মাদ্রাজ থেকে নির্দেশনা পেয়ে প্রিন্ট হতো বিআরটিএ স্মার্ট কার্ড?
স্মার্ট কার্ড সরবরাহ ঘাটতি এবং প্রিন্টিংয়ের জটিলতায় প্রায় দশ লাখের বেশি লাইসেন্স এখনো বিতরণ করতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। প্রতিদিনই আবেদন জমা পড়লেও চলতি বছর নতুন করে গ্রাহকদের হাতে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দিতে পারছে না সংস্থাটি। সেবা চালুর এক দশক পর জানা যায়, এতোদিন ধরে ড্রাইভিং লাইসেন্স-সংক্রান্ত ডাটাবেজ ও সার্ভারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিলো কেবল ঠিকাদারদের হাতেই। ডাটাবেজে বিআরটিএর নিজস্ব কোনো অ্যাকসেসই (প্রবেশাধিকার) ছিলো না। আরো বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিটিআরটিএ’র যে ভেন্ডরের মাধ্যমে স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট করা হতো, তার জন্য চূড়ান্ত নির্দেশনা আসতে হতো ভারতের মাদ্রাজ থেকে!
সমস্যার সমাধানে সমস্যার সমাধানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয় বিআরটিএ। আইসিটি বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামারদের সহযোগিতায় অক্টোবরে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণসহ ডাটাবেজের অ্যাকসেস নিজেদের হাতে নিতে সক্ষম হয়েছে সংস্থাটি। আইটি অনুসন্ধানে আইসিটি বিভাগের প্রকৌশলীরা আবিস্কার করেছেন আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তারা জানতে পারেন, বাংলাদেশের নিবন্ধিত গাড়িচালক বা মালিকদের ডাটাবেজে বিআরটিএর নিজস্ব কোনো অ্যাকসেস (প্রবেশাধিকার) যেমন নেই; তেমনি চাইলেই অনুমোদন দেয়ার পরও স্বাধীনভাবে স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট করার ক্ষমতাও নেই বাংলাদেশে নিয়োগ দেয়া ঠিকাদারের। এ কার্যে ব্যবহৃত মিডলওয়্যার সফটওয়্যারে ডিপেন্ডেন্সি ছিল ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স- এর, যেই সফটওয়্যার দ্বারা ভারতে নাগরিকের ব্যক্তিগত উপাত্ত পাচারের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে পরিদর্শনে।
বিআরটিএ'র লাইসেন্স কার্ড প্রিন্টের মিডলওয়্যার সফটওয়্যারের কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিআরটিএ’র সিস্টেম এনালিস্ট আনোয়ার পারভেজ আর আইসিটি বিভাগ থেকে আইসিটি বিভাগের আইসিটি বিভাগের পলিসি এনালিস্ট সুস্মিত আসিফ। আসিফ জানান, বিআরটিএ স্মার্ট কার্ড প্রিন্টিং পর্যন্ত কাজ করতো তিনটি প্রতিষ্ঠান। মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স, সিএনএস এবং টাইগার আইটি। মাদ্রাজের পাশাপাশি পুরো সিস্টেমটাই টাইগার আইটির হাতে কুক্ষিগত ছিলো। সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আইসিটির প্রকৌশলীরা দেখতে পান ভেন্ডর লকের কারণে পুরো সিস্টেম অকার্যকর হয়ে আছে। তখন সোর্স কোড ও ডেটা সার্ভারে বিআরটিএ অফিসিয়ালদের কতৃত্ব পুণঃপ্রতিষ্ঠা করে দিয়ে আসে। তিনি বলেন, আমরা পর্যবেক্ষণে দেখি পাশের রুমে প্রিন্টার থাকলেও কমান্ড দেয়ার পর প্রিন্ট হচ্ছে না। তখন একটি এপিকে তৈরি করে সমস্যাটির সমাধান করি। এরপর প্রিন্ট শুরু হয়েছে। কিন্তু ধীরগতি। বিআরটিএ এখনো ব্ল্যাঙ্ক কার্ড কেনেনি। তাই পুর্ণদ্যোমে স্মার্টকার্ড প্রিন্ট শুরু না হলেও প্রিন্টিং সিস্টেম সচল। সিস্টেম সচল করার পাশাপাশি প্রিন্টের সক্ষমতা বাড়াতে এখন কয়েক বছর পড়ে পড়ে নষ্ট হওয়া প্রিন্টারও ঠিক করছি আমরা।
গত ১৪ অক্টোবর বিআরটিএ'র কারিগরি দলের সাথে সমন্বয়ে এই সমস্যাটির সমাধান করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রকৌশলী দল। তারা নিজস্ব অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করে সেই বাধাটা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ব্ল্যাঙ্ক কার্ডের সংকটে এখনো প্রিন্টিং কেবল সামান্য কিছু ইমার্জেন্সি কার্ডেই সীমাবদ্ধ। এদিকে বিআরটিএ’র সমস্যা সমাধানের দুদিন বাদেই গত ১৬ অক্টোবর সফটওয়্যার জটিলতায় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) স্মার্টকার্ড প্রিন্ট করার কাজ সাময়িক ভাবে বন্ধ থাকার খবর পাওয়া যায়। তবে এই প্রতিবেদন লেখার আগেই সেই সমস্যা সমাধানের পর তা চালুর কথা নিশ্চিত করেছেন জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের সিস্টেম অ্যাডমিন মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন।
