এক মাসে ১৮ ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি; তোপের মুখে বিমান
গত এক মাসে বিমানের অন্তত ৯টি উড়োজাহাজে উড়াল দেওয়ার আগে-পরে বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চাকা খুলে পড়া বা ফেটে যাওয়া, ইঞ্জিনে অতিরিক্ত কম্পন, কেবিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ল্যান্ডিং গিয়ারের দরজা না বন্ধ হওয়া। পাইলটের অজান্তে আকাশ থেকে উড়োজাহাজের চাকা খুলে মাটিতে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রায় সব ঘটনাই ঘটেছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে। সঙ্গত কারণে বেশ কয়েকটি মাঝ আকাশ থেকে ফিরে এসেছে, কিছু ফ্লাইট রানওয়েতে থেমে গেছে, আবার কিছু বাতিল হয়েছে।
এর ফলে শিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তোপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ বিমানের প্রকৌশল বিভাগ। এজন্য বিমানের প্রকৌশল বিভাগে দক্ষ জনবল সংকট এবং বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট পরিচালনায় দায়িত্বশীলদের অব্যবস্থাপনা আর গাফিলতির অভিযোগও সামনে এসেছে।
পেছনে তাকালে দেখা যায়, জুলাইয়ের শুরুতেই জেদ্দায় অবতরণের পর বোয়িংয়ের চাকায় ত্রুটি ধরা পড়ে। ১৬ জুলাই রাতে ‘চাকায় ত্রুটি’ দেখা দেওয়ায় বিমানের দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা রুটের একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজকে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘গ্রাউন্ডেড’ করা হয়। বিমানের আরেকটি ফ্লাইটে চাকা ও যন্ত্রাংশ পাঠানো পর উড়োজাহাজটি মেরামত করা হয়। ৩০ ঘণ্টা বিলম্বে দেশে ফেরে উড়োজাহাজটি। ফলে ওইদিন বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন বিমানের ৭৫ আরোহী। কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের সময় উড়োজাহাজটির এক পাশের চাকা খুলে গেলেও বৈমানিকের দক্ষতায় ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্লাইটটি নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হয়।
ওই মাসের শেষপ্রান্তে, ৩০ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা বিলম্বে ছাড়ে শারজাহ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট বিজি-৩৫২। ১৬ জুলাই, দুবাইয়ে বোয়িং উড়োজাহাজের চাকা ফেটে ফ্লাইট স্থগিত করতে হয় এবং ২৮ জুলাই দাম্মামগামী ফ্লাইট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফিরে আসে।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত ২৯ জুলাই ইতালির রোমের স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টায় বিমানের বিজি-৩৫৫ ফ্লাইটটি অবতরণ করে। যাত্রী ব্যাগেজ দেওয়ার সময় ১০ নম্বর লাগেজ বেল্টে অসংখ্য তেলাপোকা, পোকামাকড় ও তীব্র দুর্গন্ধ পায় ফিউমিচিনো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। তাৎক্ষণিকভাবে রোম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যাগেজ ডেলিভারি স্থগিত করে। এরপর বিমানবন্দর স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল জীবাণুনাশক কার্যক্রম শুরু করে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়ে প্লেনের ব্যাগেজ কনেটইনার পোকামাকড় মুক্ত করা হয়। ওই দিনই রোমের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে বিজি-৩৫৫ ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু বিমানের উড়োজাহাজটির ব্যাগেজ কনটেইনার জীবাণুমুক্ত করতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়। পরে সব কাজ শেষ করে রাত সোয়া ১১টায় উড্ডয়নের অনুমতি দেয় রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ওই সময় যাত্রীরা উড়োজাহাজের ভেতরে আটকে ছিলেন।
এর আগে ২৪ জুলাই দুবাই থেকে চট্টগ্রামে এসে যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়ে বিমানের আরেকটি বোয়িং ড্রিমলাইনার। উড্ডয়নের কিছু সময় পর পাইলট ল্যান্ডিং গিয়ারের দরজা ঠিকভাবে বন্ধ না হওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করলে সেটি আবার চট্টগ্রামে ফিরে যায়। ত্রুটি মেরামত শেষে দুই ঘণ্টা পর সেটি আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
সবশেষ গত ১২ আগস্ট ঢাকা-কুয়েত ও দুবাই রুটের দুইটি ফ্লাইটই বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার দিয়ে পরিচালনার কথা থাকলেও উড়োজাহাজের সংকটে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটের ঢাকা-কুয়েত রুটের বিজি ৩৪৩ ফ্লাইট এবং বিকেল ৫টা ৫ মিনিটের ঢাকা-চট্টগ্রাম-দুবাই ফ্লাইট দুটি বাতিল করতে হয়েছে। একদিন আগেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী বিজি-৬১৫ (ড্যাশ-৮) কেবিনের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ১১ আগস্ট উড্ডয়নের ২০ মিনিট পর ঢাকায় ফিরে আসে। ১০ আগস্ট রোম থেকে ঢাকাগামী বিজি-৩৫৬ (বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার) ডানার ফ্ল্যাপ কাজ না করায় ঢাকাগামী বিজি-৩৫৬ (বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার) ফ্লাইট বাতিল। ২৬২ যাত্রী হোটেলে অবস্থান করতে হয়। ৯ আগস্ট সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকামুখী বিজি-৫৮৫ ফ্লাইটের ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়ায় দুই ঘণ্টা মেরামতের পর যাত্রা শুরু করতে পারে। আবুধাবিগামী বিজি-৩২৭ মাঝ আকাশ থেকে ৭ আগস্ট ফিরিয়ে আনা হয় শৌচাগারের ফ্লাশ কাজ না করায়। ৬ আগস্ট ব্যাংককগামী ফ্লাইট ইঞ্জিনে কম্পনের কারণে মিয়ানমারের আকাশ থেকে জরুরি অবতরণ করতে হয়।
এমন পরিস্থিতে গত ১১ আগস্ট রাতে অ্যাভিয়েশন বিটের সাংবাদিকদের এক বার্তায় বিমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিমানের উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি সমাধানে প্রকৌশল বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আর বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. সাফিকুর রহমান বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে মালয়েশিয়ায়। মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে আসার পর তিনি সাম্প্রতিক বিমানের উড়োজাহাজে কারিগরি সমস্যা সম্পর্কে একটি প্রেস ব্রিফিং বা বিবৃতি দেবেন। ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি সবাইকে দেশের পতাকাবাহী বিমান সংস্থা হিসেবে বিমানের প্রতি বোঝাপড়া এবং সমর্থন করার জন্য অনুরোধ করেন।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং এবং ৫টি কানাডার ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ মডেলের। বোয়িংয়ের উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে: ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, ৪টি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, ৪টি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার। বিমান সূত্রে জানা যায়, যাত্রী ভোগান্তি কমাতে দুটি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে, পাশাপাশি নতুন ক্রয় পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।







