কেন স্পেসএক্সের বাজারমূল্য পৌনে ২ ট্রিলিয়ন ডলার?

কেন স্পেসএক্সের বাজারমূল্য পৌনে ২ ট্রিলিয়ন ডলার?
৩১ মে, ২০২৬ ১৪:৫৭  

বিশ্বের সর্ববৃহৎ আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব নিয়ে চলতি বছরই শেয়ার বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে পা রাখতে যাচ্ছে ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’। প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রাথমিক বাজারমূল্য বা ভ্যালুয়েশন নির্ধারণ করেছে প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি) মার্কিন ডলার। এই অঙ্কটি বিশ্বের অন্যান্য সব শীর্ষ প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ সংস্থার সম্মিলিত মূল্যের চেয়েও বেশি এবং বহুজাতিক জায়ান্ট অ্যামাজনের কাছাকাছি।

সাধারণ মানুষের চোখে স্পেসএক্স মানেই কেবল একের পর এক সফল রকেট উৎক্ষেপণ কিংবা লাইভ স্ট্রিম চলাকালীন বিশাল রকেট বিস্ফোরণ। তাহলে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—একটি রকেট কোম্পানির মূল্য কীভাবে পৌনে ২ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে? মূলত গত দুই দশকে স্পেসএক্স কেবল রকেট তৈরির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের এক বহুমুখী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে রূপান্তর করেছে। নিচে তাদের এই বিশাল সাম্রাজ্যের মূল আয়ের উৎসগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:

১. ফ্যালকন ৯ ও ফ্যালকন হেভি: মহাকাশের ‘ওয়ার্কহর্স’
বিগত ১৬ বছর ধরে মার্কিন মহাকাশ শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি স্পেসএক্স-এর ‘ফ্যালকন ৯’ রকেট। ইতিমধ্যেই এটি ৬০০-র বেশি বার মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে, ডজনখানেক নভোচারীকে মহাকাশ স্টেশনে পাঠিয়েছে এবং অসংখ্য সামরিক উপগ্রহ কক্ষপথে স্থাপন করেছে।

রকেটের বুস্টার সফলভাবে ভূপৃষ্ঠে ফিরিয়ে এনে তা বারবার ব্যবহার করার প্রযুক্তিকে স্পেসএক্স এক প্রকার নিখুঁত স্তরে নিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ সালে রকেট লঞ্চের মাধ্যমে কোম্পানিটি প্রায় ৫০০ কোটি ডলার রাজস্ব আয় করেছিল। তবে বর্তমানে তাদের সিংহভাগ ফ্যালকন-৯ উৎক্ষেপণই নিজস্ব ইন্টারনেট স্যাটেলাইট ‘স্টারলিংক’-এর জন্য করা হয়, যা মূলত উৎপাদন খরচে সম্পন্ন হয়।

২. স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট: টাকার খনি
স্পেসএক্স-এর এই পৌনে ২ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় এবং আসল কারণ হলো তাদের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ‘স্টারলিংক’। এটি মূলত স্পেসএক্স-এর জন্য টাকা ছাপানোর মেশিনের মতো কাজ করছে।

একটি হিসেব অনুযায়ী, ২০১৫ সালেই স্টারলিংক প্রায় ১,২৮০ কোটি (১২.৮ বিলিয়ন) ডলার রাজস্ব আয় করেছে এবং বিশ্বজুড়ে এর গ্রাহক সংখ্যা ৮৪ লাখ ছাড়িয়েছে। পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা ইতিহাসের বৃহত্তম এই স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন বা উপগ্রহের ঝাঁক স্পেসএক্স-কে একটি সাধারণ মহাকাশ সংস্থা থেকে ঘরে ঘরে পরিচিত বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে। এই স্টারলিংকের বিপুল আয় থেকেই এলন মাস্ক তার পরবর্তী স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘স্টারশিপ’-এর গবেষণার খরচ জোগাচ্ছেন।

৩. স্টারশিপ প্রজেক্ট: মঙ্গল গ্রহের স্বপ্ন ও ওয়াল স্ট্রিটের ভয়
পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট ‘স্টারশিপ’ তৈরির জন্য টেক্সাসের স্টারবেসে ইতিমধ্যেই স্পেসএক্স প্রায় ১,৫০০ কোটি (১৫ বিলিয়ন) ডলার খরচ করেছে। নাসার চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি বানানো এবং মাস্কের মঙ্গল গ্রহে মানববসতি স্থাপনের স্বপ্ন পুরোপুরি এই স্টারশিপের ওপর নির্ভরশীল।

