সৌরবিদ্যুতে কর অব্যাহতি ও ৫ শতাংশ রেয়াতের মেগা পরিকল্পনা এনবিআরের
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি এবং ব্যবহারকারীদের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ওপর ৫% কর রেয়াতের সুবিধা দিচ্ছে এনবিআর
দেশে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে বড় ধরনের কর সুবিধা দেওয়ার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে এই বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে এবং শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারেi।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর বিভাগের বিশ্বস্ত সূত্রে প্রকাশ, পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানির প্রসার নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও সরবরাহ ব্যবসায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্জিত আয়ের ওপর সম্পূর্ণ আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সুবিধা আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এই আকর্ষণীয় কর অব্যাহতি সুবিধা পেতে হলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—নিজস্ব অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে এবং প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য 'নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫' অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক অনুমোদন নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আয়কর আইন ২০২৩-এর সকল বিধান মেনে চলতে হবে। কর সুবিধা পেতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্দিষ্ট পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ) অনুযায়ী ব্যবহারকারীকে সরবরাহ করতে হবে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকলে তা নেট-মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হবে। তবে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উৎসে কর কেটে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান বহাল থাকবে।
এছাড়াও সূত্রটি বলছে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও থাকছে বিশেষ চমক। কোনো প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে, তাদের মোট পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ মোট প্রদেয় আয়করের বিপরীতে সরাসরি ‘কর রেয়াত’ হিসেবে কেটে রাখতে পারবে। ব্যবসায়ীদের সোলার প্যানেল স্থাপনে এই ধরনের প্রণোদনা দেয়া হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তিন বছরের (২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫) উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের পরও সৌর বিদ্যুতের বিভিন্ন উপকরণ আমদানি থেকে বছরে রাজস্ব আসে সাড়ে ৫ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৬ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক রাজস্ব আয়ের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য (২০ কোটি টাকারও কম)। অথচ এই উচ্চ করভার দেশে সবুজ জ্বালানির পথে যাত্রার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনে ব্যবহৃত অধিকাংশ যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত আকাশচুম্বী শুল্ক-কর আরোপিত আছে। এইচএস কোড (HS Code) অনুযায়ী সোলার পিভি মডিউল, ফোটোভোল্টাইক সেল এবং সোলার ইনভার্টারের মতো মূল যন্ত্রাংশে যথাক্রমে ২৬.৯০ শতাংশ, ২৫.৭৫ শতাংশ এবং ২৮.৭৩ শতাংশ শুল্ক-কর বিদ্যমান। একইভাবে ডিসি কেবল, মাউন্টিং স্ট্রাকচার (অ্যালুমিনিয়াম) ও ব্যাটারি প্যাকের ওপর ৫৮.৪০ শতাংশ এবং মনিটরিং ইউনিট ও সার্কিট বোর্ডের ওপর ৩১ থেকে ৩৭ শতাংশের বেশি করহার রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৮৯.০৮ শতাংশ কর আরোপিত আছে পিভি ডিজি কন্ট্রোলার বা হাইব্রিড কন্ট্রোলারের ওপর।
এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি গাজীপুরের চন্দ্রায় ওয়ালটন হেডকোয়ার্টার্সে জলাশয়ের পানির ওপর স্থাপন করা হয়েছে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্লোটিং সোলার প্রজেক্ট। এটিকে দেশের মধ্যে বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত সর্ববৃহৎ সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে দাবি করা হয়েছে। এর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বুলনপুরে স্থাপিত ২.৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার পাওয়ার প্রজেক্টে জলাশয়ের পানির ওপর দশমিক ৮ (০.৮) মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল ভাসমান অবস্থায় স্থাপন করা হয়েছিল। এভাবেই দেশের টেককোম্পানি বিশেষ করে টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলোও এই পথে হাটতে চাইছে বলে জানাগেছে।
উদ্যোক্তা ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব যন্ত্রাংশে কর অব্যাহতি ও রেয়াত সুবিধা দেওয়া হলে দেশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাবে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমবে এবং শিল্প ও আবাসিক পর্যায়ে সোলার ব্যবহারের খরচ কমে আসায় নতুন কর্মসংস্থান ও বিপুল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের দুয়ার উন্মোচিত হবে।
/ডিবিটেক/ডিপিও/এমইউআইএম/



