২৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা গুনছে মেটা-টিকটক-ইউটিউব
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত আসক্তির কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ক্ষতিপূরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের একটি স্কুল ডিস্ট্রিক্টকে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ (২৭ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার দিতে রাজি হয়েছে মেটা ও টিকটকসহ বিশ্বের শীর্ষ চার সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট। কেন্টাকির ‘ব্রেথিথ কাউন্টি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট’-এর দায়ের করা একটি মামলার প্রেক্ষিতে গত শুক্রবার রয়টার্সের হাতে আসা আদালতের গোপন নথিপত্র থেকে এই বিশাল সমঝোতা বা সেটেলমেন্টের তথ্যটি প্রথমবারের মতো ফাঁস হয়েছে।
আইনি পরিভাষায় এই মামলাটিকে ‘বেলওয়েদার কেস’ বা দিক-নির্দেশক মামলা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কারণ এই একটি মামলার রায়ের ওপর ভিত্তি করেই যুক্তরাষ্ট্রের আরও ১ হাজার ২০০টি স্কুল ডিস্ট্রিক্টের করা একই ধরনের মামলার ভাগ্য এবং জরিমানার অঙ্ক নির্ধারিত হবে।
সবচেয়ে বেশি জরিমানা দিচ্ছে মেটা
আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, সমঝোতার আওতায় ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান মেটা প্ল্যাটফর্মস এককভাবে সবচেয়ে বেশি- প্রায় ৯০ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০৫ কোটি টাকা) জরিমানা দিতে রাজি হয়েছে। আগামী জুন মাসে এই মামলার আনুষ্ঠানিক ট্রায়াল বা শুনানি শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার কয়েক সপ্তাহ আগেই ২১ মে মেটা এই সমঝোতায় পৌঁছায়।
মেটা ছাড়াও অন্যান্য বিবাদী কোম্পানির মধ্যে শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম টিকটক এবং স্ন্যাপচ্যাট প্রত্যেকে ৮০ লাখ ডলার (প্রায় ৯৪ কোটি টাকা) করে জরিমানা দিতে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে ভিডিও স্ট্রিমিং জায়ান্ট ইউটিউব দিতে যাচ্ছে ২০ লাখ ১০ হাজার ডলার। জরিমানার পাশাপাশি ইউটিউব ওই স্কুল ডিস্ট্রিক্টের শিক্ষকদের জন্য ‘গুগল ক্লাসরুম’ ও অন্যান্য শিক্ষামূলক টুলস ব্যবহারের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দায় স্বীকার করেনি কোনো কোম্পানি
পাবলিক রেকর্ড রিকোয়েস্টের মাধ্যমে রয়টার্সের সংগ্রহ করা এই চুক্তির কপিতে দেখা গেছে, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করলেও কোম্পানিগুলো আদালতে তাদের কোনো আইনি দায় বা দোষ স্বীকার করেনি। এমনকি তাদের প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনতেও তারা বাধ্য নয়। কোম্পানিগুলোর দাবি, তারা কিশোর-কিশোরী ও তরুণ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে এবং আদালতের বাইরে এই বিষয়টির একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান করা হয়েছে।
আসক্তি ছড়ানোর খেসারত দিচ্ছে টেক জায়ান্টরা
কেন্টাকির অ্যাপালাচিয়া অঞ্চলের ব্রেথিথ কাউন্টি স্কুল ডিস্ট্রিক্টটি মাত্র ১,৬০০ শিক্ষার্থী ও ৬টি স্কুল নিয়ে গঠিত একটি ছোট গ্রামীণ এলাকা। তারা মেটা, গুগল ও টিকটকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল যে—কোম্পানিগুলো তাদের অ্যাপের ডিজাইন বা অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা দিন-রাত মোবাইল স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে, যার পুরো ধকল সামলাতে হচ্ছে স্কুল কর্তৃপক্ষকে।
স্কুল ডিস্ট্রিক্টটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চিকিৎসার জন্য মূলত ৬০ মিলিয়ন ডলার দাবি করেছিল। তবে আদালতের এই মধ্যস্থতায় তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
লাইনে আছে আরও বড় বড় স্কুল ডিস্ট্রিক্ট
ব্রেথিথ কাউন্টির এই জয় আমেরিকার অন্যান্য বড় বড় শহরের স্কুলগুলোর জন্য এক বিশাল আইনি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল কোর্টে ইতিমধ্যেই এই সংক্রান্ত শত শত মামলা একত্রিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে অ্যারিজোনার ‘টুকসন ইউনিফাইড স্কুল ডিস্ট্রিক্ট’ (৪০ হাজার শিক্ষার্থী) শিক্ষার্থীদের ১৫ বছরের মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির জন্য ১.১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে, যার বিচার আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হবে। এছাড়া লস অ্যাঞ্জেলেস এবং নিউ ইয়র্ক সিটির মতো আমেরিকার বৃহত্তম পাবলিক স্কুল সিস্টেমগুলোও (যেখানে ১২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে) এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে একই অভিযোগে মামলা ঠুকে দিয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্টাকির এই ২৭ মিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক সেটেলমেন্টের পর এবার সিলিকন ভ্যালির টেক জায়ান্টদের হাজার কোটি ডলারের খেসারত দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে।
ডিবিটেক/বিএমটি । সূত্র: রয়টার্স



