ডিজিটাল পাহাড়ায় এসএসসি-তে নকল কমলো ৭৮ শতাংশ

ডিজিটাল পাহাড়ায় এসএসসি-তে নকল কমলো ৭৮ শতাংশ
৩১ মে, ২০২৬ ১৬:২৩  

দুই দশক আগে দেশের শিক্ষাঙ্গন থেকে নকল দূর করতে তৎকালীন শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের হেলিকপ্টার নিয়ে ঝটিকা অভিযান ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ২০ বছর পর তিনি এখন সরকারের পূর্ণ শিক্ষামন্ত্রী। তবে সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে অপরাধের ধরন এবং তা দমনের কৌশলও। এবার আর হেলিকপ্টার নিয়ে মাঠে নামতে হয়নি তাকে।

সিসিটিভি আর পরীক্ষার হল লাইভ স্ট্রিমিয়ে রেখে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার এবং হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইল স্ক্রিনকে কাজে লাগিয়ে দেশের ৩ হাজার ৮৮৫টি পরীক্ষাকেন্দ্রে নজিরবিহীন ডিজিটাল নজরদারি চালানো হয়েছে।

প্রযুক্তির এই সর্বোচ্চ ব্যবহারের ফলে গত মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অসদুপায় বা নকলের হার রেকর্ড ৭৮ শতাংশ কমে এসেছে।

সূত্রমতে,  প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রের সিসিটিভি ক্যামেরার লাইভ স্ট্রিমিং ও পাসওয়ার্ড সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সাথে যুক্ত ছিল, যা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ডিজিটাল এই কড়া নজরদারির সুফল মিলেছে মাঠপর্যায়ে, যার প্রমাণ দেয় আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয়ক কমিটির দাপ্তরিক পরিসংখ্যান।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিগত কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় রেকর্ড ১,১৫৫ জন পরীক্ষার্থী অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কৃত হয়েছিল। করোনা মহামারির কারণে পরবর্তী দুই বছর সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় এই সংখ্যা ওঠানামা করে।

তবে ২০২৩ সালে পরীক্ষা পুরোপুরি স্বাভাবিক নিয়মে ফিরলে বহিষ্কারের সংখ্যা আবারও এক লাফে বেড়ে ৭৯৬ জনে দাঁড়ায়। এরপর ২০২৪ সালে ৭৪৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৭২১ জন পরীক্ষার্থী নকলের দায়ে শাস্তি পায়। কিন্তু চলতি ২০২৬ সালের পরীক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক এই সমন্বিত ডিজিটাল কড়াকড়ির ফলে বহিষ্কারের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে নেমে এসেছে মাত্র ২০৮ জনে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বপ্রস্তুতি ছিল। পরীক্ষা শুরুর আগের দুই মাস ধরে সারা দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত কর্মকর্তা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সাথে সমন্বয় সভা করা হয়। প্রযুক্তিগতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং কেন্দ্রের অভ্যন্তরে মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে কাজ করেছে বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রথাগত অভিযানের চেয়ে প্রযুক্তির এই অদৃশ্য ও নিখুঁত নজরদারি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে ভীতিহীন ও সম্পূর্ণ নকলমুক্ত পরিবেশে মেধা যাচাইয়ের এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে দেশের শিক্ষাঙ্গনে, যা আগামী দিনের পরীক্ষা পদ্ধতিকে আরও স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের করে তুলবে।

প্রসঙ্গত, গত ২১ এপ্রিল সারা দেশে একযোগে শুরু হওয়া পাবলিক পরীক্ষায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এবারের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের শারীরিক বা দৃশ্যমান অভিযান ছাড়াই শতভাগ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে।
/ডিবিটেক/এসএম/ইকে/