এআই এবং ‘স্মার্ট যুদ্ধের’ মায়াজাল

এআই এবং ‘স্মার্ট যুদ্ধের’ মায়াজাল
৩১ মে, ২০২৬ ০০:১৩  

অস্ত্র উন্নয়নের দীর্ঘ ও চাকচিক্যহীন ইতিহাসে এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন কোনো প্রযুক্তি কেবল একটি হাতিয়ার হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে সামরিক ডকট্রিন বা নীতিতে পরিণত হয়। মেশিনগান যখন প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল, তখন সেটি ছিল মানুষের কৌতুহলের বস্তু। এরপর তা হয়ে উঠল যুদ্ধের কৌশলগত উপকরণ, যা পরবর্তীতে ইউরোপীয় সভ্যতার পুরো কাঠামোকেই বদলে দিয়েছিল এবং ফ্ল্যান্ডার্সের কাদামাটিতে সমাহিত করেছিল আস্ত একটি প্রজন্মকে। পারমাণবিক বোমার বিপণন করা হয়েছিল একটি চলমান যুদ্ধকে থামানোর উপায় হিসেবে; অথচ মাত্র এক দশকের মধ্যে এটি বিশ্ব রাজনীতিকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করল, যার ফলে তৈরি হলো এক স্থায়ী পারস্পরিক ভীতির পরিবেশ—যা আজও আমাদের তাড়া করে বেড়ায়।

আমরা আজ আবারও ঠিক তেমনই একটি সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি। এবারের প্রযুক্তিটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। এটি ইতিমধ্যেই বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়েছে, যা নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু (টার্গেট) শনাক্ত করছে এবং কে বাঁচবে আর কে মরবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে অবিশ্বাস্য গতিতে ত্বরান্বিত করছে। তাই এআই যুদ্ধক্ষেত্রের রূপান্তর ঘটাবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন অবান্তর; কারণ এটি ইতিমধ্যে তা ঘটিয়ে ফেলেছে। এখন আসল এবং অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হলো—আমরা আসলে কোন ধরনের যুদ্ধকে বেছে নিচ্ছি, এবং আদৌ কি আমরা সচেতনভাবে এটি বেছে নিয়েছি?

মোটরসাইকেল ট্র্যাকিং থেকে দিনে ৫ হাজার লক্ষ্যবস্তু
পেন্টাগনের ফ্ল্যাগশিপ এআই টার্গেটিং প্রোগ্রাম ‘প্রজেক্ট মেভেন’ (Project Maven) কোনো মহৎ কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জন্ম নেয়নি। এটি তৈরি হয়েছিল একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবহারিক হতাশা থেকে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ড্রোন থেকে আসা এত বিপুল পরিমাণ ভিডিও ফুটেজের সাগরে ডুবছিল যে, মানুষের পক্ষে তা প্রসেস বা বিশ্লেষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বিশ্লেষকরা ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত চোখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, যেখানে ভুলের সম্ভাবনা ছিল প্রবল। মেভেনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সাধারণ—কম্পিউটার ভিশন বা কৃত্রিম চোখ দিয়ে প্রাথমিক বাছাইয়ের কাজটি করা হোক, যেন মানুষের বিচারবুদ্ধি খাটানোর সুযোগ তৈরি হয়। যেমন—মোটরসাইকেলের গতিবিধি ট্র্যাক করা বা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন চিহ্নিত করা।

যুক্তিটি বেশ যৌক্তিক শোনায়। ঐতিহাসিকভাবে প্রতিটি মারণাস্ত্রের বিপ্লব এভাবেই শুরু হয়—খুবই সীমিত এবং বাস্তবসম্মত একটি যৌক্তিকতা দিয়ে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই সংখ্যাগুলো জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল জিওস্প্যাশিয়াল-ইনটেলিজেন্স এজেন্সি’ গত বছর গর্ব করে জানিয়েছিল যে, এআই প্রযুক্তি ছাড়া যেখানে দিনে ১০০টি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা যেত, এআই-এর সহায়তায় তা এক লাফে ১ হাজারে উন্নীত হয়েছে। আর এর সাথে যদি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) যুক্ত করা যায়, তবে লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা দিনে ৫ হাজারে পৌঁছানো সম্ভব। ৫ হাজার! যে মানুষটি আগে মাত্র ৫০টি ছবি বিশ্লেষণ করতে হিমশিম খেত, সে এখন নামমাত্র এই বিশাল স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার ‘লুপ’ বা চক্রের মধ্যে অবস্থান করছে। সামরিক কমান্ডাররা জনমনে স্বস্তি দিতে ‘হিউম্যান ইন দ্য লুপ’ (সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় মানুষের অন্তর্ভুক্তি) শব্দবন্ধটি যেভাবে জপের মতো আওড়ান, তা এখন সুরক্ষাকবচের চেয়ে জনসংযোগ কৌশলের মতোই বেশি মনে হয়।


