জুয়া বন্ধের আড়ালে এক নিবর্তনমূলক আইনের খসড়া!
প্রস্তাবিত 'বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬'-এর খসড়া উপরে-উপরে দেড়শ বছরের পুরোনো এক ঔপনিবেশিক আইনের আধুনিকায়ন। কিন্তু ধারা ধরে ধরে পড়লে বেরিয়ে আসে অন্য এক চিত্র—বাতিল হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভূত ফিরে এসেছে নতুন মোড়কে, আরও বিস্তৃত ক্ষমতা নিয়ে।
অনলাইন জুয়া বন্ধ করতে চায় না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বাজি আর জুয়ার অ্যাপ আজ তরুণদের সর্বনাশ করছে, পরিবার ভাঙছে, দেশের টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে সীমান্তের ওপারে। ১৮৬৭ সালের সেই Public Gambling Act দিয়ে এই ডিজিটাল যুগের অপরাধ সামলানো অসম্ভব—সে আইন বাতিল হওয়াই উচিত। তাই 'বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬'-এর খসড়া দেখে প্রথমে স্বস্তিই লাগে। মনে হয়, রাষ্ট্র অবশেষে একটি জরুরি কাজে হাত দিয়েছে।
কিন্তু খসড়াটি যদি প্রস্তাবনা থেকে শেষ ধারা পর্যন্ত মন দিয়ে পড়া হয়, স্বস্তির জায়গায় আসে উদ্বেগ। কারণ এটি আদতে যতটা না জুয়াবিরোধী আইন, তার চেয়ে অনেক বেশি একটি নজরদারি ও দমননির্ভর কাঠামো—আর জুয়া এখানে উপলক্ষমাত্র।
প্রথম প্রশ্নটিই এর আসল উদ্দেশ্য ফাঁস করে দেয়: অনলাইন জুয়া তো এ দেশে এখনই অপরাধ। এই অন্তর্বর্তী সরকারই গত বছর মে মাসে যে সংস্কারমূলক 'সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫' জারি করেছে (যা এ বছর সংসদে পাশ হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ এ পরিণত হয়েছে), তার ২০ ধারাতেই অনলাইন জুয়া তৈরি, পরিচালনা, অংশগ্রহণ ও প্রচার—সবই শাস্তিযোগ্য: সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা। আর গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, অপরাধটি জামিনযোগ্য—ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর ইচ্ছাকৃতভাবেই শাস্তি কমিয়ে, জামিনের পথ খোলা রাখা হয়েছিল। তাহলে যে আচরণ ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ, তার জন্য আবার আস্ত একটি নতুন আইন কেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে নতুন আইন যা যা যোগ করছে তার মধ্যে—জুয়ার নিষেধাজ্ঞায় নয়, সরকারি বাহিনীর ক্ষমতায়।
আমরা এ পথ আগেও দেখেছি। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) কীভাবে সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, এমনকি সাধারণ নাগরিককে স্রেফ ফেসবুক পোস্টের জন্য জেলে পুরেছিল, তা ভুলে যাওয়ার মতো সময় এখনো হয়নি। ওই আইনের অজামিনযোগ্য ধারাগুলোই হয়ে উঠেছিল হয়রানির প্রধান হাতিয়ার। পরে একে রদ করে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ করা হয়, যা ছিল নতুন বোতলে পুরোনো মদ। জুলাই অভ্যূত্থানের পত অন্তর্বর্তী সরকার তার উত্তরসূরি সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ বাতিল করে, বিতর্কিত নয়টি ধারা তুলে দেয়, বাকস্বাধীনতাসংক্রান্ত ‘অপরাধ’কে কেবল তখনই অপরাধ বলে গণ্য করে যখন তারা সহিংসতার উদ্রেগ করে নতুবা নয়, সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছরে নামিয়ে আনে এবং নানান আইনী সেফগার্ড স্থাপন করে। এ ছাড়াও আগের দুই আইনে করা মামলাগুলো বাতিল করে। গতিমুখটা ছিল স্পষ্ট: কম জবরদস্তি, বেশি সুরক্ষা। অথচ এই জুয়াবিরোধী খসড়া ছুটছে ঠিক উল্টো দিকে।
উদ্বেগের কেন্দ্রে আছে খসড়ায় প্রস্তাবিত নজরদারি-অবকাঠামো। ৪৩ ধারায় গঠিত হচ্ছে এক 'জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট'—যেখানে সরকার ব্যক্তির নাম, এনআইডি, সিম, এমএফএস ও ব্যাংক হিসাব, ওয়ালেট, ডিভাইস, ডোমেইন ও আইপি ঠিকানা পর্যন্ত তালিকাভুক্ত করতে পারবে। কে তালিকায় উঠবে, কীভাবে নামবে, ভুল হলে প্রতিকার কী—কিছুই বলা নেই। নেই নোটিশ, নেই আপিল, নেই মেয়াদ, নেই স্বাধীন তদারকি। অর্থাৎ এক স্থায়ী কালো তালিকা, যার পরিণতিতে কেউ আর্থিক ও ডিজিটালভাবে কার্যত একঘরে হয়ে যেতে পারেন।
৪৪ ধারা আরও এক ধাপ এগিয়ে এনআইডি-সিম-এমএফএস একসূত্রে গেঁথে ফেলার ব্যবস্থা করছে, আর সেই সঙ্গে অনুমোদন দিচ্ছে 'ফেসিয়াল রিকগনিশন' ও বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের। অর্থাৎ নাগরিকের পরিচয়, ফোন ও টাকা—সব এক জায়গায় বেঁধে, নির্বাহী আদেশে মুখ-শনাক্তকরণ প্রযুক্তি চালু করা—জুয়ার অজুহাতে এক ব্যাপক পরিচয়-নজরদারি। আর ৪৭ ধারা সরকারকে দিচ্ছে 'ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন' (ডিপিআই) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা। ডিপিআই এমন প্রযুক্তি, যা ইন্টারনেট ট্রাফিকের ভেতরের বিষয়বস্তু পড়ে ফেলে—এ কার্যত গণ-আড়িপাতা। কোনো ওয়ারেন্ট নেই, কোনো তদারকি নেই, কেবল একটি প্রজ্ঞাপনেই তা চালু করা যাবে।
আর এর কোনোটিতেই সংসদে পাশ হওয়া 'ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬'-এর নাম পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি। বরং খসড়ার ৩ ধারায় বলা হয়েছে, অন্য যেকোনো আইনে যা-ই থাকুক, এই আইনই প্রাধান্য পাবে। অর্থাৎ যে উপাত্ত-সুরক্ষা আইন এই নজরদারিকে লাগাম পরাতে পারত, এই খসড়া তাকেই ডিঙিয়ে যাবে। শিয়ালকে দিয়েই মুরগির খোঁয়াড়ের নিয়ম লেখানো।
এই ক্ষমতা কারা প্রয়োগ করবেন, আর কীভাবে—সেটিই সবচেয়ে ভয়ের। ৩৯ ধারা ফৌজদারি কার্যবিধিকে পাশ কাটিয়ে 'যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাসের' ভিত্তিতে বাড়ি, অফিস, সার্ভার—যেকোনো জায়গায় ওয়ারেন্ট ছাড়াই প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের অনুমতি দিচ্ছে। আর যাদের এই ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, সেই তালিকায় কেবল পুলিশ বা সিআইডি নয়—আছে এনএসআই, ডিজিএফআইয়ের মতো গোয়েন্দা সংস্থাও। একটি অস্পষ্ট, বিস্তৃত অপরাধের তালিকার ওপর গোয়েন্দা সংস্থাকে তল্লাশি ও তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার অর্থ কী, তা বোঝা কঠিন নয়। তার ওপর ৩৭ ধারা বলছে, এই আইনের সব অপরাধই আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপসঅযোগ্য—এমনকি যিনি নিছক টাকার বিনিময়ে তাস খেলছেন, তিনিও। আর ৩৬ ধারা এসব অপরাধের বিচার তুলে দিচ্ছে মোবাইল কোর্টের হাতে, যার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট-নির্ভর কাঠামোকে উচ্চ আদালত সংবিধানবিরোধী বলেছিল।
সব মিলিয়ে দাঁড়ায়: সন্দেহের বশে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা আপনার বাড়িতে ঢুকে ফোন আর ব্যাংকের তথ্য জব্দ করতে পারবেন, আর আপনি জামিনও পাবেন না। জুয়া ঠেকানোর কথা বলা একটি আইনের জন্য এ এক অসাধারণ জবরদস্তির যন্ত্র—আর ইতিহাস বলছে, এমন যন্ত্র শেষমেশ কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়: সমালোচক, সাংবাদিক, ভিন্নমতের মানুষ।
শাস্তির মাত্রাও বেমানান। যে অনলাইন জুয়ার জন্য বিদ্যমান সাইবার আইনে শাস্তি দুই বছর, এই খসড়ায় তা সাত থেকে বারো বছর, জরিমানা দশ কোটি টাকা পর্যন্ত—একই অপরাধে পাঁচ-ছয় গুণ ভারী দণ্ড। অথচ সিঙ্গাপুর বা যুক্তরাজ্য জুয়াকে লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনে, খেলোয়াড়কে জেলে পোরে না—সামান্য জরিমানা করে। ভারত নিষেধাজ্ঞার পথে গিয়ে এখন নিজেই সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে। তদুপরি খসড়াটি তৈরি হয়েছে যথেষ্ট অসতর্কভাবে। 'আর্থিক ঝুঁকিপূর্ণ খেলা'র সংজ্ঞা (২ ও ৬ ধারা) এত ব্যাপক যে তা শেয়ার বা ফরেক্স লেনদেন, ক্রিপ্টো বিনিয়োগ—ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তা আছে এমন প্রায় যেকোনো বৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডকেই অপরাধ বানিয়ে ফেলতে পারে, কারণ নিয়ন্ত্রিত আর্থিক পণ্যের জন্য কোনো ছাড় রাখা হয়নি। ভেতরের ক্রস-রেফারেন্সগুলো ভুল ধারায় নির্দেশ করছে; 'সরকার'-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে দুবার, দুরকমভাবে; যে আইন মানুষকে কারাগারে পাঠাবে, সেটি এত খাপছাড়া হওয়া অগ্রহণযোগ্য।
ন্যায্যতার খাতিরে বলতেই হয়, খসড়ার কিছু অংশ ভালো ও মানবিক। জুয়ায় আসক্তদের জন্য কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের কথা (৪৮ ধারা), ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিংকে স্পষ্ট অপরাধ ঘোষণা (১৩ ও ২৫ ধারা)—যা আমাদের আইনে এতদিন ছিল না, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা (৪৯ ধারা), পরিসংখ্যান ও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের স্বচ্ছতা (৫০ ধারা) এবং নির্ভরযোগ্য ইংরেজি ভাষ্য (৫৩ ধারা)—সবই ইতিবাচক। এগুলো প্রমাণ করে, চাইলে এই খসড়া একটি সত্যিকারের আধুনিক, অধিকার-সচেতন জুয়াবিরোধী আইনই হতে পারত। দুর্ভাগ্য এই যে, এই ভালো দিকগুলো বসে আছে এমন এক কাঠামোর পাশে, যা তাদের গিলে ফেলে।
অনলাইন জুয়া নিঃসন্দেহে একটি বাস্তব সমস্যা, এবং এর মোকাবিলা দরকার। কিন্তু সেই মোকাবিলা হওয়া উচিত সুরক্ষা-সংবলিত একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে—গণ-নজরদারির ব্যবস্থা দিয়ে নয়। সরকারের উচিত হবে এই খসড়া এই অবস্থায় এগিয়ে না নেওয়া। বরং প্রয়োজন আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকারকর্মী, উপাত্ত-সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে খোলামেলা, একাধিক দফার আলোচনা; বিদ্যমান সাইবার আইনের সঙ্গে সংঘাত নিরসন; গণ-নজরদারির ধারাগুলো বাতিল করা অথবা সেগুলোকে পুরোপুরি উপাত্ত-সুরক্ষা আইন ও বিচারিক ওয়ারেন্টের অধীন করা; খেলোয়াড় নয়, অপরাধচক্রকে লক্ষ্য করে জামিনযোগ্য ও মাত্রাভেদে সাজানো শাস্তি; এবং জুয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে নাকি নিষিদ্ধ—সেই মৌলিক সিদ্ধান্ত পরিষ্কার করা।
যে দেশ সবেমাত্র একটি দমনমূলক ডিজিটাল আইন ভেঙে ফেলতে গোটা একটি বছর খরচ করল, সে দেশ চুপিসারে আরেকটি দমনমূলক আইন গড়ে তোলার বিলাসিতা সইতে পারে না—এবার যার মুখোশ জুয়ার মতো এক নিরীহ-শোনানো অজুহাত। জুয়া রুখতে গিয়ে আমরা যেন গোটা জাতিকেই সন্দেহভাজনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে না ফেলি।
লেখকঃ গবেষক



