জাতীয় সামাজিক সংলাপ ফোরাম গঠনের আহ্বান
বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই শ্রম সংস্কারের লক্ষ্যে কার্যকর সামাজিক সংলাপকে একটি কার্যকরি পন্থা হিসেবে তুলে ধরতে ঢাকায় চলছে দুই দিনব্যাপী উচ্চপর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় সম্মেলন। ‘বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই শ্রম সংস্কারের হাতিয়ার হিসেবে কার্যকর সামাজিক সংলাপ: মানদণ্ড, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা শিরোননামে এই সম্মেলনের আয়োজক শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)।
৮ সেপ্টেম্বর বুধবার শুরু হওয়া এই সম্মেলনে সরকার, নিয়োগকর্তা ও শ্রমিক প্রতিনিধি ছাড়াও অংশগ্রহণ করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামাজিক সংলাপবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শ্রম সংস্কার কমিশন ২০২৪ এর প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে ‘টিম ইউরোপ ইনিশিয়েটিভ অন ডিসেন্ট ওয়ার্ক ইন বাংলাদেশ’-এর অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও কানাডা সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত প্রতিনিধিরা সামাজিক সংলাপের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশ শ্রম আইন সংস্কারে গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা। তারা মনে করেন শ্রমিক-মালিক সম্পর্ককে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অধীনে আনতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি অচিরেই একটি জাতীয় সংলাপ ফোরাম গঠন করা উচিত।
উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘শ্রমিক, নিয়োগকর্তা ও সরকারের মধ্যে পরামর্শ ও সংলাপের সংস্কৃতি তৈরি করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। গত এক বছরে আমরা দেখেছি, যেকোনো বিরোধ বা মতবিরোধ গঠনমূলক ও ইতিবাচক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন একটি বৈধ ও কার্যকর সামাজিক সংলাপের প্ল্যাটফর্ম। আশা করি, এই দুই দিনের সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে একটি স্থায়ী জাতীয় সামাজিক সংলাপ ফোরামের রূপরেখা নির্ধারণ করবেন।’ তিনি আরও জানান, শ্রমিক ও নিয়োগকর্তা সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা শেষে সরকার মন্ত্রিসভায় আইএলওর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন অনুমোদন করেছে। এগুলো হলো, কনভেনশন ১৫৫ (পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য), কনভেনশন ১৮৭ (প্রচার কাঠামো), এবং কনভেনশন ১৯০ (সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধ)।
এ সিদ্ধান্ত সরকারের আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুসরণের প্রতিশ্রুতিকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. সানওয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেন, ‘এই ত্রিপক্ষীয় সম্মেলন আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রতিফলন। সরকার, নিয়োগকর্তা কিংবা শ্রমিক একা কোনোভাবেই টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে না। সহযোগিতা, আস্থা ও সামাজিক সংলাপই হবে আমাদের পথনির্দেশক।’
আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর (মনোনীত) মি. ম্যাক্স তুয়োন বলেন, ‘শক্তিশালী সামাজিক সংলাপই টেকসই কর্মসংস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের মূল চাবিকাঠি। এটি শুধু একটি কার্যকরী পন্থা নয়, বরং একটি সংস্কৃতি— যা গড়ে তুলতে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুদৃঢ় আইনি কাঠামো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি।’
ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত এক্সেলেন্সি ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘টিম ইউরোপ ইনিশিয়েটিভ ফর ডিসেন্ট ওয়ার্ক’-এর পক্ষে বলেন, ‘কার্যকর সামাজিক সংলাপ ও যৌথ দরকষাকষির জন্য সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ কর্মীশক্তি অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদি লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস ও অন্তর্ভুক্তি তৈরিই এই সংলাপের মূল চাবিকাঠি হওয়া উচিত।’
অনুষ্ঠানে শ্রমিক ও নিয়োগকর্তা সংগঠনের প্রতিনিধিরাও স্থায়ী সংলাপ কাঠামো গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। চৌধুরী আশিকুল আলম, চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি ফর ওয়ার্কার্স এডুকেশন (NCCWE) শ্রম সংস্কার কমিশনের স্থায়ী কমিশন ও জাতীয় সামাজিক সংলাপ ফোরাম গঠনের সুপারিশকে স্বাগত জানান। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (BEF) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘খোলা, স্বচ্ছ ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমেই বিভিন্ন স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব। এতে সংস্কার প্রক্রিয়া যেমন বৈধতা পাবে, তেমনি তা টেকসইও হবে।’