সাবেক মার্কিন জেনারেল জিম ম্যাটিস একটি খাঁটি কথা বলেছিলেন—কেবল নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা কখনোই মূল যুদ্ধকৌশলের বিকল্প হতে পারে না। দিনে ৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সক্ষমতা আপনাকে এটি বলে দেবে না যে, এই আঘাতগুলো আদৌ কোনো যৌক্তিক লক্ষ্য অর্জন করছে কি না। ইরাক এবং আফগানিস্তানে বছরের পর বছর রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্র এই শিক্ষাটি পেয়েছিল। কিন্তু এআই-এর মোহে মানুষ তা আবারও ভুলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে—যেখানে গতি ও স্কেলকে কার্যকারিতা এবং দক্ষতাকে প্রজ্ঞা বলে ভুল করা হচ্ছে।

কৌশলের ব্যর্থতা ও মানবিক বিপর্যয়
ইরানে চালানো সাম্প্রতিক অভিযানগুলোকে এআই-নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের একটি বাস্তব মহড়া হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে, আগে যে সিদ্ধান্ত নিতে কয়েক দিন সময় লাগত, এআই তা কয়েক সেকেন্ডে নামিয়ে এনেছে। প্রযুক্তিগতভাবে এটি চমৎকার। কিন্তু কৌশলগত অর্জন কী? সংশ্লিষ্ট দেশের শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটেনি, কোনো গণঅভ্যুত্থানও হয়নি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানেরও কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। গতি এবং নিখুঁত নিশানা যে যুদ্ধ জয়ের মূল চাবিকাঠি—তার প্রমাণ মেলেনি। ইরানের ক্ষেত্রেও মার্কিন সামরিক অভিজ্ঞতার সেই চেনা রূপই দেখা গেছে—মেশিন বা প্রযুক্তি ঠিকঠাক কাজ করেছে, কিন্তু যুদ্ধকৌশল ব্যর্থ হয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো এর বেসামরিক বা মানবিক মূল্য। এআই-এর ভুলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার মতো ঘটনা এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আগের যুগে এমন ঘটনা ঘটলে কংগ্রেসে শুনানি হতো, তদন্ত হতো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হতো। কিন্তু এআই যুগে আলোচনার মোড় মুহূর্তেই ঘুরে যায় প্রযুক্তির দিকে। প্রশ্ন তোলা হয়—অ্যালগরিদম কি সঠিকভাবে কাজ করেছিল? ডাটা কি ঠিকঠাক লেবেল করা ছিল? অর্থাৎ, মানুষের মৃত্যুও এখন এক ধরনের কারিগরি বা 'ডিবাগিং' সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

এটি কোনো কাল্পনিক আশঙ্কা নয়। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন তৈরি হয়েছিল কারণ লাগামহীন যুদ্ধ কখনো শেষ হয় না, বরং তা সংক্রমিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধের ক্ষেত্রে আনুপাতিকতা, স্বাতন্ত্র্য এবং সতর্কতার মতো আইনি ও নৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এই কাঠামোর কারণেই একটি দেশের যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী রূপ পায়। একে ক্ষুণ্ন করলে কৌশলগত মূল্য অনেক গুণ বেড়ে যায়।

পাল্টা যুক্তি এবং বাস্তবতা
এই বিতর্কের একটি জোরালো পাল্টা যুক্তিও রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যুদ্ধের ইতিহাসে 'ফ্রেন্ডলি ফায়ার' বা ভুলবশত নিজেদের সৈন্য কিংবা সাধারণ মানুষকে শত্রু ভেবে হত্যা করার মতো মর্মান্তিক ঘটনা সবসময়ই ছিল। এআই যদি মানুষের ক্লান্তি বা বিভ্রান্তিজনিত এই ভুলগুলো কমিয়ে আনতে পারে, তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক। প্রজেক্ট মেভেনের উদ্যোক্তারা কোনো যুদ্ধবাজ ছিলেন না, বরং তাদের অনেকেই ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সহযোদ্ধাদের ভুলবশত মৃত্যু দেখা এক একজন ভেটেরান বা সাবেক সৈনিক।

