ডিজিটাল ব্যবসা খাতে নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত এক দশকে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (BTRC) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশ। একই সঙ্গে Google, Temasek এবং Bain & Company-এর বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতি আগামী পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, এবং বাংলাদেশ এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অংশীদার হতে পারে।
বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। e-CAB এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ই-কমার্স বাজারের আকার প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, এবং এই খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই খাতটি এসএমই উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৯ সালের মধ্যে এই খাত ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই সম্ভাবনাময় খাতটি এখনও বেশ কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
প্রথমত, একটি শক্তিশালী এবং একক নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভাব একটি বড় সমস্যা। বর্তমানে ডিজিটাল কমার্স সম্পর্কিত বিষয়গুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইসিটি বিভাগের মধ্যে বিভক্ত। এর ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীর হয়ে যায় এবং উদ্যোক্তারা প্রায়ই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। Singapore এবং Estonia-র মতো দেশগুলো একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের ডিজিটাল অর্থনীতিকে দ্রুত সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও একটি স্বাধীন Digital Commerce Authority প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গত কয়েক বছর ধরে আলোচনা পর্যায়ে থাকলেও এটি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করা হলে নীতি সমন্বয়, গ্রাহক সুরক্ষা এবং বাজার সম্প্রসারণ ও তদারকি কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, গ্রাহক আস্থার সংকট এই খাতের জন্য একটি বড় বাধা। অতীতে কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে হাজার হাজার গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যার ফলে পুরো খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে। একটি বাধ্যতামূলক escrow payment system চালু করা হলে গ্রাহকের অর্থ একটি নিরাপদ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকবে এবং পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার পরেই বিক্রেতা অর্থ পাবে। বিশ্বব্যাপী Amazon, Alibaba এবং অন্যান্য বড় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এই পদ্ধতি ব্যবহার করে গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করছে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ডিজিটাল উপস্থিতি এখনও সীমিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক ই-কমার্স বাজারের আকার বর্তমানে ২৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি, কিন্তু বাংলাদেশ এই বাজারের একটি খুবই ছোট অংশ দখল করতে পেরেছে। যদিও cross-border e-commerce policy প্রণয়নের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে, তবে এটি দ্রুত অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন করা জরুরি। এই নীতি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের এসএমই উদ্যোক্তারা Amazon, Alibaba এবং অন্যান্য বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে সহজেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন, যা দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।এটি কার্যকর হলে আগামী ৫ বছরে বর্তমান বাজার .৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক payment gateway-এর সীমাবদ্ধতা ব্যবসার সম্প্রসারণে একটি বড় বাধা। বর্তমানে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা PayPal-এর পূর্ণ সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফ্রিল্যান্সিং থেকে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক payment infrastructure চালু করা হলে এই আয় আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পঞ্চমত, logistics infrastructure এবং fulfillment network এখনও পর্যাপ্ত উন্নত নয়। একটি দক্ষ logistics ব্যবস্থা ছাড়া ই-কমার্স খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। Vietnam সরকার logistics infrastructure উন্নয়ন এবং policy support-এর মাধ্যমে মাত্র পাঁচ বছরে তাদের ই-কমার্স বাজারকে তিনগুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও একটি national fulfillment network এবং logistics modernization program গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এছাড়া skilled manpower এবং export-focused digital entrepreneur-এর অভাব একটি বড় সীমাবদ্ধতা। Digital business management, international trade এবং e-commerce export বিষয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।
নতুন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে একটি সুস্পষ্ট Digital Commerce Reform Program ঘোষণা করা। ক্ষমতায় আসার প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে Digital Commerce Authority প্রতিষ্ঠা, escrow payment system বাধ্যতামূলক করা, cross-border e-commerce policy বাস্তবায়ন , স্কিল ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করা এবং আন্তর্জাতিক payment integration নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। দেশের তরুণ জনসংখ্যা, দ্রুত সম্প্রসারিত ইন্টারনেট ব্যবহার এবং strong entrepreneur base এই খাতের উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। সঠিক নীতি এবং সরকারি সহায়তার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল ব্যবসা খাত ১০ লক্ষের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত কর্মসংস্থান লক্ষ্যমাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই খাত থেকেই অর্জন করা সম্ভব।
বাংলাদেশ যদি এখন সঠিক নীতি এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তাহলে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান ডিজিটাল কমার্স হাবে পরিণত হতে পারে।
লেখকঃ সাবেক সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত), ই-ক্যাব





