অল্প সময়ের মধ্যে যতটা সম্ভব আগামী সরকারের সামনের চ্যালেঞ্জ গুলো সমাধান করে যাচ্ছেন বলে আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করণে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই নীতি নির্ধারক বললেন, সব সমালোচনা, সব চাপ নিজের কাঁধে নিয়ে; তারা (আগামী সরকার) যেন ডিজিটাল ইকোনোমিকে এগিয়ে নিতে পারে, সব কছুকে আমি একক ভাবে দায়িত্ব নিয়ে তাদের সব চ্যালেঞ্জ সমাধান করে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। গত বাজেটে কোনো প্রজেক্ট না নিয়ে, এক্সিসটিং রিসোর্স নিয়ে ইনস্টিটিউশনাল সক্ষমতা বাড়াতে চেষ্টা করেছি। সর্বত্র প্রজেক্ট অপ্টিমাইজেশনের চেষ্টা করেছি। আমি যখন দায়িত্ব নেই তখন বিশ্ব ব্যাংকের এজ প্রজেক্ট বাস্তবায়নের হার ছিলো মাত্র ১১ শতাংশ। আজকে এটি বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশ। এই রেকর্ড এর কারণে ডিজিটাল ট্রান্সফলমেশনে নতুন বিনিয়োগ ও ফান্ড আসবে।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ‘আইসিটি ও টেলিকম খাতের সংস্কারনামা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলে তিনি। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ভয়েস ফর রিফর্ম ও টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্লাটফর্ম (টিআইপিএপি) এর যৌথ আয়োজনে এই গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার এই বিশেষ সহকারি।
সভায় ‘বাংলাদেশে গড় আমদানি শুল্ক ৭৩ শতাংশের বেশি হলেও মোবাইল আমদানিতে এই হার ১০ শতাংশ নামিয়ে আনা হয়েছে। অন্যখাতে কেউ যদি এতোটা কমিয়ে আনতে পারে তবে সেটিকে বেস্ট প্র্যাক্টিস দেখিয়ে কর আরও কমাতে এনবিআর-এ যাবেন বলে প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব।
এরপরও এ নিয়ে আন্দোলনকে অনভিপ্রেত উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘মোবাইল আমদানীকারকরা ৪৩ শতাংশ ট্যাক্স দেয় না। তারা দেয় কাস্টম ডিউটি, রেস্টিকটিভ ডিউটি এবং এটিআই ডিউটি। এরমধ্যে এটেআই রিবেট করতে পারে। এরমধ্যে রেস্টিকটিভ ডিউটি ৩ শতাংশ। কাস্টম ডিউটি ইতিম্যধ্যেই মধ্যে ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।’
‘যেহেতু শুল্ক কমেছে, মোবাইল ফোনের দাম অবশ্যই কমবে’ এমন দৃঢ়তা ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছেন, বাজার মনিটরিংয়ের জন্য এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার কাজ করবে।
বিশেষ সহকারি আরও বলেন, ৩০ হাজার টাকার নিচে মোবাইল ফোনের অধিকাংশই দেশেই উৎপাদন হয়। যারা আন্দোলন (মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের চলমান আন্দোলন) করছেন তাঁরা ৩০ হাজারের বেশি বিদেশ থেকে ফোন কেরিয়ার ও কন্টাক্টের মাধ্যমে নিয়ে আসেন। তাদের চাপ কমানোর জন্যই শুল্ক ৬০ শতাংশ কমানো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের সব দাবি মেনে নিয়ে ব্যবসায়ীদের স্টকে থাকা মুঠোফোনগুলোকে বৈধ করা হয়েছে, আগামী তিন মাস কোনো মুঠোফোন ব্লক হবে না। এত কিছুর পরও সড়কে আন্দোলন করা দুর্ভাগ্যজনক। এটা বিনিয়োগবান্ধব পরিস্থিতির বিরোধী বলে স্বীকৃত হবে।
