‘সুপার অ্যাপ’ হওয়ার দৌড়ে টিকটক

‘সুপার অ্যাপ’ হওয়ার দৌড়ে টিকটক
১ জুন, ২০২৬ ১৪:২৭  

বিশ্বজুড়ে টিকটক মূলত একটি শর্ট-ভিডিও এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত হলেও, প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে এই গণ্ডি পেরিয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে। শুধু ভিডিও দেখার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আটকে না থেকে টিকটক ইতিমধ্যেই এর সাথে যুক্ত করেছে ‘টিকটক শপ’ (ই-কমার্স), গেম, উন্নত সার্চ ইঞ্জিন এবং লোকাল ডিসকভারি ম্যাপ। আর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সরাসরি হোটেল বুকিং সুবিধা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং বা ফিনটেক লাইসেন্স।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, টিকটক আসলে চীনের উইচ্যাটের আদলে একটি বৈশ্বিক ‘সুপার অ্যাপ’ হওয়ার পথে হাঁটছে—যেখানে একজন ব্যবহারকারী একই অ্যাপের ভেতর চ্যাটিং, বিনোদন, কেনাকাটা থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেনের সব সুবিধা পেয়ে যাবেন। উল্লেখ্য, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে টিকটক মূলত মার্কিন মালিকানায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকে এই রূপান্তরের গতি আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।

‘টিকটক গো’: গুগলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ
চলতি মে মাসে টিকটক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে ‘টিকটক গো’ নামের একটি বিশেষ ফিচার। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কোনো ট্রাভেল ভিডিও দেখে পছন্দ হলে, অন্য কোনো থার্ড-পার্টি ওয়েবসাইটে না গিয়ে সরাসরি টিকটক অ্যাপের ভেতর থেকেই হোটেল, দর্শনীয় স্থান বা ট্যুরিস্ট এক্সপেরিয়েন্স বুকিং করতে পারবেন।

ভিডিওতে কোনো রেস্টুরেন্ট বা হোটেলের রিভিউ দেখার পর তার সঠিক অবস্থান বা স্টার রেটিং জানার জন্য আগে ব্যবহারকারীদের গুগল সার্চ বা গুগল ম্যাপের দ্বারস্থ হতে হতো। কিন্তু টিকটক এখন অ্যাপের ভেতরেই রেস্টুরেন্টের খোলা থাকার সময়, প্রাইস রেঞ্জ এবং ম্যাপ যুক্ত করে দেওয়ায় গুগলের মূল ব্যবসা সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে।

ফিনটেক ও ঋণদান ব্যবসায় টিকটক
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, টিকটক সম্প্রতি ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি বা ফিনটেক কোম্পানি হিসেবে ব্যবসা করার জন্য আবেদন করেছে। তারা মূলত দুটি লাইসেন্স চেয়েছে:

    প্রথম লাইসেন্স: এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা টিকটক অ্যাপের ভেতরেই একটি প্রিপেইড অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা জমা রাখতে, লেনদেন করতে এবং যেকোনো পেমেন্ট করতে পারবেন।

    দ্বিতীয় লাইসেন্স: এটি টিকটককে সরাসরি ‘ক্রেডিট প্রোভাইডার’ বা ঋণদাতার ক্ষমতা দেবে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের তহবিল থেকে ব্যবহারকারীদের ঋণ দিতে পারবে।

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে টিকটক প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ফিনটেক স্টার্টআপগুলোর মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

অ্যামাজন ও শিনকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে ‘টিকটক শপ’
২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া ‘টিকটক শপ’ ২০২৩ সালে মার্কিন বাজারে আসার পর থেকে ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন এবং শিনের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ই-মার্কেটারের ডেটা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে টিকটক শপের বিক্রি বাড়ে ৪০৭ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে আরও ১০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে তা ১৫.৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়।

বর্তমানে আমেরিকার মোট সোশ্যাল কমার্স বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভিত্তিক কেনাকাটার ১৮.২ শতাংশই টিকটকের দখলে, যা ২০২৭ সালের মধ্যে ২৪.১ শতাংশে উন্নীত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি টিকটক সস্তা পণ্যের খোলস ছেড়ে ‘লাক্সারি রিটেল’ বা দামি ব্র্যান্ডের পণ্যের বাজারেও প্রবেশ করেছে।

বিনোদন জগতে ওলটপালট: মাইক্রোড্রামা ও গেমস
সাধারণ ব্যবহারকারীদের তৈরি ভিডিওর পাশাপাশি টিকটক এখন পেশাদার বিনোদন জগতেও পা রেখেছে। তারা অ্যাপের ভেতরে চালু করেছে ‘মিনইস’ সেকশন এবং এক মিনিটের পর্বের ছোট ছোট ধারাবাহিক নাটকের জন্য একটি ডেডিকেটেড অ্যাপ, যা নেটফ্লিক্সের মতো ওটিটি জায়ান্টদের মনোযোগ কাড়ার লড়াইয়ে নেমেছে। এছাড়া মেসেজ বক্সে বন্ধুদের সাথে খেলার জন্য তারা যুক্ত করেছে একগুচ্ছ ক্যাজুয়াল গেম, যা ব্যবহারকারীদের অ্যাপের ভেতরে থাকার সময়কে দীর্ঘায়িত করছে।

সঙ্গীত নিয়ে নতুন কৌশল:
২০২৩ সালে স্পটিফাই ও অ্যাপল মিউজিককে টেক্কা দিতে ‘টিকটক মিউজিক’ চালু করলেও এক বছরের মাথায় তা বন্ধ করে দেয় টিকটক। তবে তারা সঙ্গীত জগৎ থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি। সম্প্রতি তারা এমন একটি ফিচার এনেছে যার মাধ্যমে ‘ফর ইউ’ ফিডে কোনো গান পছন্দ হলে অ্যাপল মিউজিক সাবস্ক্রাইবাররা সরাসরি টিকটক অ্যাপের ভেতরেই পুরো গানটি শুনতে পারবেন।

সব মিলিয়ে, চীন বা এশিয়ার বাইরে একটি সর্বগ্রাসী ‘সুপার অ্যাপ’ মডেল পশ্চিমা বিশ্বে সফল হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও টিকটক যে সেই লক্ষ্য অর্জনে তাদের ট্রিলিয়ন ডলারের জুয়া খেলতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তা স্পষ্ট।

ডিবিটেক/বিএমটি   ।   সূত্র: টেকক্রাঞ্চ