জ্বালানি লোডিংয়ের অনুমতি মিলেছে; এপ্রিলের শেষে উদ্বোধন

জ্বালানি লোডিংয়ের অনুমতি মিলেছে; এপ্রিলের শেষে উদ্বোধন
১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ২০:২৮  

অবশেষে রূপপুর পারমাণবিকে জ্বালানি লোডিং কার‌্যক্রমে লাইসেন্স প্রদানের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। এপ্রিলের শেষে রূপপুর পারমাণবিকের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং হওয়ার সম্ভবনার কথা জানাগেছে। 

১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান এই আশাবাদের কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাসমূহের পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এখন কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রস্তুত। 

জ্বালানি লোডিং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর মাধ্যমে রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপন করা হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিভিন্ন ধাপে পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এসব কার্যক্রম সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হওয়ায় জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে।

এ সময় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (NPCBL)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

এরআগে বায়রা লাইসেন্স প্রদান না করায় নির্ধারিত চলতি মাসের ৭ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হয় । বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম ৭ এপ্রিল উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ঢাকার নভোথিয়েটার থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভার্চুয়ালি জ্বালানী লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধনের কথা ছিল। উদ্বোধনের জন্য অন্যান্য প্রস্তুতি গ্রহন করা হলেও জ্বালানী লোডিং কার্যক্রম শুরু করা এসময় সম্ভব হয় না।

দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ প্রকল্পটি দীর্ঘ সময়ের নানা জটিলতা পেরিয়ে এখন দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগেও একাধিকবার উৎপাদন শুরুর সময় পিছিয়েছে। প্রায় দুই বছর আগে রাশিয়া থেকে প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়াম জ্বালানি দেশে আনা হলেও তা এখনো ব্যবহার করা যায়নি।

জ্বালানি লোডিংয়ের আগে International Atomic Energy Agency-এর তত্ত্বাবধানে Bangladesh Atomic Energy Regulatory Authority থেকে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। জ্বালানী লোডিং এর লাইসেন্স পাবার আগে দুই দেশের (বাংলাদেশ ও রাশিয়া) সরকার প্রধানের সময় নিয়ে উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করায় এসময় অস্বস্তিতে পড়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প উৎস হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রসঙ্গত, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে নির্মিত এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা)। ২০১৩ সালে চুক্তি স্বাক্ষর এবং ২০১৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়।

প্রথম ইউনিটের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে এবং ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ চলমান, যা আগামী বছরের শেষ নাগাদ শেষ হতে পারে। পুরো প্রকল্প ২০২৮ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

সবকিছু ঠিক থাকলে, প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শুরুর প্রায় তিন মাসের মধ্যেই কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম সম্পন্ন করে আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রথম ইউনিটের  পূর্ণ সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালন শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই অগ্রগতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

ডিবিটেক/এমটিএম/ইকে