ডেড ইন্টারনেট থিওরি:

ইন্টারনেট কি সত্যিই মৃত হয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশ কী করতে পারে

ইন্টারনেট কি সত্যিই মৃত হয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশ কী করতে পারে
২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৪৩  

একই ধরনের মিম, একই রকম মন্তব্য, অ্যালগরিদমে সাজানো অন্তহীন কনটেন্ট, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি লেখা, ছবি ও ভিডিও। ইন্টারনেট কি ধীরে ধীরে তার মানবিক প্রাণশক্তি হারাচ্ছে? একসময় যে ডিজিটাল জগৎ ছিল মানুষের কৌতূহল, সৃজনশীলতা, মতবিনিময় ও স্বাধীন প্রকাশের জায়গা, তা কি এখন করপোরেশন, অ্যালগরিদম, বট ও এআই-নির্ভর কনটেন্টের এক বিশাল গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে?

এই অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে বহুল আলোচিত একটি ধারণা, ডেড ইন্টারনেট থিওরি। নাম শুনলে মনে হতে পারে, ইন্টারনেট যেন আর জীবন্ত নেই। যেন সেখানে মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে, আর জায়গা দখল করেছে স্বয়ংক্রিয় বট, নকল অ্যাকাউন্ট, অ্যালগরিদমিক প্রচারণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি কনটেন্ট।

তবে বিষয়টি এত সরল নয়। ডেড ইন্টারনেট থিওরি একদিকে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, অন্যদিকে আধুনিক ইন্টারনেটের কিছু বাস্তব সংকটের অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা। এই তত্ত্ব পুরোপুরি সত্য নয়, কিন্তু একে একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও সহজ নয়। কারণ আমাদের দৈনন্দিন অনলাইন অভিজ্ঞতার অনেক কিছুই এখন সত্যিই অস্বাভাবিক, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং যান্ত্রিক মনে হয়।

এক প্রাণহীন শহরের উপমা

কল্পনা করুন, আপনি একটি বিশাল, ব্যস্ত শহরে হাঁটছেন। চারদিকে উঁচু দালান, ঝলমলে আলো, দোকানপাট, ক্যাফে, বিজ্ঞাপন, রাস্তার ভিড়। প্রথম দেখায় শহরটি প্রাণবন্ত। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে তাকাতেই বুঝলেন, শহরের মানুষগুলো আসল নয়। পথচারী, দোকানের বিক্রেতা, ক্যাফেতে বসে থাকা মানুষ, সবাই যেন নিখুঁতভাবে তৈরি রোবট বা ম্যানিকুইন। তারা মানুষের মতো কথা বলছে, মানুষের মতো আচরণ করছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সত্যিকারের অভিজ্ঞতা, আবেগ বা চিন্তা নেই।

ডেড ইন্টারনেট থিওরির দাবি অনেকটা এমনই। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আজকের ইন্টারনেট বাইরে থেকে জীবন্ত মনে হলেও এর বড় একটি অংশ আর মানুষের তৈরি নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট, মন্তব্য, লাইক, শেয়ার, ভিউ, ভাইরাল ট্রেন্ড, এমনকি অনেক ওয়েবসাইটের লেখা ও সংবাদও ক্রমেই বট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি কনটেন্টে ভরে যাচ্ছে।

এই তত্ত্বের সমর্থকেরা বলেন, অনলাইন পরিবেশ অনেকাংশে সাজানো। এখানে জনমত তৈরি হয়, ট্রেন্ড তৈরি হয়, ক্ষোভ তৈরি হয়, জনপ্রিয়তা তৈরি হয়, আবার কখনো মানুষকে নির্দিষ্ট পণ্য, মতাদর্শ বা রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। তাঁদের মতে, ইন্টারনেট আর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত মিলনমেলা নয়; বরং অ্যালগরিদম ও অটোমেশনের নিয়ন্ত্রিত এক কৃত্রিম জনপরিসর।

তত্ত্বটির জন্ম ও জনপ্রিয়তা

ডেড ইন্টারনেট থিওরি মূলত ২০২১ সালের দিকে অনলাইন ফোরাম, বিশেষ করে 4chan, Reddit এবং কিছু বিকল্প ডিজিটাল কমিউনিটিতে আলোচনায় আসে। তবে এর চিন্তার বীজ আরও আগে থেকেই ছিল। অনেক ব্যবহারকারী ২০১৬-১৭ সালের পর থেকে ইন্টারনেটের চরিত্রে বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক প্রচারণা, বট-নেটওয়ার্ক, অ্যালগরিদমিক নিউজফিড এবং ডেটা-নির্ভর বিজ্ঞাপনের প্রভাব তখন দ্রুত বাড়তে থাকে।

এই তত্ত্বের সমর্থকেরা মনে করেন, ১৯৯০ বা ২০০০-এর দশকের শুরুতে ইন্টারনেট ছিল অনেক বেশি অগোছালো, ব্যক্তিগত ও মানবিক। ছোট ছোট ব্লগ, স্বাধীন ওয়েবসাইট, ফোরাম, ব্যক্তিগত ডায়েরি, অদ্ভুত কিন্তু সৃজনশীল পেজ, নানা ধরনের অনলাইন কমিউনিটি, সব মিলিয়ে ইন্টারনেট ছিল এক ধরনের মুক্ত অঞ্চল।

আজকের ইন্টারনেট তার থেকে ভিন্ন। এখন বড় প্ল্যাটফর্ম কয়েকটি কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত। আমরা কী দেখব, কী পড়ব, কার পোস্ট সামনে আসবে, কোন ভিডিও ভাইরাল হবে, তা অনেকাংশে ঠিক করে অ্যালগরিদম। মানুষের মনোযোগই এখানে পণ্য। যত বেশি সময় ব্যবহারকারী প্ল্যাটফর্মে থাকবে, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখানো যাবে, তত বেশি ডেটা সংগ্রহ করা যাবে, তত বেশি মুনাফা হবে।

এই বাস্তবতা থেকেই ডেড ইন্টারনেট থিওরি শক্তি পায়।

কেন ইন্টারনেট মৃত মনে হয়

এই তত্ত্ব জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে মানুষের নিজের অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা আছে। অনেকেই আজকাল ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে একধরনের পুনরাবৃত্তি, ক্লান্তি ও কৃত্রিমতার অনুভূতি পান।

প্রথমত, কনটেন্টের পুনরাবৃত্তি এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। একই ধরনের মিম, একই ধরনের ভিডিও, একই রকম শিরোনাম, একই ধরনের বিতর্ক, একই রকম উত্তেজনা বারবার চোখে পড়ে। একটি বিষয় জনপ্রিয় হলেই তার শত শত অনুকরণ তৈরি হয়। কোথাও সামান্য পরিবর্তন, কোথাও নতুন ক্যাপশন, কোথাও নতুন ছবি, কিন্তু মূল ভাব একই।

দ্বিতীয়ত, মন্তব্যের ভাষাও অনেক সময় যান্ত্রিক। জনপ্রিয় পোস্ট বা ভিডিওর নিচে “Nice post”, “Great video”, “So true”, “Amazing content” ধরনের অসংখ্য মন্তব্য দেখা যায়। সব মন্তব্য বটের নয়, কিন্তু এগুলোর অনেকই এত সাধারণ ও প্রাসঙ্গিকতাহীন যে ব্যবহারকারীর মনে সন্দেহ তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে শুধু অনুসরণ করে না, অনেক সময় সেটিকে তৈরি করে। আপনি একটি ভিডিও দেখলেন, তারপর একই ধরনের আরও দশটি ভিডিও সামনে এল। আপনি কোনো একটি রাজনৈতিক মতামত পড়লেন, তারপর সেই মতের কাছাকাছি আরও কনটেন্ট আসতে শুরু করল। ধীরে ধীরে ব্যবহারকারী একটি ফিল্টার বাবলের মধ্যে আটকে যান। সেখানে ভিন্নমত কম, চমক কম, নতুন অভিজ্ঞতা কম।

চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। সেখানে মানুষ আছে, কিন্তু সংযোগ কম। ভিড় আছে, কিন্তু গভীরতা কম। প্রতিক্রিয়া আছে, কিন্তু সংলাপ কম। লাইক আছে, কিন্তু আস্থা কম। এই শূন্যতা থেকেই অনেকে অনুভব করেন, ইন্টারনেট যেন আর আগের মতো মানবিক নেই।

বাস্তবতা কতটা

ডেড ইন্টারনেট থিওরির সব দাবি প্রমাণিত নয়। তবে এর পেছনের উদ্বেগগুলো বাস্তব।

ইন্টারনেটে বটের উপস্থিতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সার্চ ইঞ্জিনের ক্রলার, ওয়েবসাইট মনিটরিং টুল, ডেটা সংগ্রহকারী সফটওয়্যারসহ অনেক ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রতিদিন ইন্টারনেটে কাজ করে। এগুলোর অনেকই ক্ষতিকর নয়। বরং ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া, তথ্য সূচিবদ্ধ করা বা নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য এগুলো প্রয়োজনীয়।

কিন্তু ক্ষতিকর বটও আছে। স্প্যাম ছড়ানো, ভুয়া লাইক ও ফলোয়ার তৈরি, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালানো, সাইবার আক্রমণ, পণ্যের ভুয়া রিভিউ দেওয়া, রাজনৈতিক আলোচনায় কৃত্রিম জনমত তৈরি করা, এসব কাজেও বট ব্যবহৃত হয়। ফলে অনলাইন জনপ্রিয়তা সব সময় বাস্তব জনপ্রিয়তার প্রতিফলন নয়।

এআই-জেনারেটেড কনটেন্টের বিস্তারও দ্রুত বাড়ছে। এখন লেখা, ছবি, ভিডিও, কণ্ঠ, বিজ্ঞাপন, পণ্যের বিবরণ, এমনকি সংবাদধর্মী কনটেন্টও দ্রুত তৈরি করা যায়। এর ফলে সৃজনশীলতার সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি মানহীন ও পুনরাবৃত্তিমূলক কনটেন্টের ঝুঁকিও বেড়েছে।

ডেড ইন্টারনেট থিওরির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এটি বাস্তব সমস্যাকে অতিরঞ্জিত করে এক ধরনের সর্বব্যাপী ষড়যন্ত্রে পরিণত করে। বট আছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে ইন্টারনেটের বেশির ভাগ ব্যবহারকারী আর মানুষ নয়। এআই কনটেন্ট আছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষের সৃজনশীলতা শেষ হয়ে গেছে। অ্যালগরিদম শক্তিশালী, কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত পুতুলে পরিণত হয়েছে।

বাস্তবে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ ইন্টারনেটে লিখছে, শিখছে, কথা বলছে, ছবি তুলছে, গান করছে, গবেষণা করছে, প্রতিবাদ করছে, সংগঠিত হচ্ছে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছে। সমস্যা হলো, এই মানবিক অংশটি অনেক সময় বড় প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমিক শব্দের ভেতর চাপা পড়ে যায়।

বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের জন্য ডেড ইন্টারনেট থিওরি শুধু একটি প্রযুক্তিবিষয়ক কৌতূহল নয়। এটি গণতান্ত্রিক আলাপ, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষা, নির্বাচন, বাজার, সামাজিক সম্প্রীতি এবং নাগরিক আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। মানুষ খবর পায়, মতামত গড়ে তোলে, ব্যবসা করে, শিক্ষা নেয়, বিনোদন পায়, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখে, রাজনৈতিক বিতর্কে অংশ নেয়। কিন্তু এর সঙ্গে বেড়েছে ভুয়া খবর, গুজব, উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা, অনলাইন প্রতারণা, ঘৃণাত্মক বক্তব্য, সাইবার বুলিং এবং এআই-নির্মিত বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের ঝুঁকি।

বাংলা ভাষায় এআই কনটেন্টের মানও একটি বড় প্রশ্ন। অনেক সময় অনুবাদনির্ভর, দুর্বল, একই ধরনের, প্রেক্ষিতহীন ও তথ্যগতভাবে ভুল বাংলা কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাস্তবতা, প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা, আঞ্চলিক ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট প্রায়ই হারিয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের ডিজিটাল জনপরিসর শুধু ইংরেজি বা বৈশ্বিক অ্যালগরিদমের ছাঁচে বন্দী হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো কৃত্রিম জনমত। কোনো ইস্যুতে হঠাৎ হাজার হাজার একই ধরনের মন্তব্য, একই ভাষার পোস্ট, একই ধরনের ভিডিও বা একই স্লোগান দেখা গেলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না এটি স্বতঃস্ফূর্ত জনমত, নাকি সংগঠিত ডিজিটাল প্রচারণা। এতে সমাজে বিভ্রান্তি বাড়ে এবং প্রকৃত জনমতের মূল্য কমে যায়।

বাংলাদেশ কী করতে পারে

প্রথমত, বাংলাদেশকে ডিজিটাল ও মিডিয়া সাক্ষরতাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার শেখানো যথেষ্ট নয়। মানুষকে শেখাতে হবে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে ভুয়া ছবি ও ভিডিও চিনতে হয়, কীভাবে বটের আচরণ বোঝা যায়, কীভাবে অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে প্রভাবিত করে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের মাধ্যমে এই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলা ভাষার মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট বাড়াতে হবে। স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় সমস্যা, স্থানীয় জ্ঞান এবং মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কনটেন্ট তৈরি করা জরুরি। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, জেলা, উপজেলা, চর, হাওর, পাহাড়, উপকূল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠকেও ডিজিটাল পরিসরে দৃশ্যমান করতে হবে। ইন্টারনেটকে সত্যিকারের মানবিক রাখতে হলে মানুষের বাস্তব জীবন সেখানে জায়গা পেতে হবে।

তৃতীয়ত, স্বাধীন ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতাকে শক্তিশালী করতে হবে। এআই-জেনারেটেড কনটেন্টের ভিড়ে যাচাইকৃত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, স্থানীয় সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থের তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সংবাদমাধ্যমকে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, কিন্তু কনটেন্ট উৎপাদনের অন্ধ প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে চলবে না।

চতুর্থত, প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহি দরকার। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিপুল ব্যবহারকারী থেকে মুনাফা করে, কিন্তু বাংলা কনটেন্ট মডারেশন, ভুয়া খবর শনাক্তকরণ, স্থানীয় ভাষা ও প্রেক্ষাপট বোঝা, গবেষকদের ডেটা অ্যাক্সেস দেওয়া এবং স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের দায়বদ্ধতা সীমিত। সরকার, নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তিবিদ, গণমাধ্যম ও একাডেমিয়ার যৌথ উদ্যোগে প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে নিয়মিত নীতি-আলোচনা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট চিহ্নিতকরণে নীতিমালা প্রয়োজন। কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও বা অডিও এআই দিয়ে তৈরি হলে তা স্বচ্ছভাবে জানানো উচিত, বিশেষ করে সংবাদ, রাজনৈতিক প্রচারণা, স্বাস্থ্য তথ্য, শিক্ষা, আর্থিক পরামর্শ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে। তবে নীতিমালা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের হাতিয়ার না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

ষষ্ঠত, স্থানীয় কমিউনিটি-ভিত্তিক ডিজিটাল জনপরিসর তৈরি করতে হবে। বড় প্ল্যাটফর্মের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করলে বাংলাদেশের জনআলোচনা অ্যালগরিদমের হাতে বন্দী থাকবে। স্থানীয় অনলাইন ফোরাম, কমিউনিটি মিডিয়া, কমিউনিটি রেডিওর ডিজিটাল রূপান্তর, নাগরিক তথ্যকেন্দ্র, শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম এবং স্থানীয় ভাষার ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা যেতে পারে।

সপ্তমত, গবেষণা দরকার। বাংলাদেশে কত বট অ্যাকাউন্ট সক্রিয়, কী ধরনের ভুয়া প্রচারণা চলে, বাংলা ভাষায় এআই কনটেন্টের প্রভাব কী, নির্বাচনী আলোচনায় অটোমেশন কতটা প্রভাব ফেলে, শিশু-কিশোরদের ওপর অ্যালগরিদমিক কনটেন্টের প্রভাব কী, এসব বিষয়ে স্বাধীন গবেষণা প্রয়োজন। অনুমান দিয়ে নীতি তৈরি করলে ঝুঁকি বাড়ে।

ইন্টারনেট মৃত নয়, কিন্তু অসুস্থ

ডেড ইন্টারনেট থিওরি আক্ষরিক অর্থে সত্য নয়। ইন্টারনেট মরে যায়নি। মানুষ এখনো সেখানে আছে। তারা কথা বলছে, প্রশ্ন করছে, শিখছে, ভালোবাসছে, রাগ করছে, প্রতিবাদ করছে, গান লিখছে, ছবি আঁকছে, ব্যবসা করছে, শিক্ষা নিচ্ছে, আন্দোলন গড়ছে।

কিন্তু এটাও সত্য, ইন্টারনেট আগের মতো নেই। এটি এখন অনেক বেশি বাণিজ্যিক, নজরদারিমূলক, অ্যালগরিদম-নির্ভর এবং কনটেন্ট-উৎপাদনমুখী। মানুষের সম্পর্ক, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে ক্রমেই মাপা হচ্ছে লাইক, শেয়ার, ভিউ, ক্লিক ও এনগেজমেন্ট দিয়ে। ফলে ইন্টারনেটের মানবিক চরিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে ডিজিটাল রূপান্তরের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে, অন্যদিকে ডিজিটাল জনপরিসরকে বট, ভুয়া তথ্য, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত এবং মানহীন কনটেন্টের ভিড় থেকে রক্ষা করতে হবে।

প্রশ্ন তাই ইন্টারনেট সত্যিই মৃত কি না, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা কি ইন্টারনেটকে মানুষের জায়গা হিসেবে ধরে রাখতে চাই? যদি চাই, তাহলে বাংলাদেশকে এখনই ভাবতে হবে, কীভাবে বাংলা ভাষা, স্থানীয় জ্ঞান, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত জবাবদিহি এবং মানবিক সংলাপকে শক্তিশালী করা যায়।

কারণ ইন্টারনেটের প্রাণ প্রযুক্তি নয়। ইন্টারনেটের প্রাণ মানুষ। আর মানুষকে অদৃশ্য করে কোনো ডিজিটাল ভবিষ্যৎ টেকসই হতে পারে না।                               


লেখকঃ ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, তথ্যের অখণ্ডতা ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক নীতি-পরামর্শক, বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।