অনুসন্ধানে সেখানেও ভেন্ডর হিসেবে টাইগার আইটি’র নাম পাওয়া যায়। দুইটি ঘটনাতেই ভেন্ডরের অ্যাপ্লিকেশন লেয়ারে ত্রুটির এবং সর্বোপরি উচ্চমাত্রার ভেন্ডর নির্ভরতার ও সরকারপক্ষের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবের কথা সামনে চলে আসে। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকের সেবা প্রাপ্তিতে তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহারের আগে তার আইটি অডিট, কারিগরি সক্ষমতা যাচাই ও মূল্যায়ন এবং স্থানীয় সত্যায়ন ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে এটুআই এর চিফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মনে করেন, যেকোনো সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেই নিয়মিত আইটি অডিট করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়মিত বিরতিতে সফটওয়্যার কোয়ালিটি টেস্টিং অ্যান্ড সার্টিফিকেশন বা, দুর্বলতা মূল্যায়ন এবং অনুপ্রবেশ পরীক্ষা বা ভিএপিটি বাধ্যতামূলক করা উচিত। এটি করতে হবে যেকোনো একটি সার্টিফায়েড কোম্পানির মাধ্যমে। পরীক্ষার ক্ষেত্রে ফ্রি’র চেয়ে পেইড ভার্সন টুলস ব্যবহার করলে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি আগাম ঝুঁকি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে ইলেকট্রনিক চিপযুক্ত ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স চালু করে বিআরটিএ। প্রথম পাঁচ বছরে লাইসেন্স সরবরাহে খুব একটা সমস্যা হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে শুরু থেকেই ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রকল্পে যুক্ত থাকা টাইগার আইটিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহের দায়িত্ব দেয়ার পরও কার্ড প্রিন্টিং ইস্যুর বিড়ম্বনা যেন কাটছেই না। বিশ্বব্যাংকের কালোতালিকাভুক্ত হওয়ায় ২০১৯ সালের আগস্টে টাইগার আইটির সঙ্গে বিআরটি চুক্তি বাতিল করার পর তা আরও প্রকট হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন টেন্ডার করে ঠিকাদার নিয়োগ দিলেও চুক্তির মেয়াদ ২০২১-এর জুন পর্যন্ত স্মার্ট কার্ডের সার্ভার এবং ডাটাবেজ হস্তান্তরে গড়িমসি করে টাইগার আইটি। তাদের মেয়াদ শেষে প্রায় ১২ লাখ ৪৫ হাজার লাইসেন্সের আবেদন ঝুলে যায়। টাইগার আইটি’র সঙ্গে কৌশল করে ডাটাবেজ নিজের দখলে রেখেই বিদায় নিয়ে বিআরটিএ এর স্মার্ট কার্ড ছাপার দায়িত্বে থাকা ভারতের মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স। তারা পুরো ক্ষমতায় নিজেদের হাতে কুক্ষিগত রেখেই বাংলাদেশের ব্যবসায় থেকে বিতাড়িত হলে পুরো প্রক্রিয়াটিই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিষয়টি সমাধানে এগিয়ে যায় আইসিটি বিভাগ।
এ বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযেগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বলেন, বিআরটিএ’র স্মার্টকার্ড প্রিন্টিং বন্ধ হয়ে গেলে সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা ফওজুল কবির খান আমাকে বিষয়টির সমাধানের অনুরোধ করেন। তখন আমি বিষয়টি বিসিসি-কে বলি। তারা অনুসন্ধানে যে তথ্য পেয়েছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। আমার দেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্ট করতে ভারতের মাদ্রাজ থেকে অনুমতি আসতে হতো। আমাদের প্রকৌশলীরা সেই সমস্যার সমাধান করেছেন। তবে বিদেশের একটা দেশের থেকে নির্দেশনা পেয়ে দেশে স্মার্টকার্ড প্রিন্ট করাটা বিস্ময়কর। এটা নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার কোনো মানদণ্ডেই পড়ে না। আমরা এগুলো ফিক্স করতেই ব্যক্তিগত উপাত্ত নিরাপত্তা আইনে এতো গুরুত্ব দিয়েছে। প্লাটফর্ম লায়াবেলিটি যুক্ত করেছি।







