‘রিভিউ বোম্বিং’ ঘটিয়ে ‘রেটিং ডাউন’ করছে আওমীপন্থী সংঘবদ্ধ চক্র
সম্প্রতি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশের নতুন একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম। এরপরই সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে নেতিবাচক ‘রিভিউ’ দেওয়া শুরু হয়। এতে কমতে শুরু করে ফেসবুক পেজটির ‘রেটিং’। আর এ কাজে সংঘবদ্ধভাবে কাজ করছে এক হাজারের বেশি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। এসব অ্যাকাউন্ট চালায় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। কন্টেন্ট পছন্দ না হলে তারা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি বিশ্লেষক, রাজনৈতিক দল, সরকারি সংস্থা, জনপ্রিয় ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজ ‘রিভিউ বোম্বিং’ ঘটিয়ে ‘রেটিং ডাউন’ করছেন।
একইভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারাকে অনলাইন হয়রানি নিয়ে একটি ফ্যাক্ট চেক প্রকাশের পর এমন রিভিউ বোম্বিংয়ের শিকার হয় তথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ ডিসমিসল্যাব এর ফেসবুক পেজ। প্রথমে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে নেতিবাচক রিভিউ দেওয়া হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অন্যান্য অ্যাকাউন্ট থেকে একই লেখা পুনরাবৃত্তি করা হতে থাকে। ২ ঘণ্টায় ৪৮টি নেতিবাচক রিভিউ পড়ে। এতে ডিসমিসল্যাবকে অপপ্রচারকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
এরপর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানী দল। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে মোট ১,১১৮টি ফেসবুক পেজের ৬২,৫৯২টি পোস্ট নিবিড় অনুসন্ধান করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে ডিসমিসল্যাব। ডিসমিসল্যাবের দুই গবেষক পার্থ প্রতিম দাস ও তৌহিদুল ইসলাম রাসো দেখতে পান, ওইসব অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় একই ভাষার রিভিউ দেয়া হয়েছে। একসাথে বা মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একাধিক পেজে তা পোস্ট করা হয়েছে। এসব রিভিউ থেকে একই রকম ২৩টি রিভিউ চিহ্নিত করেন তারা। পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানে তারা দেখে, ওই একই রিভিউ ১ হাজার ৪৭৩ বার ব্যবহৃত হয়েছে আরও ৩১৫টি পেজে
রিভিউ বোম্বিং প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২৩টি আলাদা রিভিউ “স্ক্রিপ্ট” (comment-text) ছিল, যেগুলো থেকে ২৭৮টি কোর অ্যাকাউন্ট, ৬ শতাধিক উচ্চ-কর্মক্ষমতা অ্যাকাউন্ট, এবং মোট প্রায় ১,০১৯টি অ্যাকাউন্ট এই রিভিউ বোম্বিং নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। এদের মধ্যে, জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এই চক্র অন্তত ৭২১টি পেজকে লক্ষ্যবস্তু করে। এসব রিভিউগুলো ছিল অত্যন্ত সমন্বিত। অভিযোগগুলোর ভাষা ছিলো- “মিথ্যা সংবাদ ছড়াচ্ছে”, “সন্ত্রাসকে প্রচার করছে”, “দেশে অপকর্ম করছে” টাইপের।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অ্যাকাউন্টগুলো কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা নিয়ন্ত্রণ করছেন। ২০২৫ সালে ২ অক্টোবর শুরু হয় এই রিভিউ বোম্বিং। চক্রটি ১৩ হাজারের বেশি রিভিউ পোস্ট করেছে, যার মধ্যে প্রায় ৯৪ শতাংশই আওয়ামী লীগপন্থী বার্তা বহন করে।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দৃক তাদের জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর ছবি পোস্ট করার পর তাদের ফেসবুক পেজ আক্রমণের মুখে পড়ে। বিএনপি মিডিয়া সেল, জামায়াতে ইসলামী, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনসহ বিভিন্ন দলের পেজ আক্রমণের শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে আক্রমণের শিকার হয়েছেন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (এনডিএম) ববি হাজ্জাজ, গণ অধিকার পরিষদের রাশেদ খান, ফারুক হাসান, তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীন, মোস্তফা ফিরোজ, বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমানসহ অনেকে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন মায়ের ডাকও আক্রমণের শিকার হয়েছে।
