এআই ট্রাফিক সিগন্যাল ফাঁকির চালবাজি, নম্বরপ্লেট ঢাকা সেই বাইকার গ্রেফতার
ঢাকার সড়কে এআই ক্যামেরা ফাঁকি দিতে মোটরবাইকের নম্বরপ্লেট স্কচটেপ দিয়ে ঢাকা চালক লাভলু হককে গ্রেফতার করেছে ডিএমপি। আদালত তাকে ১ মাসের কারাদণ্ড ও ২ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
রাজধানীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার নজরদারি ফাঁকি দিতে মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট ঢেকে চলাচল করা সেই যুবকের শেষ রক্ষা হলো না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ভাইরাল হওয়া ও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর দীর্ঘ কারিগরি অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযুক্ত মোটরসাইকেল চালককে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পরে বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালতে তিনি নিজের দোষ স্বীকার করলে তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও দুই হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
২ জুন, মঙ্গলবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান।
ডিএমপির এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, গত ১৯ মে দুপুর আড়াইটার দিকে তেজগাঁও থানার কাওরান বাজার ক্রসিং এলাকায় মো. লাবলু হক (৩৮) নামের এক মোটরসাইকেল চালক তাঁর নম্বরপ্লেটের শেষ তিনটি সংখ্যা সাদা স্কচটেপ দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ঢেকে রাজধানীর সড়কে চলাচল করেন। আংশিক ঢাকা নম্বরপ্লেটের সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গত ২১ মে বিষয়টি ডিএমপির নজরে আসে এবং এ নিয়ে পুলিশের উচ্চমহলে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ, এআই প্রযুক্তির ক্যামেরাকে ফাঁকি দেওয়ার এই অভিনব ও প্রতারণামূলক কৌশল যদি সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, তবে অন্য চালকেরাও তা অনুসরণ করতে পারেন। ছবিতে চালকের মুখ স্পষ্ট দেখা না যাওয়ায় তদন্তকারীদের জন্য এই অপরাধী শনাক্তের কাজটি ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। পরবর্তীতে ডিএমপির সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড Аналиসিস বিভাগ এবং সিটিটিসির (CTTC) সহায়তায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, মোটরসাইকেলের ধরন ও আংশিক দৃশ্যমান নম্বরপ্লেটের ডেটা মেলানোর দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পর গতকাল লালবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. লাবলু হককে গ্রেফতার করা হয়। পরে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৭২ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে এই শাস্তি প্রদান করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমরা উন্নত বিশ্বের মতো একটি স্বয়ংক্রিয় ও শৃঙ্খলাপূর্ণ ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু কেউ যদি আধুনিক প্রযুক্তি ফাঁকি দেওয়ার অপচেষ্টা করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, এআই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে পুলিশকে নিখুঁত সহায়তা করলেও নম্বরপ্লেট বিকৃত বা আড়াল করা হলে সিস্টেমে জটিলতা তৈরি হয়। এই অপরাধ রুখতে দ্রুতই সড়কে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এখন থেকে যেসব যানবাহনের নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট, ভাঙা, বিকৃত কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে আংশিক ঢেকে রাখা হবে, সেসব ক্ষেত্রে শুধু নম্বরপ্লেটসংক্রান্ত মামলাই নয়, বরং চালক ও মালিক—উভয়ের বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সাথে ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ পদ্ধতিতে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পয়েন্ট কাটার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী বড় অঙ্কের জরিমানা করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনারের পক্ষে নগরবাসীর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানানো হয়, নতুন এই এআই ট্রাফিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছেন। পুলিশ যেখানে ধারণা করেছিল সড়কে এই আমূল পরিবর্তন আনতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে, সেখানে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই ঢাকার সড়কে দৃশ্যমান ইতিবাচক শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। এমনকি সদ্য শেষ হওয়া ঈদের ছুটিতে সড়কে যানবাহন কম থাকলেও সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাল বাতি দেখে ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলতে দেখা গেছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নাগরিকদের সঙ্গে সর্বোচ্চ পেশাদার ও ভদ্র আচরণ করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাফিক প্রধান স্মরণ করিয়ে দেন, মামলা বা শাস্তি দেওয়া ডিএমপির মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং মানুষকে সচেতন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে প্রযুক্তি ও আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেউ স্বৈরাচারী আচরণ করলে পুলিশ সেখানে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিএমপির বিভিন্ন পদমর্যাদার উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
/ডিবিটেক/ জেএনও / এমইউআইএম/