তবে শেয়ার বাজারের স্বল্পমেয়াদি মুনাফাখোর বিনিয়োগকারীদের জন্য স্টারশিপের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণগুলো বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এর আগে রকেট ল্যাব বা অ্যাস্ট্রার মতো পাবলিক কোম্পানির রকেট ব্যর্থ হলে শেয়ার বাজারে ধস নামতে দেখা গেছে। ওয়াল স্ট্রিটের এই নেতিবাচক মানসিকতার কারণেই এলন মাস্ক এতদিন স্পেসএক্স-কে শেয়ার বাজারে আনতে চাননি। তবে স্টারলিংক সংস্করণ-৩ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য স্টারশিপের সফল কক্ষপথ যাত্রা এখন অত্যন্ত জরুরি।

৪. স্টারশিল্ড: পেন্টাগনের নিরাপদ পার্টনার
সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তৈরি স্টারলিংকের বিশেষায়িত সংস্করণ হলো ‘স্টারশিল্ড’। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগনের বিভিন্ন গোপন নজরদারি ও যোগাযোগ স্যাটেলাইট তৈরির কাজ করে এই বিভাগ।

স্পেসএক্স-এর প্রতিদিন হাজার হাজার স্যাটেলাইট তৈরি করার সক্ষমতা রয়েছে, আর মার্কিন সামরিক বাহিনীর রয়েছে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিয়ে তা কিনে নেওয়ার ক্ষমতা। ফলে এটি স্পেসএক্স-এর মূল ব্যবসা না হলেও, পেন্টাগনের শত কোটি ডলারের চুক্তিগুলো কোম্পানির জন্য দারুণ এক বাড়তি আয়ের উৎস।

৫. এক্সএআই সংযোজন: স্পেসএক্স এখন একটি ‘এআই’ কোম্পানি!
স্পেসএক্স সাম্রাজ্যের সবচেয়ে রহস্যময় এবং চমকপ্রদ অংশ হলো এলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানি ‘এক্সএআই’-কে এর সাথে একীভূত করা, যা মূলত 'গ্রক' চ্যাটবট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স'-এর নিয়ন্ত্রক।

মহাকাশ কোম্পানির সাথে এআই-এর কী সম্পর্ক? ইলন মাস্কের ব্যাখ্যা অনুযায়ী—ভবিষ্যতের ‘অরবিটাল ডাটা সেন্টার’ বা মহাকাশ-ভিত্তিক ডাটা সেন্টারই হবে স্পেসএক্স-এর আইপিও-র মূল ভিত্তি। বর্তমানে পৃথিবীতে বিশাল বিশাল এআই ডাটা সেন্টারগুলোর মাত্রাতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও কার্বন নিঃসরণের কারণে বিভিন্ন দেশে এগুলো নিষিদ্ধ করার আইন হচ্ছে। মাস্কের পরিকল্পনা হলো—মহাকাশে শত শত স্যাটেলাইটে গ্রাফিক্স কার্ড ও প্রসেসর বসিয়ে সরাসরি সূর্যের আলো বা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পৃথিবীর এআই চ্যাটবটগুলো পরিচালনা করা। এতে পৃথিবীর কার্বন ফুটপ্রিন্ট যেমন কমবে, তেমনি মহাকাশ থেকেই অন্যান্য স্যাটেলাইটের ডেটা প্রসেসিং করা যাবে।

এআই প্রযুক্তির এই জোয়ারে বর্তমানে যেকোনো কোম্পানিতে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ ট্যাগ থাকলেই বিনিয়োগকারীরা কোটি কোটি ডলার ঢালতে প্রস্তুত থাকেন। এলন মাস্কও সেই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাননি। এআই-এর ভবিষ্যৎ বাজার এবং স্টারলিংকের বর্তমান সাম্রাজ্য—সব মিলিয়ে স্পেসএক্স যখন শেয়ার বাজারে আসবে, তখন এটিই যে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং কাঙ্ক্ষিত স্টকে পরিণত হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

ডিবিটেক/বিএমটি   ।   সূত্র: স্পেসএক্সপ্লোরড