ডিজিটাল সহিংসতা রোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, প্রশমন ও প্রতিকারে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নীতি, জবাবদিহি ও সচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারা বলেন, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি এর অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরামর্শ সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। “ডিজিটাল উন্নয়ন ও প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয়: প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকা” শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন। প্রকল্পটি ‘নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ)’ কর্মসূচির অংশ, যা সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং জিএফএ কনসালটিং গ্রুপের কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সভা সঞ্চালনা করেন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. এস. এম. মোরশেদ।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী এ এইচ এম বজলুর রহমান। তিনি বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার নতুন ও জটিল রূপ দেখা দিচ্ছে। এসব মোকাবিলায় প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন বলেন, দেশে এ ধরনের সহিংসতা মোকাবিলায় আইন থাকলেও সেগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীরা অভিযোগ না করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তাই অভিযোগ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বক্তারা জানান, প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি অনলাইনে ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস ও সাইবার হয়রানির মতো ঘটনা বাড়ছে। এসব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারী, শিশু, কিশোরী এবং ভিন্ন লিঙ্গপরিচয়ের মানুষ।
সভায় উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল-এর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের ৮৯ শতাংশ অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
আলোচনায় প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার বিভিন্ন ধরন তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সাইবার স্টকিং, সাইবার বুলিং, ডক্সিং, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, ইমেজভিত্তিক নির্যাতন ও চাইল্ড গ্রুমিং। বক্তারা বলেন, ডক্সিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা ভুক্তভোগীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেলছে।
বিটিআরসির উপপরিচালক মো. ফারহান আলম জানান, গত বছর সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট অপসারণের জন্য ১৩ হাজারের বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার অধিকাংশই নারীদের পক্ষ থেকে। তিনি বলেন, পরিবার থেকেই সচেতনতা বাড়াতে হবে।
এছাড়া বক্তারা নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা, বিচারপ্রাপ্তি সহজ করা, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের মতো পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেন।
সভায় জানানো হয়, অনলাইন সহিংসতার শিকার নারীরা পুলিশের ‘Cyber Support for Women’ সেবার হটলাইন, ফেসবুক পেজ ও ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারেন। তবে সামাজিক লজ্জা ও ভয় অনেক নারীকে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখছে।
আলোচনায় আরও উঠে আসে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, উপাত্ত সুরক্ষা আইন এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে দেশভিত্তিক নীতিগত সমন্বয়ের বিষয়। বক্তারা বলেন, কার্যকর সংলাপের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলোর স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করা গেলে অনলাইন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ডিবিটেক/এসএম/ইকে







