জনস্বাস্থ্যের হুমকি সোশ্যালমিডিয়া ট্যাবু


জনস্বাস্থ্যের হুমকি সোশ্যালমিডিয়া ট্যাবু
১৮ আগষ্ট, ২০২৫ ১১:৩৪  
৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১৯:১৭  

বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে আমরা যেমন একে অপরের সাথে যুক্ত থাকতে পারি, তেমনি বিভিন্ন তথ্য ও খবর আদান-প্রদানও করতে পারি। তবে এর একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায়শই স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন ভুয়া তথ্য, গুজব ও ভুল ধারণার প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ভুয়া তথ্যের সংকট
সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ভুয়া বা অপ-তথ্যের ব্যাপক প্রচলন জনস্বাস্থ্যের জন্য বেশ কয়েকটি সংকট তৈরি করেছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অপ চিকিৎসা। যখন মানুষ ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো অসুস্থতার জন্য স্ব-চিকিৎসা শুরু করে, তখন অজ্ঞতা ধোঁয়াশায় শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এই যেমন- কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, বিশেষ কোনো ভেষজ বা প্রাকৃতিক উপাদান ক্যান্সার নিরাময় করতে পারে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এই ধরনের তথ্যের ওপর বিশ্বাস করে অনেকে প্রচলিত চিকিৎসা গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, যার ফলে তাদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো চিকিৎসকদের প্রতি আস্থাহীনতা। যখন মানুষ দেখে যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা তথ্যের সাথে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেলে না, তখন তারা পেশাদার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের ওপর বিশ্বাস হারাতে শুরু করে। এটি এক ধরনের ভ্রান্তি-বিশ্বাস বা ইনফোডেমিক (অপতথ্যের মহামারি) তৈরি করে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অনেক সময় ভুয়া তথ্য প্রচারকারীরা বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে ভুল ও বিভ্রান্তিকর যুক্তি উপস্থাপন করে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংশয় সৃষ্টি করে।

এছাড়াও, ভুয়া স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বার্তাগুলো জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। কোনো মহামারীর সময় যেমন কোভিড-১৯ নিয়ে এই ধরনের গুজব আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। এসব সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও হতাশা সৃষ্টি করে।  কোভিড-১৯ এর সময় অনেক ভুয়া পোস্ট ছড়িয়েছিল। তখন দেখেছি করোনা চীনের বা আমেরিকার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র অথবা কিছু নির্দিষ্ট খাবার খেলে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়। এই ধরনের তথ্য সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পথে বাধা দেয়।

ব্যবহারকারী ও পাঠকদের করণীয়
এই সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিটি ব্যবহারকারী ও পাঠকের সচেতনতা। স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করা যেতে পারে। যেকোনো স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত পোস্ট বা খবর দেখার পর সেটি বিশ্বাস করার আগে অবশ্যই তার উৎস যাচাই করুন। দেখুন, তথ্যটি কোনো স্বীকৃত স্বাস্থ্য সংস্থা যেমন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা  বা নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা বা বিজ্ঞানবিষয় ম্যাগাজিন থেকে এসেছে কিনা। যদি কোনো অজানা বা সন্দেহজনক ওয়েবসাইট বা প্রোফাইল থেকে তথ্য আসে, তবে সেটিকে এড়িয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

মনে রাখবেন, ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, যা কোনো সাধারণ পোস্ট থেকে বোঝা সম্ভব নয়। যদি কোনো পোস্টে এমন দাবি করা হয় যে, একটিমাত্র ওষুধ বা পদ্ধতি যেকোনো রোগ নিরাময় করতে পারে, তবে সেটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই ভুয়া। চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোনো অলৌকিক সমাধান নেই। যদি আপনার কাছে কোনো স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বার্তা আসে এবং সেটি আপনার কাছে ভুয়া মনে হয়, তাহলে সেটি শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার একটি শেয়ার অন্য অনেকের কাছে ভুল তথ্য পৌঁছে দিতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্যের এই বিস্তার ঠেকাতে প্রতিটি সচেতন নাগরিকের ভূমিকা অপরিহার্য। নিজেদের সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি, সঠিক তথ্যের প্রচার করা এবং ভুল তথ্যকে চিহ্নিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কেননা,  বায়ুদূষণ, খাদ্যপণ্যে ভেজাল এবং রোগজীবাণুর সংক্রমণের চেয়েও এখন ছাকনিহীন সোশ্যাল হ্যান্ডেলে দ্রুত ছড়াচ্ছে এই অপতথ্যের দূষণ। 

লেখক: গবেষক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।