স্বপ্ন সাইবার সুরক্ষায় বিনিয়োগ না করায় ৪০ লক্ষ মানুষের ডেটা আজ ডার্ক ওয়েভে বেচাবিক্রি হতে যাচ্ছে। এগুলা মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ফোন নং, ঠিকানা, ই-মেইল ইত্যাদি গোপনীয় এবং সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য। যা দিয়ে ব্যক্তির নামে সাইবার অপরাধ, ফাইনান্সিয়াল স্ক্যাম এবং এসেট ট্রান্সফারের মতো অপরাধ ঘটবে। ভূয়া আইডি কার্ড বানাবে। স্বপ্নের মতো কোম্পানিগুলো সাইবার অপারেশন সেন্টারে, হার্ডওয়ার ও সফটওয়ার সিকিউরিটি, ফায়ারওয়াল সহ বিভিন্ন সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করেনি। মানহীন সফটওয়ারে বাল্ক এমাউন্টে ব্যক্তিগত উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপণন করেছে। অথচ উপাত্তদের পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে তারা ব্যক্তি নাগরিকের সম্মতি নেয়নি। ডেটা সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেনি। এর আগে পাঠাও ডেটা বিক্রি করেছে।
আমাদের এনআইডি ডেটা, নিবন্ধন ডেটাও লিকের অকাট্য প্রমাণ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক সংস্থা।
কথা ছিল বাল্ক পরিমাণে ব্যক্তিগত গোপনীয় এবং সংবেদনশীল ব্যক্তিগত উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফাস্ট্রাকচার হবে (সিআইআই) এবং তাদেরকে সাইবার সুরক্ষা আইনে বর্ণিত সাইবার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে, শিশুদের ডেটা প্রোফাইলিং ব্যাবসা করে প্ল্যাটফর্মগুলো, বিশ্বের একাধিক দেশে তারা বেআইনি কাজ করে, অপরাধ করে, উচ্চ জরিমানা দিয়েছে এবং দিচ্ছে। ২০২২ সালে আয়ারল্যান্ড, এর পরে ফ্রান্সে, গত বছর অস্ট্রেলিয়ায়, কয়েকদিন আগে নিউ মেক্সিকোতে। ২২৫, ৩০০, ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার এই স্কেলে জরিমানা দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে তারা আইন কানুনের উর্ধ্বে। শীর্ষ মিডিয়া ও তথাকথিত সিভিল সোসাইটির একাংশ তাদের প্রটেক্টও করছে।
আমরা যখন ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন করেছি, আমাদের বিরুদ্ধে দেশের বড়ো বড়ো ডেটা চোর গুলা উঠেপড়ে লেগেছে। শীর্ষ পত্রিকায় ডাহা মিথ্যা দিয়ে ভরা প্রোপাগান্ডা আর্টিকেল ও নিউজ করেছে। ইউএসবিবিসি নামে এক ভুঁইউফোড় দালাল সংগঠন এই দুর্বৃত্তচক্রকে ফান্ডিং করে, এনকারেজ করে, ওর্গাইনাইজ করে। এই চক্রে আছে সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও প্ল্যাটফর্ম। ডেটা চোর কোম্পানি গুলা বাল্কে ডেটা বিক্রি আড়াল করতে টাকা ঢালছে। অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ে এদের সোর্স ও এজেন্ট আছে। কোম্পানি ও ব্যবসায়ীরা পার্সোনালি আইডেন্টিফায়েবল ইনফরমেশনের বাল্ক ডেটা ব্রেচ, ক্রিটিক্যাল সাইবার হ্যাকিং, র্যান্সম এটাক লুকাচ্ছে। প্ল্যাটফর্ম গুলা সরকারের রাজস্ব চুরি করতে, এড-সেন্স/বিজ্ঞাপন এবং এআই মডেল/ডিজিটাল পণ্য থেকে আয় করতে, চাইল্ড কন্টেন্ট, জুয়া বেটিং গেমিং সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইন অমান্যের অবাধ সূযোগে ইভেন্ট ফান্ডিং, ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফান্ডিং, এআই ফান্ডিং ও রিসার্চের নামে টাকা ঢালছে। এ যেন এক অচ্ছেদ্য চক্র।
অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের নিচে সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে বলেছে। বাংলাদেশে ১৮ বছরের নিচে অ্যাকাউন্ট করা বেআইনি। দুর্বৃত্তগুলা আইন না মেনে টাকা ঢালছে। তাদের কেউ কিছু বলার নাই যেন! অস্ট্রেলিয়াতে চাইল্ড ডেটা এবিউজে (এআই মডেল ট্রেনিং এ) হিউমান রাইটস গ্রুপ সোচ্চার ছিল, বাংলাদেশে যেন কারও কোন মাথাব্যাথা নাই। এই সিভিল সোসাইটি কী আমরা চেয়েছিলাম যারা ব্যক্তিগত উপাত্তের মত কোর এন্ড ক্রিটিক্যাল ইস্যুতে চুপ থাকবে! রিসার্চ ফান্ডের নামে কিছু টাকা আর বড় প্ল্যাটফর্মের একটা ইভেন্ট ইনভাইটেশনের কাছে মাথা বিক্রির এক নিদারুণ প্রতিযোগিতায় নেমেছে তারা!