৮৮ লাখ সিম বন্ধ হওয়ার বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে ফয়েজ বলেন, এটা ঠিক। তবে এই সিমগুলোর ৬০-৭০ শতাংশই অব্যবহৃত ছিলো। তাই এটা নিয়ে পেনিক করার কিছু নেই।
টিপাপ সম্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদ, টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, আইসিটি বিভাগের শ্বেতপত্র প্রকাশ টাস্কফোর্সের প্রধান অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহ প্রমুখ।
এর আগে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইসিটি খাতের বিগত সরকারের ভিশন দার্শনিক দৃষ্টিতে ভুলছিলো উল্লেখ করে ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বলেন, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাসট্রাকচারের ফাউন্ডেশন পিলার ৪টি। এর একটি লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্ক থাকবে। ইন্টার কানেক্টিভিটি হবে। একটি ইলেকট্রনিক আইডি ম্যানেজমেন্ট ও ভেরিফিকেশন থাকবে এবং সার্ভিস লেয়ার থাকবে। কিন্তু বিগত সরকার অন্য তিনটি না করে কেবল সার্ভিস কেন্দ্রিক অ্যাপ ডেভেলপ করেছে। আইসিটি হয়ে গেছে অ্যাপ ও মুভি তৈরির একটি জায়গা। সেখানে সার্ভিস হিসেবে গেইমিং অ্যাপ ওয়েব সাইট তৈরি গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে বেশি কিছু সাইলো তৈরি হয়েছে। তাই এখনো আমার কাছে পেন ড্রাইভে করে তথ্য দেয়। ৫০টির অধিক মন্ত্রণালয় ও দফতরকে সংযুক্ত করতে কোনো ডিজিটাল কানেক্টিভিটি হাইওয়ে ছিলো না। ইলেকট্রনিক আইডি ম্যানেজমেন্টের পদ্ধতিটা ছিলো ভুল। কেননা আমার নাম, ঠিকানা ভিন্নি ভিন্ন ডেটাবেজে ভিন্নি ভিন্ন থাকলে কাউকে অথেন্টিকেশন করা যায় না। নির্বাচন কমিশন আগে এপিআই এর মাধ্যমে পুরো ডেটাটা দিয়ে দিতো। সেটা দিয়েই অল্টারনেটিভ ডেটাবেজ হয়ে গেছে। সেটা দিয়ে আইডি তৈরি করা যায়!
এমন বাস্তবতায় সম্পাদিত কাজ বিষয়ে বিশেষ সহকারি জানালেন, শুরুতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সেখানে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে আলাদা আলাদ করে সাইবার সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির দাবি অনুযায়ী, যমজ আইন হিসেবে পার্সনাল ডেটা প্রটেকশন অধ্যাদেশ এবং ন্যাশনাল ডেটা গভর্নেন্স অ্যান্ড ইন্টার অপারেবিলিটি অধ্যাদেশ। এক্ষেত্রে ডেটার লোকালাইজেশনের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক কারণে যেন কোনো সেক্টর প্যারালাইজ না হয় সে জন্য সিঙ্ক্রোনাইজ লোকাল ব্যাকআপ দেশে রাখার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। তবে গুগল, মেটা, উবারের আপত্তির কারণে তাদের ডিফেক্টো এক্সামিনেশন দেয়া হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তায় ৭টি পলিসির করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল সোর্স কোড পলিসি আগামী সম্পাতে কেবিনেটে উঠবে। ন্যাশনাল ক্লাউড অ্যান্ড এআই পলিসির খসড়া রেখে যাচ্ছি। আইনি কাঠামোর বাইরে ইন্টার অপারেবিলিটির চ্যালেঞ্জ বুঝতে ৪১টি এপিআই নিয়ে লাইভ পাইলট হিসেবে ‘নাগরিক সেবা’ চালু করা হয়েছে। এনডিসি’র ভার্চুয়াল মেশিনগুলোর দেখভাল করতে মনিটরিং এজেন্ট বসানো হয়েছে। প্লাটফর্ম অ্যাজ এ সার্ভিস উদ্বোধন করা হয়েছে। সবশেষ সামিট ও ফাইবার