শেষ হলো ফুডপ্রো এক্সপো
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় আহ্বান
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও স্মার্ট ফ্যাক্টরি প্রযুক্তি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে বৈশ্বিক সক্ষমতা বাড়াবে
- আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ল্যাব ও রেডিয়েশন সুবিধার অভাবে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পরিকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অটোমেশন, মেশিন ভিশন, রোবোটিকস এবং স্মার্ট ফ্যাক্টরি প্রযুক্তির আধুনিক প্রয়োগ বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বৃদ্ধির আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ‘বাপা ফুডপ্রো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো’।
১২ সেপ্টেম্বর, শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনের ১১তম আসর শেষ হয়। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) এবং রেইনবো এক্সিবিশন অ্যান্ড ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড (রিমস) যৌথভাবে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। প্রদর্শনীতে ২৭ দেশের দুই শতাধিক ব্র্যান্ড খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন, লজিস্টিকস ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি প্রদর্শন করে।
সমাপনী দিনে ‘এক্সপোর্ট অব অ্যাগ্রো-প্রসেসিং: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক টেকনিক্যাল সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা ফেলো আবু সালেহ মো. শামীম আলম শিবলী। সেশনে উপস্থিত ছিলেন বাপার সভাপতি মাহবুব আনাম ও বাপার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি উজমা চৌধুরী। বাপার সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছানের সঞ্চালনায় সেশনের প্যানেল আলোচক ছিলেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (এক্সপোর্ট) মিজানুর রহমান ও স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পারভেজ সাইফুল ইসলাম।
মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বর্তমান ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার ২০২৮ সালে ২৩৬ বিলিয়নে পৌঁছাবে। বাংলাদেশে ১ হাজার কারখানার মধ্যে প্রায় ৭০০টি প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী হলেও বিশ্ববাণিজ্যের প্রতি ১০০ টাকায় ভিয়েতনামের ৩ টাকা ৮৯ পয়সার বিপরীতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ৫ পয়সা। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি ১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছে। রপ্তানির ৪৫ শতাংশই বিস্কুট ও স্ন্যাকসজাতীয় পণ্য এবং বাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ। দেশে ২২ ধরনের ফসল উৎপাদনে শীর্ষ দশে থাকলেও সংরক্ষণ প্রযুক্তির অভাব, জমি বণ্টন সমস্যা, বন্দর জটিলতা ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার ধরা যাচ্ছে না। সংকট কাটাতে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিএপি), আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব, সেচ খরচ হ্রাস, বাণিজ্য চুক্তি ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার সুপারিশ করা হয়।
স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজ সাইফুল ইসলাম বলেন, "কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আমরা ১ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছুঁয়েও আবার পিছিয়ে পড়েছি। এর মূল কারণ নীতিমালার বারবার পরিবর্তন। সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে আমরা বেশ ভালো করছিলাম, কিন্তু হঠাৎ করেই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত ক্রেতাদের আমরা হারিয়ে ফেলি।" তিনি জানান, মসলা রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় রেডিয়েশন সুবিধার মারাত্মক অভাব রয়েছে এবং বিদ্যমান পরিকাঠামো প্রায়ই অচল থাকে। ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল পণ্যের বাজারে নির্ভরযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও নীতিগত ব্যর্থতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের করপোরেট ফাইন্যান্স পরিচালক ও বাপার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি উজমা চৌধুরী বলেন, "আমরা অ্যাগ্রো-প্রসেসিং খাতকে এগিয়ে নিতে অনেক উদ্যোগ নিতে চাই, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় নীতিগত বা সমন্বিত কোনো সহায়তা পাই না। অন্যদিকে, কৃষকদের নতুন উদ্যোগে উৎসাহিত করার পরিবর্তে তারা উল্টো আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। একসময় আমরা পান বা মাছ প্রচুর রপ্তানি করতাম, অথচ এখন কেন পারছি না-তা নিয়ে গভীর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।" তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার সময়ে চাল রপ্তানির অনুমতির জন্য দেনদরবার করেও রপ্তানি করা যায়নি। এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি না থাকা দেশে কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে সম্ভাবনাময় বাজারগুলো নষ্ট হচ্ছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান বলেন, "বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। বৈশ্বিক এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। দেশে অনেক সম্ভাবনা থাকলেও ছোট ছোট কোম্পানিগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে টিকে থাকতে পারছে না। একটি অ্যাগ্রো-প্রসেসিং ব্যবসা শুরু করতেই দুই থেকে তিন ডজন লাইসেন্স নিতে হয়, যা মূলত হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে।" অনুমোদনেই উদ্যোক্তাদের দুই বছর পর্যন্ত ব্যয় হওয়াকে তিনি বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মিজানুর রহমান জানান, ১৩৮টি দেশে রপ্তানি হলেও আয়ের ৯০ শতাংশই আসে প্রবাসী বাজার থেকে। আন্তর্জাতিক ‘মডার্ন ট্রেড’ বা সুপারশপের কমপ্লায়েন্স ও মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় মূলধারার বৈশ্বিক বাজারে ঢোকা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, "দেশে আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং সুবিধার বড় ঘাটতি রয়েছে। বিদেশ থেকে ল্যাব টেস্ট করিয়ে আনতে আনতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত লিড টাইম শেষ হয়ে যায়। ফলে গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।"
বাপা প্রতিনিধিরা জানান, এটি কেবল বাণিজ্যমেলা নয়; খাদ্যপ্রযুক্তি, ফর্মুলেশন, জ্ঞান বিনিময় ও বৈশ্বিক সংযোগের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে ফুডপ্রো কার্যকর অবদান রাখছে। দফতরগুলোর দ্রুত নীতিগত সমন্বয় দাবি করেন উদ্যোক্তারা।
//ডিবিটেক/বিএনজেএন/এসই/ইআইসি//