কীভাবে ওই অ্যাকাউন্টগুলো আওয়ামীলীগপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হলো প্রশ্নের জবাবে রাসো জানান, ওই পেজগুলোর । রিভিউ টেক্স, মতাদর্শ এবং পেজ ও প্রোফাইলের সাম্প্রতিক পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছি। একইভাবে এদের বিপক্ষে সংঘবদ্ধ হওয়া ২৪টি অ্যাকাউন্টও আমরা দেখতে পেয়েছি। দবে তাদের দলীয় পরিচয় বা মতাদর্শ স্পষ্ট নয়। আওয়ামী লীগ–সমর্থক পেজ, ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমের পেজ এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক রাজনীতিকের ফেসবুক প্রোফাইলে ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছে। কোনো কোনো অ্যাকাউন্ট কলকাতাভিত্তিক এবিপি আনন্দ ও রিপাবলিক বাংলার পেজে ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছে। জি ২৪ ঘণ্টার পেজেও বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছে চক্রটিতে থাকা অ্যাকাউন্টগুলো।
এদিকে আয়ামীপন্থী নেটওয়ার্কটি মূলত সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ফেসবুক পেজে বেশি আক্রমণ চালিয়েছে। বাদ যায়নি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অনলাইন বই বিক্রয় পেজ এবং প্রকাশনা সংস্থাও। এমনকি ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও পাকিস্তান হাইকমিশনের পেজও আক্রমণের শিকার হয়েছে। আওয়ামী লীগ–সমর্থক পেজ, ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমের পেজ এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক রাজনীতিকের ফেসবুক প্রোফাইলে ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছে। কোনো কোনো অ্যাকাউন্ট কলকাতাভিত্তিক এবিপি আনন্দ ও রিপাবলিক বাংলার পেজে ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছে। জি ২৪ ঘণ্টার পেজেও বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছে চক্রটিতে থাকা অ্যাকাউন্টগুলো। ফলে বিস্তৃতির বিবেচনায় এই সংঘবদ্ধ রিভিউ-কে অনলাইন মব হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের ভুয়া রিভিউর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়ার মতো ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটার ওপর চাপ বাড়ানোর পরামর্শ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন।
এ বিষয়ে ডিসম্যাসল্যাব কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না জানতে চাইলে ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছেন এখনও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ না করলেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ডক্যুমেন্টেশন প্রস্তুত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, রেটিং কমে গেলে নতুন ব্যবহারকারীরা অনেক সময় ওই পেজের ওপর আস্থা রাখতে পারেন না। তারা বিভ্রান্ত হন। তাই মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিষয়গুলো নিয়ে বেশি বেশি আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ফেসবুকে কোনো প্রতিষ্ঠানের পেজে ব্যবহারকারীরা রিভিউ দিতে পারেন। এতে বোঝা যায়, ব্যবহারকারী সেই পেজকে কতটা রিকমেন্ড করছেন তারই একটি প্রকাশ এই রিভউ রেটিং। সম্মিলিত আক্রমণের ফলে প্রতিষ্ঠানের রেটিং (মানুষের মতামতভিত্তিক মান) কমে যায়। ফলে রিভিউ করে সম্মিলিত ও ক্রমাগত আক্রমণ করে অনলাইনে রাজনৈতিক মত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মেটার কমিউনিটি গাইড লাইন অনুযায়ী ফেক রিভিউ হলে ফেসবুকে রিভিউ সিস্টেমে গিয়ে থ্রি ডটে ক্লিক করে পোস্ট রিভিউ এর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার পরামর্শ দিয়েছেন ডিসমিসল্যাব গবেষক তৌহিদুল ইসলাম রাসো।
ডিবিটেক/ডিএল/আইএইচ