আসল সমস্যাটি হলো এআই-এর মূল নকশা এবং এর বর্তমান ব্যবহারের মধ্যকার বিশাল ফারাক। মোটরসাইকেল ট্র্যাক করার মতো প্রাথমিক সতর্ক উদ্দেশ্য থেকে এটি ধাপে ধাপে এক বিশাল মারণযজ্ঞের রূপ নিচ্ছে। পেন্টাগনের একটি প্রোগ্রাম তো এআই দিয়ে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার প্রস্তাবই বাতিল করে দিয়েছিল, কারণ "কোনো কর্মকর্তা একজন এআই-এর দেওয়া সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে নিজের ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলতে চাননি।" তাদের এই মানবিক তাড়না ঠিক ছিল, কিন্তু তীব্র প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে এই বোধ কতটুকু টিকে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে একটি ভিন্ন মডেল দেখিয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র সচেতনতা প্ল্যাটফর্ম ‘ডেল্টা’ (Delta) প্রমাণ করেছে যে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি মেশিনের হাতে ছেড়ে না দিয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব। ড্রোনের অপারেটররা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে কাজ করতে পারছেন, প্রতিটি ইউনিট যুদ্ধের লাইভ পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছে। এখানে মানুষ কেবল মেশিনের ডেথ-লিস্টে সিল মারার জন্য বসে নেই, বরং বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে মূল সিদ্ধান্তটি মানুষই নিচ্ছে। এটি নিখুঁত কোনো ব্যবস্থা নয়, তবে এটি দেখায় যে যুদ্ধের কুয়াশা দূর করতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি এআই-এর হাতে ছেড়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

একটি অননুমোদিত যুদ্ধ ও রাজনৈতিক শূন্যতা
সবচেয়ে বড় সংকটটি প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক। এআই-এর মাধ্যমে মার্কিন যুদ্ধরীতির এই রূপান্তরটি ঘটেছে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক আলোচনার বাইরে। মার্কিন কংগ্রেস স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো আইন পাস করেনি। সাধারণ জনগণকে জিজ্ঞেস করা হয়নি যে তারা মেশিনের গতিতে যুদ্ধ করতে রাজি কি না। পেন্টাগন এখন ‘হিউম্যান ইন দ্য লুপ’ কথাটি বাদ দিয়ে ‘যৌক্তিক পর্যায়ের মানুষের বিচারবুদ্ধি’ (appropriate levels of human judgment) শব্দবন্ধটি ব্যবহার করছে, যা কোনো আইনসভা দ্বারা অনুমোদিত নয়।

ইতিহাস বলে, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তি সবসময়ই তাকে নিয়ন্ত্রণকারী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায়। ড্রোন প্রোগ্রামটি নিয়ে জনমনে বিতর্ক শুরু হওয়ার বহু বছর আগে থেকেই এটি নীরবে প্রসারিত হয়েছিল। পারমাণবিক বোমার ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়ে যুদ্ধকৌশলবিদরা গভীরভাবে ভাবার আগেই ‘মিউচুয়াল অ্যাসিউরড ডেসট্রাকশন’ বা পারস্পরিক ধ্বংসের নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। প্রতিবারই প্রযুক্তি আগে ছুটেছে এবং গণতন্ত্র তার পিছু পিছু হেঁটেছে।

তবে এআই-এর গতি অন্য সব প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত। যুদ্ধক্ষেত্রে অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হবে কি না—এখন আর সেই প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, এই ধ্বংসযজ্ঞের শেষ সীমানা কোথায় এবং সেই সীমারেখাটি আসলে কে টানছে? এটি কোনো কারিগরি প্রশ্ন নয়, এটি একটি খাঁটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। আর দুঃখজনকভাবে এর উত্তর হচ্ছে—কেউই নির্দিষ্ট করে এই সীমারেখা টানছে না। আমরা এক অজ্ঞাত গন্তব্যের দিকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছুটে চলছি, যা আমাদের গভীর চিন্তায় ফেলার জন্য যথেষ্ট।

দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।