই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সত্যকে অবনত মস্তকে স্বীকার করতে হবে: কোড হলো একটি রাজনৈতিক উপাদান। ঢাকার মতো জায়গায় এ ধরনের সংলাপ আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা ঠিক এই কারণেই যে, যে কক্ষগুলোতে মানুষ কেবল উদ্ভাবনের জয়গান গাইতে ভালোবাসে, সেখানে এখনও এই বাক্যটির পক্ষে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। যতদিন না এই সত্য গৃহীত হচ্ছে, ততদিন ওয়াটারমার্কিং, কনটেন্ট টেকডাউন, ফরেনসিক প্রশিক্ষণ কিংবা নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা (WPS) জাতীয় কর্মপরিকল্পনার মতো প্রতিটি পরবর্তী সংস্কার কেবল খোলা নলের নিচে দাঁড়িয়ে প্লাবিত মেঝে মোছার নিষ্ফল চেষ্টার মতোই পরিহাস হয়ে থাকবে।
লেখক || পিএইচডি, পিজিডি (অক্সফোর্ড); প্রধান উদ্ভাবন কর্মকর্তা ও মহাপরিচালক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। তিনি একজন কূটনীতিক ও উদ্ভাবন কৌশলবিদ, যিনি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাসনব্যবস্থার সংযোগস্থলে কাজ করেন। যুক্ত রয়েছেন Digital@UNGA, শিক্ষা ও এআই, সার্বভৌম কম্পিউট এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে।
এডিটরস নোট || আলোচ্য নিবন্ধে প্রকাশিত অভিমত লেখকের নিজস্ব তাত্ত্বিক ও নীতিগত বিশ্লেষণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জেন্ডার ন্যায়ের জটিল সমীকরণকে উন্মোচনের অংশ হিসেবে নিবন্ধটি সম্পাদকীয় প্রমিতকরণসহ প্রকাশ করা হলো।





