নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফি পরিশোধ অনলাইনে

নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফি পরিশোধ অনলাইনে
২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৩:১২  

দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এখন থেকে বেসরকারি স্কুল ও কলেজে শিক্ষার্থীদের সব ধরনের ফি এবং প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় নগদ টাকায় গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবর্তে সরকারি ব্যাংকের অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে এসব লেনদেন সম্পন্ন করতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’-এ এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি উপসচিব সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলী স্বাক্ষরিত এই নীতিমালাটি কার্যকর করা হয়েছে।

নীতিমালার মূল দিকসমূহ:

  • অনলাইন পেমেন্ট বাধ্যতামূলক: শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, সেশন চার্জসহ সব ধরনের আয় সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ে (এসপিজি) বা অন্য কোনো সরকারি ব্যাংকের অনলাইন গেটওয়ের মাধ্যমে আদায় করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া কোনোভাবেই নগদ টাকা হাতে নেওয়া যাবে না।

  • পুনঃ ভর্তি ফি বাতিল: একই প্রতিষ্ঠানে এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে ওঠার সময় কোনোভাবেই 'পুনঃ ভর্তি ফি' নেওয়া যাবে না। তবে নিয়ম অনুযায়ী সেশন চার্জ নেওয়া যাবে।

  • কঠোর শাস্তি: আর্থিক অনিয়মের জন্য প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক যৌথভাবে দায়ী থাকবেন। দায়িত্ব ছাড়ার পরও যদি আগের কোনো অনিয়ম ধরা পড়ে, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এটি 'অসদাচরণ' হিসেবে গণ্য হবে এবং এমপিও স্থগিত বা বরখাস্তের মতো শাস্তি হতে পারে।

  • ই-ক্যাশ বুক: স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরিবীক্ষণ ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) একটি অনলাইন ভিত্তিক ‘ই-ক্যাশ বুক’ সিস্টেম তৈরি করবে, যেখানে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ভাউচার এন্ট্রি করতে হবে।

নগদ খরচের সীমা ও উপকমিটি

নীতিমালায় দৈনন্দিন খুচরা খরচের (ইমপ্রেস্ট ফান্ড) জন্য প্রতিষ্ঠানের ধরনভেদে মাসে ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে একক কোনো ভাউচারে ২৫ হাজার টাকার বেশি নগদ খরচ করা যাবে না; এর বেশি হলে অবশ্যই ক্রস চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া আর্থিক কার্যক্রম তদারকিতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অর্থ, ক্রয় ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাসহ মোট ৬টি উপকমিটি গঠন করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান জানান, এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর এই খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতেই এই উদ্যোগ। ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ২২ হাজার ৬৫৭টি বেসরকারি স্কুল ও কলেজ রয়েছে।

প্রসঙ্গত, এর আগেও পুনঃ ভর্তি ফি না নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানেনি। তবে এবারের নীতিমালায় পরিচালনা কমিটি বাতিল ও এমপিও স্থগিতের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রাখায় অনিয়ম বন্ধ হবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।

শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অগ্রিম বা ঋণ সুবিধা

নতুন নীতিমালায় শিক্ষক-কর্মচারীদের মানবিক দিক বিবেচনায় রেখে ঋণের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো দেওয়া হয়েছে:

  • পরিমাণ: কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী তাঁর মূল বেতনের (Basic Pay) সর্বোচ্চ ৬ মাসের সমপরিমাণ টাকা অগ্রিম বা ঋণ হিসেবে নিতে পারবেন।

  • উদ্দেশ্য: এই ঋণ সুবিধা কেবল জরুরি চিকিৎসা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো মানবিক প্রয়োজনে প্রদান করা যাবে।

  • সমন্বয়: এই টাকা পরবর্তী সময়ে কিস্তিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা কর্মচারীর মাসিক বেতন থেকে সমন্বয় বা কেটে নেওয়া হবে।

আর্থিক তদারকিতে ৬টি উপকমিটি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে ৬টি উপকমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটিগুলোর কাজ হবে নিম্নরূপ:

  • অর্থ উপকমিটি: প্রতিষ্ঠানের সার্বিক বাজেট প্রণয়ন এবং আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাতগুলো তদারকি করা।
  • ক্রয় উপকমিটি: প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, বই বা অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দরপত্র প্রক্রিয়া দেখাশোনা করা।
  • উন্নয়ন উপকমিটি: নতুন ভবন নির্মাণ বা সংস্কারকাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন তদারকি করা।
  • টিউশন ফি ও সেশন চার্জ আদায় উপকমিটি: শিক্ষার্থীদের ফি সঠিকভাবে অনলাইন গেটওয়েতে জমা পড়ছে কি না এবং কেউ বকেয়া রাখলে তা সংগ্রহে কাজ করা।
  • অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কার্যক্রম মূল্যায়ন উপকমিটি: প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবগুলো নিয়মিত যাচাই করা এবং কোনো গরমিল আছে কি না তা দেখা।
  • অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা (Internal Audit) কমিটি: এটি মূলত একটি চেক-অ্যান্ড-ব্যালেন্স কমিটি, যারা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ভাউচার ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট অডিট করবে।

অনিয়মে কঠোর শাস্তি (অসদাচরণ)

নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা যদি আর্থিক বিধি লঙ্ঘন করেন বা নগদ টাকা লেনদেনে জড়িত থাকেন, তবে তা 'অসদাচরণ' হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে:

  • সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এমপিও (MPO) সাময়িক বা স্থায়ীভাবে স্থগিত করা হতে পারে।

  • গুরুতর ক্ষেত্রে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হতে পারে।

  • এমনকি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিও বাতিল করার ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে।ডিবিটেক/এজিপি/ইকে