কী করে ইউনিট ৮২০০

ইরানে গোয়েন্দা প্রযুক্তিকে খেল দেখাচ্ছে ব্রাঞ্চ ৫৪?

ইরানে গোয়েন্দা প্রযুক্তিকে খেল দেখাচ্ছে ব্রাঞ্চ ৫৪?
১৬ জুন, ২০২৫ ১৩:৫২  
১৬ জুন, ২০২৫ ১৭:৫৪  

ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা বলতেই উঠে আসে মোসাদের নাম। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে গঠিত এই সংস্থাটি মূলত ইসরাইলের অস্তিত্ব রক্ষায় কাজ করে। ইরান হামলায় এই দলটির চেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ইউনিট ৮২০০, ৯৯০০, ৫০৪ এবং ব্রাঞ্চ ৫৪ হচ্ছে এর চার স্তম্ভ।

এদের মধ্যে ইউনিট ৮২০০ এর মাধ্যমে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনা করে। গোয়েন্দাগিরির জন্য ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র বানানোর দায়িত্বও পালনের পাশাপাশি গোপন তথ্য সংগ্রহ করে, তা বিশ্লেষণ করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠায়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে কাজ করে এই ইউনিটটি।  স্যাটেলাইট, গোয়েন্দা বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করে বি ও ভিডিওর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সেনা কমান্ডার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট পৌঁছে দেয় ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিট ৯৯০০। হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স এর মাধ্যমে মানুষের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে মোসাদ ও শিন বেট-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে ইউনিট ৫০৪। আর ইরানের সামরিক কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ কৌশল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য কাজ করে ব্র্যাঞ্চ ৫৪। 

নাম প্রকাশ না করেও ব্রাঞ্চ ৫৪-এর কমান্ডার বলেছেন,"আমাদের কার্যক্রম শুধু ইরানের 'পাসদারান-ই-ইনকিলাব' (বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী) ঘিরেই। আমরা প্রতিদিন টার্গেট শনাক্ত করছি এবং গবেষণা করছি কীভাবে সেগুলোতে প্রভাব ফেলা যায়। আমরা ইতিমধ্যেই ইরানের অনেক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করেছি এবং তাদের পরমাণু শক্তি থাকলেও তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। ইরানের সঙ্গে যেকোনো সামরিক সংঘর্ষ হবে সম্পূর্ণ আলাদা রকমের যুদ্ধ।"

সামরিক গোয়েন্দা আমানে চেয়েও এরা যে কতট ধূর্ত তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই মিলেছে এক রাতে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে শীর্ষ সামরিক প্রধানদের হত্যা করে। এই শাখাটির তৎপরতাতেই ইরানের রাজধানী তেহরানের আকাশসীমায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করতে পারছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এছাড়াও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপকের এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংসের দাবিও করছে জায়নবাদী বিমানবাহিনী। 

"ওয়াই নেট" নামে এক ইসরায়েলি ওয়েবসাইট সূত্রে প্রকাশ, ২০২৩ সালের জুনে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে নতুন এই গোয়েন্দা ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন তারা ইরান এবং "পাসদারান-ই-ইনকিলাব" (ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলো। তখন এই ইউনিটে মাত্র ৩০ জন সদস্য কাজ করতেন। 

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভাষ্য, ইউনিট ৮২০০ তাদের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট। তথ্য বলছে, এই ইউনিটে ১০ হাজারের বেশি লোক কাজ করে এবং এখানে যারা কাজ করে তারা এলিট এবং শিক্ষিত বাহিনী থেকে বাছাই করা। এমনও বলা হয়, এই ইউনিটে কাজ করা সদস্যদের সংখ্যা মোসাদ ও শিন বেটের সদস্যদের থেকেও বেশি। 

বিপুল সংখ্যক এই ইউনিট সদস্যরা যোগাযোগ ব্যবস্থার ওয়্যারট্যাপিং (গোপনে আড়ি পাতা), গোয়েন্দা ও সামরিক তথ্য ডিকোড করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেট থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সাইবার হুমকির শনাক্তকরণ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য ইলেকট্রনিক ও সাইবার ডিভাইস তৈরি করে।

প্রযুক্তির দিক থেকে ইউনিট ৮২০০-র তুলনা করা হয় বিশ্বের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে। কারিগরি দিক থেকে একে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) সমতুল্য মনে করা হয়। তবে ইউনিট ৮২০০-এর কার্যক্রম সবসময় গোপন রাখা হয়। তবুও সামরিক ও গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে এই ইউনিট ইসরায়েলকে রক্ষা করতে কিংবা ইসরায়েলের হয়ে আক্রমণ করতে এক কথায় প্রতিরক্ষা ও হামলা উভয় ধরনের অভিযানে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে।

এমনও বলা হয়, ২০১০ সালে ইরানে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর সাইবার হামলায় ইউনিট ৮২০০ জড়িত ছিল। ইরানি স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করতে স্টাক্সনেট (Stuxnet) নামে একটি ভাইরাস ব্যবহার করা হয়েছিল।

ইসরায়েলি পত্রিকা হারেতসে-এ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউনিট ৮২০০-এর উপ-কমান্ডার ইউরি সিভ বলেছেন, "সাইবার জগতে ইরানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধের মতো নজির পৃথিবীতে আর দুটি নেই।" 

ইউনিট ৮২০০ গোপন তথ্য পাওয়ার জন্য সামাজিক মাধ্যমে কাজ করা ব্যক্তি ও দলগুলোকেও ব্যবহার করে।

এই ইউনিট গঠিত হয় ১৯৫২ সালে এবং প্রথম নাম ছিল 'সেকেন্ড ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ইউনিট' অর্থাৎ, 'দ্বিতীয় গোয়েন্দা পরিষেবা ইউনিট'। পরে এই ইউনিটকে ৮৪৮ বা ৫১৫ নামেও ডাকা হতো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, ১৯৬৭ সালের আরব দেশগুলোর সঙ্গে হওয়া ছয় দিনের যুদ্ধে ইউনিট ৮২০০ মিসর ও সিরিয়া থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে মূল ভূমিকা রেখেছিলো। এই যুদ্ধ ইসরায়েলিদের জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর ইউনিট ৮২০০ ইসরায়েলি মিডিয়ায় আলোচনায় আসে।

আমেরিকান পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, হামাসের হামলার এক বছর আগে ইউনিট ৮২০০ হামাসের রেডিও পর্যবেক্ষণ বন্ধ করে দেয়।