নতুন সরকার ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড, ফুয়েল কার্ড, হেলথ হার্ড সহ ওয়ান আইডি রোড ম্যাপ নিয়ে আন্তরিক। এটা সফল করতে সবার আগে দরকার ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫, ২০২৬ এর সংশোধন, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ কে সংসদে গ্রহণ করা। এবং বাস্তবায়নে অতিদ্রুত ন্যাশনাল ডেটা গভর্নেন্স অথরিটি প্রতিষ্ঠা করা।
আপনাকে পার্সোনাল ডেটা এবং জেনারেল ডেটা- উভয়টায় গভর্নেন্স ও সাইবার সিকিউরিটি আনতে হবে। কীভাবে সম্মতির সাপেক্ষে, সার্ভিস নিড ও লাইফ সাইকেল বেজড ডেটা কালেক্ট হচ্ছে, স্টোর ও প্রসেসড হচ্ছে, ব্যাড-এক্টরের হাতে তা যাচ্ছে, ব্রেচ ও লিক হচ্ছে কিনা এসবকিছুর জন্য গভর্নেন্স অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট লাগবে, তাই ডেটা অথরিটি গুরুত্বপূর্ণ।
ওভারসিং, কমপ্লায়েন্স এবং এনফোর্স্মেন্ট হলে চুরির সুযোগ কমে যাবে বিধায়, প্ল্যাটফর্ম কোম্পানি ব্যবসায়ী তিনপক্ষ মিলে ডেটা অথরিটির বিরোধীতায় নেমেছে।
আজকে বাংলাদেশের শিশুর ডেটা দিয়ে পডোফাইল গ্রুপ, পর্নো, এআই মডেল ট্রেন হচ্ছে, অবৈধ আয় করছে। অন্যদিকে দেশীয় কোম্পানি আপনার ব্যাংক তথ্য থেকে শুরু করে সেন্সিটিভ ঔষধের তথ্য, ডিজিএবিলিটির তথ্য, এমনকি কোন ব্রান্ডের কন্ডম ব্যবহার করছে সব তথ্য প্ল্যাটফর্ম ও মার্কেটিং ব্যাড-এক্টরদেরকে বিক্রি করে দিচ্ছে। কত বড়ো দুঃসাহস যে, ব্রেচের তথ্যও ৭ মাস লুকিয়ে রেখেছে।
সচেতন হোন, এরা ডিজিটাল ইকনোমির সব সম্ভাবনার গলা টিপে ধরে আছে। ডিজিটাল সভ্রেন্টি এদের কাছে জিম্মি। এরা সরকারকে জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তৈরিতে আগেও বাধা দিয়েছে, এখনও দিচ্ছে। এই মাফিয়া চক্র না থামাতে পারলে সরকার ভবিষ্যতে কোনও ডিজিটাল সেবা নিরাপদে দিতে পারবে না। এবং মানুষের ট্রাস্ট শতভাগ চলে যাবে। এমনিতেই ইওরেঞ্জ-ইভ্যালির মত আওয়ামী বাটপারদের ক্রমাগত জালিয়াতিতে ই-কমার্সের উপর আস্থা উঠে গিয়ে দেশের ডিজিটাল ইকনোমি, ফর্মাল ও গিগ কর্মসংস্থান হিমশিম খাচ্ছে।
দুর্বৃত্ত, ব্যবসায়ী, ভিতর ও বাইরের ব্যাড-এক্টর এবং প্ল্যাটফর্মের ডিমান্ডে আইনে যৌক্তিক ধারা সরিয়ে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন না। বরং শক্ত কমপ্লায়েন্স, ওভারসি এবং এনফোর্সমেন্টের দিকে হাঁটুন।
লেখকঃ প্রযুক্তিবিদ, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী