বিশ্ব মেট্রোলজি দিবসে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার অস্বস্তিকর বাস্তবতা
ডিজিটাল মিটারে ‘বিশ্বাস’, ট্যাংকে কম তেল
গাড়ির ফুয়েল ট্যাংক ভরতে গিয়ে ডিজিটাল ডিসপ্লেতে চোখ রাখেন প্রায় সব গ্রাহকই। মিটারে ৫ লিটার, ১০ লিটার কিংবা নির্দিষ্ট টাকার হিসাব মিললেই ধরে নেওয়া হয়—ঠিক পরিমাণ জ্বালানি মিলেছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই ডিসপেন্সিং ইউনিটকে সাধারণ মানুষ প্রায় নির্ভুল বলেই বিশ্বাস করেন। কিন্তু সেই ডিজিটাল প্রযুক্তিই এখন পরিণত হয়েছে নিখুঁত প্রতারণার অস্ত্রে।
এমন তিক্ত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ২০ মে, বুধবার পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—“নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আস্থা নির্মাণে মেট্রোলজি”। অথচ বাংলাদেশে ওজন ও পরিমাপ ব্যবস্থার ওপর সেই আস্থাই এখন প্রশ্নের মুখে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম, খুলনা, ভৈরবসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযানে একের পর এক ফিলিং স্টেশনে কম তেল দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)।
চট্টগ্রামে মার্চজুড়ে পরিচালিত অভিযানে একাধিক ফিলিং স্টেশনে প্রতি ৫ লিটারে ৪০ থেকে ১২০ মিলিলিটার পর্যন্ত কম তেল সরবরাহের তথ্য উঠে আসে। কোথাও ডিজেল, কোথাও অকটেন—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল ডিসপ্লেতে সঠিক হিসাব দেখালেও বাস্তবে ট্যাংকে যাচ্ছে কম জ্বালানি। অভিযানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকার বাইরেও। খুলনায় পরিমাপে কম তেল দেওয়ার অভিযোগে একটি ফিলিং স্টেশনকে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করেছে। আবার কিশোরগঞ্জের ভৈরবে এক ফিলিং স্টেশনকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
রাজধানী ঢাকাতেও জ্বালানি খাতের অনিয়ম নিয়ে সরকারের উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি ঢাকার ৬৮টি ফিলিং স্টেশনে ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে জ্বালানি সরবরাহে নজরদারি বাড়ানো যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ট্র্যাকিং বাড়লেও ডিসপেন্সিং ইউনিটের সফটওয়্যারভিত্তিক কারচুপি বন্ধে এখনও কার্যকর কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
কীভাবে হয় ডিজিটাল কারচুপি?
বিএসটিআই কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক ডিসপেন্সিং ইউনিট মূলত সেন্সর, পালস জেনারেটর, কন্ট্রোল সার্কিট ও সফটওয়্যারের সমন্বয়ে কাজ করে। জ্বালানি প্রবাহের তথ্য ডিজিটাল সিগনালে রূপান্তর হয়ে ডিসপ্লেতে প্রদর্শিত হয়। আর এখানেই ঘটছে জালিয়াতি।
অনেক ক্ষেত্রে মাদারবোর্ডে অতিরিক্ত চিপ বসিয়ে বা সফটওয়্যারের ‘পালস রেশিও’ পরিবর্তন করে মেশিনকে এমনভাবে কনফিগার করা হয়, যাতে ডিসপ্লেতে ১ লিটার দেখালেও বাস্তবে কিছুটা কম জ্বালানি সরবরাহ হয়। কোথাও কোথাও আবার গোপন সুইচ বা রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার করে ব্যস্ত সময়ে কারচুপির মোড চালু করা হয়।
বিএসটিআই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিদর্শক (মেট্রোলজি) বুলবুল আহমেদ জয় বলেন, অভিযানের সময় ৫ বা ১০ লিটারের স্ট্যান্ডার্ড পরিমাপক পাত্রে তেল ভরে ডিজিটাল স্ক্রিনের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরিমাণ মিলিয়ে দেখা হয়। তখনই কারচুপির বিষয়টি ধরা পড়ে। তার ভাষায়, “ডিজিটাল মেশিন মানেই শতভাগ নিরাপদ—এ ধারণা ভুল। প্রযুক্তি যেমন সুবিধা বাড়িয়েছে, তেমনি প্রতারণার কৌশলও আরও নিখুঁত করেছে।”
গ্রাহকের আস্থা কোথায়?
চট্টগ্রামের প্রাইভেট কারচালক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বলছেন, একই পরিমাণ অকটেন নেওয়ার পরও এখন আগের তুলনায় ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার কম মাইলেজ পাওয়া যায়। রাইডশেয়ার চালকদেরও একই অভিযোগ। কিন্তু ডিজিটাল মিটারে সবকিছু ঠিক দেখায় বলে সরাসরি অভিযোগ করার সুযোগ থাকে না।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে এই কারসাজি ধরা সম্ভব নয়। তার মতে, “গ্রাহকেরা বুঝবে কীভাবে মিটারে গরমিল রয়েছে? প্রশাসন যদি ব্যবস্থা না নেয়, ভোক্তাদের কিছু করার থাকে না।”
আইন আছে, নজরদারি কতটা?
বাংলাদেশের ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন-২০১৮ অনুযায়ী পরিমাপে কম দিলে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ অভিযান অভিযোগনির্ভর বা বিশেষ সময়কেন্দ্রিক। ফলে বছরের বড় সময়জুড়ে নজরদারির বাইরে থেকে যায় অনেক ফিলিং স্টেশন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযানে নয়—ডিজিটাল ডিসপেন্সিং ইউনিটের সফটওয়্যার অডিট, রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু না হলে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ করা কঠিন। বিএসটিআই কর্মকর্তারাও মনে করছেন, ডিসপেন্সিং সফটওয়্যারের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলে কারচুপি অনেকাংশে কমে আসবে।
১৮৭৫ সালের ২০ মে প্যারিসে ‘মিটার কনভেনশন’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমাপ ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে। দেড়শ বছর পর এসে সেই পরিমাপ ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জ আর যান্ত্রিক নয়—ডিজিটাল। তাই বিশ্ব মেট্রোলজি দিবসের মূল বার্তাও এখন স্পষ্ট: প্রযুক্তির যুগে আস্থা গড়তে হলে শুধু আধুনিক যন্ত্র নয়, প্রয়োজন সৎ পরিমাপ, কার্যকর নজরদারি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউএম



