মোবাইল ফাইন্যান্স ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্রতারণা রোধে সমন্বিত ৭ পদক্ষেপ সরকারের
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে হ্যাকার ও প্রতারক চক্রের কারসাজি রোধে সাতটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার।
৬ এপ্রিল সোমবার সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের (ঢাকা-১৮) প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ফিনটেকে প্রতারক চক্র দমনে গৃহীত প্রধান সাতটি ব্যবস্থা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এমএফএস ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা ঠেকাতে এক এনআইডির বিপরীতে একটি এমএফএস প্রোভাইডারের সঙ্গে একটিমাত্র মোবাইল হিসাব চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের মোবাইল নম্বর তার নিজস্ব এনআইডিতে নিবন্ধিত কিনা তা যাচাই করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সহায়তায় একটি সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসির মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
পাশাপাশি গ্রাহকদের পিন নম্বর সুরক্ষা ও প্রতারণা সম্পর্কে সচেতন করতে এসএমএস, ভয়েস মেসেজ, ইমেইল এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর জন্য এমএফএস প্রোভাইডারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও এমএফএস এজেন্টদের কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। যেসব এজেন্টের মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেন হয়; তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গ্রাহকদের অভিযোগ কেস-টু-কেস ভিত্তিতে এমএফএস প্রোভাইডারদের নিজস্ব অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে।
পঞ্চমত- অভিযোগের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ষষ্ঠত- এমএফএস প্রোভাইডারদের ঝুঁকি নিরূপণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন বিভাগ নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম চালাচ্ছে। সপ্তমত- সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-এ রিপোর্ট করা হচ্ছে এবং এর ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া অনলাইন ব্যাংকিং সেবায় নিরাপত্তা জোরদার করতে সব ব্যাংকে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (২এফএ) চালু রয়েছে; যা গ্রাহকের লেনদেনকে আরও সুরক্ষিত করছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মোবাইল ফাইন্যান্স ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রতারণা কমিয়ে আনা এবং গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় ও সহজ পরিশোধ ব্যবস্থা হিসেবে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। এই আধুনিক পদ্ধতি প্রযুক্তিগতভাবে নিরাপদ হলেও ব্যবহারগত কারণে বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। গ্রাহকদের পাসওয়ার্ড শেয়ার করা, ডিভাইস হ্যাকিং এবং প্রতারকদের নতুন নতুন কৌশলের কারণে মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমের নিরাপত্তা জোরদার ও প্রতারণা প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের নবম দিনে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের (নোয়াখালী-৫) এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও জানান, আমির খসরু বলেন, করপোরেট গভর্নেন্স কোড সংশোধন করে ‘কর্পোরেট গভর্নেন্স রুলস ২০২৬’ প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তদন্ত ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম জোরদারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কারসাজি ও অনিয়ম বন্ধে বাজারের আধুনিকায়ন এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাজারে প্রবেশাধিকার সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে সরকার বড় ধরনের আইনি সংস্কারের হাত দিয়েছে। বিএসইসি আইন ২০২৫: ১৯৬৯ সালের অর্ডিন্যান্স এবং ১৯৯৩ সালের আইনের সংমিশ্রণে সম্পূর্ণ নতুন একটি আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন ২০২৬: দাবিবিহীন ডিভিডেন্ড ও শেয়ারের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য এই আইনটি করা হচ্ছে। হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা বিধিমালা ২০২৬: পুঁজিবাজারের অনিয়ম প্রকাশকারীদের সুরক্ষা দিতে নতুন বিধিমালা করা হচ্ছে।”
বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে বিনিয়োগ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে দেশব্যাপী তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিটিভিতে ‘পুঁজিবাজারের জানা-অজানা’ নামে পাক্ষিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক কন্টেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং এটি দেশের অর্থনীতির একটি টেকসই স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।”
ডিবিটেক/এফআই/ইকে