অ্যাট হোমের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি রিভিউ করে তাদেরকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ রেভিনিউ শেয়ারে বাধ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক এর আড়াই হাজার কোটি টাকার বাজে প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। ৪৩ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে। সোর্স কোড সংরক্ষণে বিসিসিতে সোর্স কোড ডিপোজিটরি হিসেবে ন্যাশনাল গিট হাব স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে আইসিটি বিভাগ আগামীতে আর ভেন্ডর ডিপেন্ডেন্ট থাকবে না।
টেলিকম রিফর্ম বিষয়ে ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব জানান, ডাকের পোস্টাল অ্যাড্রেস ম্যানেজমেন্ট এগিয়ে নেয়া হয়েছে। ডিচিটাল ট্রাকিং ৪০ শতাংশের নিচ থেকে ৬৬ শতাংশের কাছাকিাছি পৌঁছেছে। ৫টি করে কুরিয়ার সার্ভিস, ব্যাংক, এমএফএস, ই-কর্মার্স প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে সেন্ট্রাল লজিন্টিক ট্র্যাকিং প্লাটফর্ম তৈরির কাজ পাইলট পর্যায়ে রয়েছে। টেলিকম খাতের ২৬ লাইসেন্সের স্তরে বিশেষ বিশেষ কোম্পানি কাজ করত। অতীতে বিশেষ একটি কোম্পানির চাহিদা মতো পলিসি পরিবর্তন করা হতো। এটা ভাঙতে অনেক চাপে মুখে ডিব্লিউডিএম উন্মুক্ত করা হয়েছে। ডার্ক ফাইবার ভাড়ার সুবিধা চালু হয়েছে। ডিজিটাল সার্ভিস লেয়ারে ইনোভেশন আনতে টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স ও নেটওয়ার্ক নীতিমালা পরিবর্তন করে সিম্পল করা হয়েছে। অ্যাক্টিভ ও প্যাসিভ শেয়ারিংয়ের সুযোগ রেখে ডেটা সেন্টার-টাওয়ার ও ফাইবার- সবগুলো অবকাঠামোকে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রযুক্তি উন্মুক্ত করা হয়েছে। এমএফএস কে নিরাত্তা দিতে এবং কিস্তিতে মোবাইল, ল্যাপটপ কেনার সুযোগ করে দিতে ডিভাইস মার্কেটের নিরাপত্তা কবচ হিসেবে এনইআইআর চালু করা হয়েছে। টেলিযোগাযেগা খাতের ছয়টি কোম্পানির মধ্যে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির ব্যান্ডউইথ ব্যাবহার ১.৭ টেরাবাইট থেকে ৪.৫ টেরাইবাইটে উন্নীত হয়েছে। প্রথমবারের মতো লাভের মুখ দেখে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি। খুলনা ক্যাবল শিল্পে বার্ষিক লাভ ২০ কোটি টাকা থেকে ৮০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিটিসিএল-এ রিফর্ম করা হচ্ছে। এতে কোম্পানিটিও সহসাই লাভের মুখ দেখতে পারে। টেশিস রাউটার ও সেটটপ বক্স বানাতে যাচ্ছে। মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি’র মধ্যে ক্ষমতার মেলবন্ধন রচনায় কিছু লাইসেন্সকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে স্ট্যাডির সাপেক্ষে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত দেবে। আইএসপি লাইসেন্স সহ সব ধরনের এনলিস্টমেন্ট ও পারমিশন দেবে বিটিআরসি। সংস্থাটি এখন থেকে নিজেরাই সর্বোচ্চ আড়াই শতাংশ করে প্রতি তিন মাস অন্তর ট্যারিফ সিলিং পরিবর্তন করতে পারবে। বিটিআরসি ও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত একটি কসজুডিশিয়াল রিভিউ যুক্ত করা হয়েছে।
ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউএম