অনলাইন বেটিং ও পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধে অংশীজনের সমন্বয়ে বিটিআরসিতে সভা অনুষ্ঠিত

অনলাইন বেটিং ও পর্নোগ্রাফি’র সভায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনইআইআর ও এনটিএমসি

অনলাইন বেটিং ও পর্নোগ্রাফি’র সভায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনইআইআর ও এনটিএমসি
২১ অক্টোবর, ২০২৫ ১৯:২০  
২১ অক্টোবর, ২০২৫ ২০:৩৯  

বিভিন্ন ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপস এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে জুয়ার কার্যক্রম । এতে বিদেশে অর্থ পাচার সহ হুমকির মুখে তরুণ সমাজ। এমন প্রেক্ষাপটে অনলাইনে জুয়া, বেটিং সাইট এবং পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধ করার বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় প্রাধান্য পেলো ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রার (NEIR)। দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহারকে বৈধতার কাঠামোর মধ্যে আনতে আবারও উঠে এলো এই সিস্টেমটি চালুর বিষয়। আলোচনার টেবিলে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে হয়েছে আলোচনা।  

২১ অক্টোবর মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বিটিআরসি ভবনে অনলাইনে জুয়ার কার্যক্রম প্রতিরোধে করণীবিষয়ক আলোচনা সভায় আলোচনায় আসে এই দুটি উদ্যোগের নাম। আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নভেম্বরের পরে এনইআইআর চালু করা হবে বলে জানান অনুষ্ঠানের সভাপতি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

আলোচনায় অংশ নিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, জুয়া সারাবিশ্বে আলোচিত একটি বিষয়। জুয়া বন্ধে বিটিআরসি-ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি কাজ করছে। মাইন্ডসেট পরিবর্তনের পাশাপাাশি প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যেমে জুয়া প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। 

সূত্রমতে, কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েও প্রক্রিয়াগত নানা জটিলতা ও বিতর্কের কারণে এনইআইআর চালু করতে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি বিটিআরসি। তবে এবার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে এই বিষয়ে বিস্তারিত কৌশল ও সময়সূচি প্রকাশ করতে পারে কমিশন। 

এ প্রসঙ্গে বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) বললেন, এনইআইআর চালু করলে একটি মোবাইলে যে সিম আছে সেই সিম পরিবর্তন করলেও পরবর্তী সিম প্রবেশ করাতে নিবন্ধন প্রয়োজন হবে এবং এর মাধ্যম অপরাধ কমে আসবে । অন্যদিকে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারীরা যদি তাদের অ্যাপসে পুন:পুন ভেরিফিকেশন চালু করে তাহলেও প্রতারণা কমে আসবে। 

বিটিআরসি চেয়ারম্যান আরো বলেন, যারা সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করেন আর যারা টেকনোলজি নিয়ে কাজ করেন তাদের মধ্যে একটা গ্যাপ থাকে। এই গ্যাপ কমানোর জন্য পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ এর পাশাপাশি সব স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে পারস্পারিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে। থ্রিজি চালুর করার সময় আইনশৃঙখলা বাহিনী বলেছিল থ্রিজি আসলে আইনশৃঙখলা অবনতি হবে কারণ মনিটরিং সক্ষমতা নেই। তখন ইন্ডাস্ট্রি থেকে বলা হলো যদি ১০ ভাগ কানেক্টিভিটি বাড়লে ১ ভাগ জিডিপি বাড়বে। দুইটা প্রেক্ষিত বুঝতে হবে যে পাচটির বেশি সিম থাকা ঠিক নয় এটা য্যেক্তিক নয়। ১৭ কোটি সিম নিবন্ধন করতে ১০কোটি মানুষকে লাইনে দাড়িয়ে সিম নিবন্ধন করতে হয়েছে। শুরুতে ২০টা সিম দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে ১৫টা সিম নিয়ে আসা হয় যা করতে ছয়মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বিটিআরসি  ১০টি সিমে নামিয়ে আনার কাজ করছে । যদি কারো নামে ২টি সিম বহাল রাখা হয় তখনও অনলাইন প্রতারণা ও জুয়া কমবে না বরং এটা চলতে  থাকবে। এজন্য স্মার্ট এনআইডি ও পুরাতন এনআইডির মধ্যে ম্যাপিং করলে অর্ধেক ডুপ্লিকেট এনআইডি কমে আসবে যাবে। বাজারে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করা সিমের ক্ষেত্রে মানবসৃষ্ট ভুলের কারণে একই জাতীয় পরিচয়পত্রে একাধিক সিম বিক্রি হচ্ছে। 

বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্ট ইউনিট এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ইতোমধ্যে ৪ হাজার ৭৮৩টি এমএফএস  অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছে। জুয়ার অ্যাকাউন্ট ব্লক করার পর তা বিশ্লেষণ করে আইনশৃংখলা বাহিনীকে তথ্য সরবরাহ করা হবে।  

ন্যাশনাশ টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার এর পরিচালক জানান, এনটিএমসির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদেরকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১২৩ টা অ্যপস বন্ধসহ এ সংক্রান্ত অসংখ্য ইউআরএল ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। । সংবাদমাধ্যমে জুয়ার বিজ্ঞাপন বন্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ধারা ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তারা। 

ডিজিএফআই এর পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাইফ বলেন, একই আইএমইআই এর সাথে অনেক সিম ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সর্বোচ্চ ৩০ টা সিম পাওয়া গেছে। আইএমইআই ব্লাকলিস্ট  চালু করা দরকার যাতে করে কেউ কালো তালিকাভুক্ত সিম চালু করলে টাওয়ার থেকে সিগন্যাল আসে।

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মাসুদ বলেন, দেশের যুবকদের সাথে দুবাই ও মালয়েশিয়ার থেকেও  একটি চক্র যুক্ত হয়ে অনলাইনে অপরাধ করে যাচ্ছে। তারা বিদেশে মেয়েদেরকে নিয়ে কলসেন্টার চালু করে জুয়া বেটিং এর প্রচারণা চালায়। মোবাইল ও  আইএসপি অপারেটরদের কনটেন্ট সনাক্তের সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।  

সিআইডি সাইবার পুলিশ সেন্টার এর বিশেষ পুলিশ সুপার মীর তৌহিদ বলেন, গত ২ মাসে ২ হাজারের বেশি সিম অনলাইনে বেটিং কাজে জড়িত সেটা সনাক্ত করা হয়েছে এবং বেটিং এর কাজে ব্যবহার হচ্ছে ৬০০ সাইট ও ৫০টি অ্য্যপস। অনেক অ্যাপস দেশের বাহির থেকে পরিচালিত হয় বলেও জানান তিনি। 

মোবাইল অপারেটরদের প্রতিনিধিরা জানান, তারা অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি ও বেটিং সাইট বন্ধে এনটিএমসির সহায়তায় সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে অসংখ্য বেটিং ও পর্নসাইট বন্ধ করা হয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, জুয়ার সাইটগুলো অনেক সিকিউরড  এবং বিভিন্ন নামে হওয়ায় মাল্টিলেয়ারে কাজ করতে হবে। এজন্য বিটিআরসি, নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সকলকে সমন্বয় করে কার্যক্রম সম্পাদন করতে হবে।

নগদ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোতাসেম বিল্লাহ বলেন, মোবাইল সিম সংখ্যা কমিয়ে ৫টা করার পাশাপাশি  জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করার সুবিধা ব্যাংক ও এমএফএসকে প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করতে হবে।

ইতোমধ্যে ৫৮ হাজার এমএফএস নাম্বার বন্ধ করা হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্ট ইউইনিট এর প্রতিনিধিরা জানান,  বিএফআইইউ যে কোনো ব্যক্তির একটা ইউনিক সনাক্তকরণের নাম্বার চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এমএফএস-ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ যাদের অ্যাকউন্ট থাকবে তাদের ইউনিক  আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার  প্রদান করা হবে।  এনআইডি ও সিম ম্যাচ করে অ্যাকাউন্ট যাচাইকরণে বিটিআরসি ও বাংলাদেশ সমন্বিতভাবে একটি প্ল্যাটফর্ম করা প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন তারা।

জুয়ার মাধ্যমে দেশ থেকে প্রচুর অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে উল্লেখ করেপ্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, যে সব অ্যাকাউন্ট থেকে জুয়ার লেনদেন হয় তাদের লিস্ট বানানো হয়েছে এবং যেসব পোর্টাল বিজ্ঞাপন দেয় সেগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্ট ইউনিট ও বিটিআরসির সহায়তা মে মাস থেকে ৪ হাজার ৮২০ টি এমএফএস নাম্বার বন্ধ  এবং ১ হাজার ৩৩১ টা পোর্টাল বন্ধ করা হয়েছে।

 তিনি বলেন, যখন একটি সিম নম্বর বন্ধ হয় তখন অপরাধীরা একাধিক সাইট তৈরি করে। অন্যদিকে, এমএফএস অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার পর তারা অ্যাপস বেইজড সিস্টেমে চলে যায় । এজন্য আইনশৃংখলা বাহিনীকে সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি মোবাইল অপারেটরদেরকে প্যাকেট কোরে পপ আপ ব্লক বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। ট্রাফিক ক্লাসিফাইয়ার এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে যাতে পপ আপ ব্লক করা যায়। এছাড়াও মোবাইল ফিনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানকে একটিভ ক্রলার ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি, জুয়া ও বেটিং বন্ধ করতে হবে। দেশের বেশকিছু মিডিয়ায় জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, তারা জুয়া বন্ধে উদ্যোগ না নিলে পোর্টাল ব্লক করে দেওয়া হবে।