ইনোভেশন ফেয়ারে শীর্ষ ১০ প্রকল্প পেল এক লাখ টাকা
বাণিজ্যিক পণ্যে যাচ্ছে যে ১০ দেশীয় উদ্ভাবন
- বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
- সেরা উদ্ভাবন হোমপিটাল নেক্সাস
- ৭৩ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ৫০ প্রকল্পও পেল স্বীকৃতি
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশলভিত্তিক গবেষণাকে ল্যাবরেটরি থেকে বাস্তব বাণিজ্যিক পণ্য ও সেবায় রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে শেষ হয়েছে তিন দিনব্যাপী বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬। মেলায় বাছাই করা ৫০টি দেশীয় উদ্ভাবনের মধ্য থেকে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য শীর্ষ ১০ প্রকল্পকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে প্রায় ২০টি বিশেষ কারিগরি সভা, সেমিনার ও প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজনটি।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ও আর্থিক প্রণোদনার চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।
নাগরিক-শিল্প সমস্যার প্রযুক্তি সমাধান
বাণিজ্যিকীকরণের জন্য নির্বাচিত শীর্ষ ১০ উদ্ভাবনের প্রতিটিই নাগরিক জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শিল্প, পরিবেশ ও যোগাযোগের বাস্তব সমস্যাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি।
১. Homepital নেক্সাস
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে ঘরে পৌঁছে দিতে তৈরি করা হয়েছে রিমোট বায়োমেট্রিক ও টেলিমেডিসিন ডিভাইস নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে বাড়িতে থেকেই রোগীর বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হবে।
২. স্মার্ট হুইলচেয়ার
শারীরিক প্রতিবন্ধী ও নিউরোলজিক্যাল রোগীদের স্বাধীন চলাচলে সহায়তার জন্য তৈরি এই প্রযুক্তিতে মস্তিষ্কের সংকেত ও চোখের ইশারা ব্যবহার করে IoT নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা পরিচালনার ধারণা প্রয়োগ করা হয়েছে।
৩. টিম ফায়ারফ্লাই
আগুনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য তৈরি হয়েছে তাপ ও গ্যাস সেন্সরবাহী ইনফ্রারেড রোবট। স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশনের মাধ্যমে এটি বিপজ্জনক এলাকায় তথ্য সংগ্রহে ভূমিকা রাখতে পারবে।
৪. ভয়েস অ্যাসিস্ট ডিভাইস
দৃষ্টি ও বাকপ্রতিবন্ধীদের দৈনন্দিন কাজে সহায়তার জন্য তৈরি হয়েছে অফলাইন-সক্ষম AI ভাষা অনুবাদক গ্যাজেট। ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত থাকলেও ব্যবহারের উপযোগী করে প্রযুক্তিটি তৈরির লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
৫. বিডি সাইবার হেল্প
প্রান্তিক পর্যায়ে সাইবার হামলা ও অনলাইন হয়রানি দ্রুত শনাক্ত এবং প্রতিরোধে সমন্বিত automated portal হিসেবে তৈরি হয়েছে ‘বিডি সাইবার হেল্প’। স্থানীয় পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তা সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই এর অন্যতম লক্ষ্য।
৬. ওয়াটার রিপেলেন্ট জুট ফ্যাব্রিক
পাটের তন্তুকে আধুনিক টেক্সটাইল প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে তৈরি হয়েছে পানি প্রতিরোধক ন্যানো-প্রলেপযুক্ত টেকসই কাপড়। পরিবেশবান্ধব উপকরণকে উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে এ উদ্ভাবনে।
৭. ন্যাচারাল ফাইবারে PCB
পাট ও উদ্ভিজ্জ বায়ো-কম্পোজিট ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব Printed Circuit Board বা PCB তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ কমানো এর অন্যতম লক্ষ্য।
৮. এন্টেনা ফর ন্যানোসেট
ক্ষুদ্রাকৃতির ন্যানোস্যাটেলাইট থেকে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন ডেটা আদান-প্রদানের জন্য তৈরি হয়েছে উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির আধুনিক সিগন্যাল রিসিভার। মহাকাশ প্রযুক্তির স্থানীয় সক্ষমতা তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করছে।
৯. লিকুইড ট্রি
শহরের সীমিত জায়গায় কার্বন নিঃসরণ কমানো ও দ্রুত অক্সিজেন উৎপাদনের লক্ষ্যে ফটোরিঅ্যাক্টরভিত্তিক মাইক্রো-অ্যালগি প্রযুক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘লিকুইড ট্রি’। নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় এর প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
১০. সেল্ফ কন্টাক্টর
ভারী শিল্পকারখানার বৈদ্যুতিক সার্কিট সুরক্ষা ও শর্টসার্কিট হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে তৈরি হয়েছে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন স্মার্ট সুইচ ‘সেল্ফ কন্টাক্টর’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনেও সাফল্য
মেলায় শিল্প ও শিক্ষা—এই দুই প্রধান ক্যাটাগরিতে উদ্ভাবনী উৎকর্ষের মূল্যায়ন করা হয়। দেশের ৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক উদ্ভাবনী প্রদর্শনীর মধ্য থেকে নির্বাচিত সেরা ৫০টি প্রকল্পকে ১০ হাজার টাকা করে স্বীকৃতির চেক দেওয়া হয়।
শিক্ষা ও গবেষণায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রদর্শনীতে সেরাদের সেরা হয়েছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর রয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি)।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদর্শনীতে ছিল climate-resilient smart agritech ও স্বয়ংক্রিয় বালাই দমন সমাধান। যবিপ্রবি প্রদর্শন করেছে biomedical diagnostic kit ও cleantech প্রক্রিয়া। বিইউবিটির উদ্ভাবনের মধ্যে ছিল AI-চালিত ট্রাফিক ও industrial automation system।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানগ্রোভ ecosystem monitoring sensor এবং এআইইউবি robotic ও embedded IoT architecture প্রদর্শন করে।
গবেষণা থেকে বাণিজ্যিকীকরণ
মেলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল গবেষণা ও প্রোটোটাইপকে বাজারযোগ্য পণ্য ও সেবায় রূপান্তরের পথ তৈরি করা। সেই ধারাবাহিকতায় শীর্ষ ১০ প্রকল্পকে দেওয়া এক লাখ টাকা করে প্রণোদনা মূলত তাদের prototype উন্নয়ন, productisation এবং বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতিতে সহায়তা করবে।
সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা জানান, এসব উদ্ভাবনের পেটেন্ট সুরক্ষা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে সরকারি নীতি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারের এই উদ্যোগে তাই শুধু প্রদর্শনী নয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে প্রোটোটাইপ থেকে বাণিজ্যিক পণ্য তৈরির একটি সম্ভাব্য সেতু তৈরি হয়েছে।
//ডিবিটেক/ আশিকুর রহমান/এমআইএসটি/আইএইচ//





